লেখার সঙ্গে রান্নার সঠিক ফোড়নটিও জানতেন, ‘রান্নার বই’-এ বুঝিয়েছিলেন লীলা মজুমদার

শুধু পাঠিকা নয়, পাঠকদের জন্যেও বইটি নিবেদন করেছিলেন লেখিকা

লেখকদের হাত বলে কথা, সে যে কী কী ধারণ করতে পারে তা সকলের বোঝার নয়। এই যেমন লীলা মজুমদার (Leela Majumder), যে হাতে পেন ধরতেন সেই হাতেই ধরতেন খুন্তি, যাকে বলে স্বয়ংসম্পূর্ণা। তুমুল জনপ্রিয় সব শিশুপাঠ্য, গল্প, উপন্যাস, ছড়া, কবিতা লিখেছেন যিনি, তিনিই লিখেছেন একটা আস্ত ‘রান্নার বই’ (Rannar Boi)!

রান্নার বই লিখছেন বলে লেখায় নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমাকে বিসর্জন দেননি। বেশ রসিয়ে রসিয়েই ‘পদ’ রচনা করেছেন। এমনকি, ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত এই রান্নার বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে নিজের নারীবাদী কণ্ঠস্বর এবং মানবিক চেতনাও জাগ্রত করেছিলেন। বলেছিলেন, “নারী-বর্ষে মাঝে মাঝে ‘রান্না-ঘরের বাঁদী’ কথাটা কানে আসত। দেখেছি অবিশ্যি ঐ রকম বাঁদী, তেমনি আবার ‘আপিস ঘরের নফর’-ও ঢের দেখেছি। বাঁদী-ও যেমন দেখেছি, রান্নাঘরের রাণীও দেখেছি। বাবা! কি তাদের দাপট! সে যাক-গে, সারাজীবন দেখে দেখে এটুকু বুঝেছি মানব-জীবনের কেন্দ্র হল একেকটি পরিবার এবং পরিবারের কেন্দ্র হল গিয়ে হল গিয়ে ঐ রান্নাঘরটি! রান্নাঘরটি যে চালায় সে পৃথিবীর কলকাঠিটাও ঘোরায়। কারণ যে যাই বলুক, শতকরা ৭৫ জন লোক খেয়ে-দেয়ে যেমন আনন্দ পায়, তেমন আর কিছুতে নয়, আর শতকরা ১০০জন লোক না খেয়ে বাঁচে না। যেমন নিশ্বাস না ফেলে বাঁচে না…খেতে যখন হবেই তখন ভালো করেই খাওয়া যাক না।”

এই বই লিখতে তিনি যার সানন্দ সাহায্য পেয়েছিলেন, সে শুধু ষাট-সত্তরটি নিয়ম বলে দেয়নি, উপরন্তু সে-সব রেঁধেছে এবং খাইয়েছে, সে হল তাঁর মেয়ে কমলা চট্টোপাধ্যায় (Kamala Chattopadhyay)। বইটিতে নিজের অভিজ্ঞতা ছাড়াও নানান জনের কাছ থেকে নানান প্রণালী শিখে লিখেছেন তিনি। যাঁদের থেকে সেইসব প্রণালী শিখেছিলেন-জেনেছিলেন, তাঁদের মধ্যে যাঁর কথা তিনি উল্লেখ করতে ভোলেননি, তিনি হলেন- ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী (Indira Debi Chowdhury)। ইন্দিরা দেবী নিজে কখনও রান্নাঘরে পা না দিলেও তাঁর একটি লম্বা লাল হাতে-লেখা খাতা ছিল, যার পাতায় পাতায় শৌখিন রান্নার নিয়ম লেখা। তার কিছু কিছু লীলাদেবী এবং কমলা চট্টোপাধ্যায় সরলীকরণ করে দিয়েছিলেন। যেমন- পাঁউরুটির মালপোয়া। বইটিতে লীলাদেবী যে রেসিপিগুলি বর্ণনা করেছেন তার অনেকগুলি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান খাবারের রূপান্তর বা কলকাতার বৃহৎ চীনা সম্প্রদায় বা মুসলিম বাসিন্দাদের দ্বারা প্রভাবিত। অন্যগুলি পূর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রেসিপির সংমিশ্রণ। লীলা মজুমদার বলতেন, ‘রান্না করা একটি গল্প তৈরি করার মতো’ এবং তিনি সকলের কাছ থেকে রেসিপি সংগ্রহ করতেন কারণ রান্নার সঙ্গে জুড়ে থাকে বিভিন্ন ইতিহাস। কাঁচা পোস্তোর অম্বল, চীনে চিংড়ি, মাছের আফ্রিকান স্টু, পর্ক ভিন্দালু, গুলাশ, আন্দালুসি মুরগি অথবা ক্রেপ সুজেট, সমস্ত রেসিপিতে সেই স্বাদই তুলে ধরেছেন লেখিকা। রেসিপির সঙ্গে সঙ্গে খুব ছোটোদের চা-পার্টি, আরেকটু বড়োদের চা-পার্টি, পিকনিক বা লোক খাওয়ানোর ব্যাপারেও সরস পরামর্শ দিয়েছেন লীলাদেবী।

‘রান্নার বই’-এ তিনি উল্লেখ করেছিলেন, “আমাদের দেশের মা-মেয়েদের হাতে এই বই দিলাম এই আশাতে যে তাঁরা নিজেদের বাড়িতে বসে পৃথিবীর একটি সেরা শিল্প-কর্মের সাধনা করবেন এবং শুধু পাঠিকা নয়, পাঠকদের জন্যেও বইটি নিবেদন করলাম।”

কয়েকটি বিদেশী রান্না আত্মীয়া কমলা বসু তাঁকে পাঠিয়েছিলেন ফিলাডেলফিয়া থেকে। অনেক রান্না তাঁর মা সুরমা রায় শিখিয়েছিলেন। কিছু রান্না প্রিয় বন্ধু পূর্ণিমা ঠাকুর, তাঁর বৃদ্ধা আয়া আমোদিনী ঘোষ শিখিয়েছিলেন। বাদ-বাকি এর কাছে ওর কাছে শুনে, দিশি ও বিলিতী বই পড়ে, পরীক্ষা করে রপ্ত করেছিলেন। ‘অল্প সময়ে, অল্প খরচে, কম ঝামেলার রান্না এ-সব’ এমনটাই বইতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করে দিয়েছেন।

লীলা মজুমদার ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর (Upendra Kishore Ray chowdhury) ভাগ্নি। বাংলার সাংস্কৃতিক নবজাগরণের অগ্রভাগে থাকা একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা, কনভেন্ট-শিক্ষিত মজুমদার বাড়ির সাহিত্য-পরিবেশ এবং সুকুমার রায়ের (Sukumar Ray) মতো আত্মীয়ের সঙ্গ কিশোর বয়স থেকেই তাঁকে লেখালেখিতে উৎসাহিত করেছিল। পরবর্তীকালে তিনি নিজে বাংলার শিশু-কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক হিসেবে মর্যাদা পেয়েছেন। পরবাসকে দেওয়া একটি সাক্ষাত্কারে, লীলা মজুমদারের নাতনি শ্রীলতা ব্যানার্জী উল্লেখ করেছেন, ‘দিদা যে সবসময় রান্না করতেন এমনটা নয়, প্রয়োজন হলে তবেই করতেন। কিন্তু খেতে ভালোবাসতেন, খাওয়াতেও। বিভিন্ন জটিল রান্না থেকে শুরু করে সাধারণ নিত্যদিনের রান্নাও নির্দিষ্ট ফোঁড়ন, মশলা সহযোগে এমন রাঁধতে পারতেন, যা অনেক রন্ধনপটীয়সীদের হার মানাবে।’

তাঁর রেসিপিগুলি নিয়ে পরে আবারও বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে, আপাতত এই লেখাটি শেষ করা হল ‘রান্নার বই’-এর একেবারে শেষে তিনি যে কথা উল্লেখ করেছিলেন, তা দিয়ে; “আমাদের দেশের মা-মেয়েদের হাতে এই বই দিলাম এই আশাতে যে তাঁরা নিজেদের বাড়িতে বসে পৃথিবীর একটি সেরা শিল্প-কর্মের সাধনা করবেন এবং শুধু পাঠিকা নয়, পাঠকদের জন্যেও বইটি নিবেদন করলাম।”

তথ্যসূত্রঃ

রান্নার বই- লীলা মজুমদার, কমলা চট্টোপাধ্যায়

www.getbengal.com

Developed by DXDasia