অসুখ-বিসুখে, শরীর ঠান্ডা রাখতে, গ্রামবাংলায় একসময় জনপ্রিয় ছিল ‘পালোর শরবত’

‘Glucon-D’-র বিকল্প হিসেবে ‘পালো’ ব্যবহার করতো বাংলার মানুষ

কসময় অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে, পুজোর প্রসাদ কিংবা শরীর ঠান্ডা রাখতে এর জুড়ি মেলা ভার ছিল। স্বাস্থ্যকর, ভেষজ পানীয় হিসেবে গ্রামবাংলায় এর সুখ্যাতি তো ছিলোই, শহরের মানুষও পেট ফাঁপা ইত্যাদি অসুখ-বিসুখে ভরসা রাখতো ‘পালো’র শরবতে।এমনকী ‘Glucon-D’-র বিকল্প হিসেবে পালো ব্যবহার করতো বাংলার (Bengal) মানুষ। তবে, অনেকেই জানেন না ‘পালো’ বস্তুটি ঠিক কী।

‘পালো’ (Palo) একধরনের শ্বেতসার বা স্টার্চ (Strarch)। স্টার্চ বা শ্বেতসার প্রধানত খাবার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। শ্বেতসার গ্লুকোজে পরিণত হয়ে জীবদেহে শক্তি ও কার্বন অণু সরবরাহ করে। টাইট্রেশন করার সময় নির্দেশক হিসেবে স্টার্চ ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষাগারে গ্লুকোজ ও অ্যালকোহল তৈরি করার জন্য স্টার্চ ব্যবহার করা হয়।

এই শ্বেতসার সাধারণত যা পাওয়া যায় বীজে, কোনও কোনও গাছের মূলে, ত্বকে, গুঁড়িতে ও পাতায়। আগেকার দিনে চিকিৎসকরা পথ্য হিসেবে পালো খাওয়ার পরামর্শ দিতেন। পালো সংগ্রহ করা হয় মূলত শট বা শঠি থেকে। এর চাষ ভারতের প্রায় সর্বত্র অল্পবিস্তর হয়ে থাকলেও আগাছা হিসেবে যত্রতত্র জন্মায় এই গাছ। পশ্চিমবঙ্গের দুই মেদিনীপুর এবং দুই ২৪ পরগনা জেলা, হাওড়া, হুগলি এছাড়াও উড়িষ্যার বেশ কিছু অঞ্চলে এখনও এটি বেশ জনপ্রিয়। শঠি কন্দজাতীয় উদ্ভিদ। হলুদ গাছের মতো দেখতে হয়।  হলুদ, সাদা, বেগুণী ফুল হয়। এর মূল বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা আদা কিংবা কাঁচা হলুদের মতো। খোসা ছাড়ালে অবশ্য একেবারে দুধ সাদা। কন্দমূলকে কুটে, তা জলে চটকে থিতিয়ে রেখে নিচে জমে যাওয়া শ্বেতসারটি শুকিয়ে নিলে অ্যারারুট বা ময়দার মতো জিনিস পাওয়া যায়। আগে এর থেকে আবিরও তৈরি হত। বোটানিক্যাল নাম Curcuma zedoatia Rose, family- Zingiberaceae. শরীর ঠান্ডা রাখতে নাকি এই ভেষজের জুড়ি মেলা ভার। এছাড়া এর ভেষজ গুণাবলী জ্বর, আমাশা, অর্শ, কৃমি, প্লীহা, ফোঁড়া ইত্যাদিতে কাজ দেয়।

শট বা শঠি

শঠিমূল 

‘খাদ্যতত্ত্ব’ বইয়ে উল্লেখ আছে, “পালো প্রস্তুত করা বড় কঠিন নহে । বরিশাল জেলায় অনেক গৃহস্থ শট হইতে পালো প্রস্তুত করিয়া থাকে। স্থানীয় চিকিৎসকগণ এই পালো ব্যারামের সময় পথ্য রূপে ব্যবহার করেন । ইহা দ্বারা নানারূপ মিষ্টান্নও প্রস্তুত হইয়া থাকে। কাৰ্ত্তিক হইতে চৈত্র মাস পৰ্যন্ত শট তুলিয়া সংগ্ৰহ করা হয় । বৃষ্টি পাইয়া শট গজাইলে তাহ হইতে অধিক পালে প্রাপ্ত হওয়া যায় না ; কারণ, তখন মূল হইতে গাছের নুতন বৰ্দ্ধনশীল অংশে পরিব্যাপ্ত হয় । শটের বাকল ফেলিয়া প্রথমতঃ জলে ধৌত করিয়া ঢেঁকিতে কুটিয়া লওয়া হয়। পরে এই কোটা শটা জলে চটকাইয়া ডছাকিয়া লইতে হয় । এই জল প্রায় ৩ ঘণ্টা কোন পাত্রে রাখিয়া দিলে, পাত্রের তলায় শুভ্র বর্ণের পালে জমা হইয়া পতিত হয় । তৎপরে পালোর উপরিস্থিত জল ফেলিয়া দিয়া, ইহা জল মিশ্রিত করিয়া পূৰ্ব্ববৎ পাত্রে রাখিয়া দেওয়া হয় ।”

আধুনিক রেডিমেডের যুগে পালোর মতো ভেষজের ব্যবহার তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন বাংলার অনেক জায়গাতেই পালো পাওয়া যায় তবে তা দেখেশুনে কিনতে হবে। কারণ, পালো না চিনলে ঠকে যাওয়ার প্রবল ‘চান্স’ থাকবে। সাদা রঙের হওয়ায় অনেক জায়গায় পালোর ভেজাল হিসেবে অ্যারারুটও বিক্রি করা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খাঁটি পালো চিনবেন কী করে? এর উপায়ও আছে। একটা গ্লাসে অর্ধেক জলে এক চামচ পালো ফেলে দিন, যদি দেখেন সবটা সঙ্গে সঙ্গেই ডুবে গেছে, তাহলে তা খাঁটি। ভেজাল হলে ভেসে থাকবে। 

পালো

কৃত্রিম নয় এক্কেবারে প্রাকৃতিক এই ‘হেলথ ড্রিঙ্কস’-এ একধরনের মেঠো গন্ধ পাওয়া যায়। সামান্য চিনি সহযোগেই ‘রেডি’ হয়ে যায় পালোর শরবত এছাড়াও পরিশেষে রইলো পালোর শরবতের অন্য একটি সুস্বাদু রেসিপি:

উপকরণ

পালো (পালো কীভাবে বানাবেন বা পাবেন উপরেই তার উল্লেখ আছে, এছাড়া ইউটিউবেও একাধিক ভিডিও রয়েছে)

কাঁচা লঙ্কা

নুন

জল

প্রণালী

জলের মধ্যে প্রয়োজন মতো পালো মিশিয়ে ক্রমাগত ঘাঁটতে থাকুন। ব্লেন্ডারেও মেশাতে পারেন। যতক্ষণ না পালো ভালো করে জলে গুলে যাচ্ছে, ততক্ষণ মিশিয়ে যেতে হবে। লঙ্কা বেটে নিন। বীজ আলাদা করে নিন। পালো মেশানো জলে বিট নুন এবং লঙ্কা বাটা খুব ভালো করে ব্লেন্ড করুন। গ্লাসে ঢালার পর উপরে বরফের কুচি দিয়ে পরিবেশ করুন।

তথ্যসূত্রঃ

http://www.ahomemakersdiary.com/ (সায়ন্তনী মহাপাত্র মুদী)

Desi foods

Foodfunnadda USA

এই সময়

খাদ্যতত্ত্ব

আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য : চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৫, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড।

 

     

Developed by DXDasia