অলকানন্দা ও মন্দাকিনীর পথ ধরেই শুরু হল কেদারনাথ যাত্রা…

পাখির চোখ পঞ্চকেদার – দ্বিতীয় পর্ব

গত পর্বের পর

 

প্রচণ্ড শীত এবং প্রবল তুষারপাতের জন্য কেদারনাথের (Kedarnath) প্রতীক মুখোশকে ডোলি করে, নভেম্বর মাসে ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার পর নামিয়ে আনা হয় উখীমঠের ওঙ্কারেশ্বর মন্দিরে। এরপর ছ-মাস কেদারনাথের পুজো হয় এখানে। তারপর, শীত শেষে একসময় বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম আসে। বরফ সরিয়ে রাস্তাও পরিষ্কার করা হয়। প্রস্তুতি নেওয়া হয় ডোলির পুনর্যাত্রার। এ যেন ঠিক জগন্নাথের উল্টোরথ যাত্রার মতো। ছ-মাস পর, ওঙ্কারেশ্বর মন্দির থেকে চলতে শুরু করে ডোলি। যে পথে কেদারনাথজি নেমেছিলেন, সেই পথেই আবার মে মাসের শুরুতে অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্যকালে ফিরে যান তিনি কেদারে। দর্শনার্থীদেরও কেদারযাত্রা শুরু হয় এই ডোলিযাত্রার দিন থেকেই। শীতকালে মন্দির বন্ধের সময় জ্বালিয়ে আসা হয় ঘিয়ের প্রদীপ। মন্দির চত্বরে ছ-মাস তীব্র ঠান্ডা, বরফ পড়ার পরেও, মন্দিরের কপাট যেদিন পুনরায় খোলা হয়, সবাইকে অবাক করে দিয়ে জ্বলতে দেখা যায় সেই প্রদীপকে। লোকবিশ্বাস, দৈবশক্তিই ছ-মাস নিশ্চলভাবে জ্বালিয়ে রাখে এই প্রদীপ। হাজার হাজার বছর ধরে এই ঘটনার কোনও অন্যথা হয়নি। এই অবাক করা ঘটনার সাক্ষী থাকতেই প্রতিবছর কপাট খোলার দিন হাজার হাজার সাধারণ ভক্ত, দর্শক থেকে শুরু করে উঁচু পদের আমলা, মন্ত্রী, সেলেব দুনিয়ার তাবড় অভিনেতা-গায়ক-খেলোয়াড় নির্বিশেষে সকলেই ভিড় করেন মন্দির চত্বরে।

গত পর্বেই লিখেছিলাম, প্রকৃতির অভিশাপে কেদারনাথ যাত্রার নতুন পথ এখন আগের চেয়ে তুলনায় প্রশস্ত অথচ  বেশি সময়ের হলেও, বর্ষার জলে পিছলে গিয়ে পা হড়কে যাওয়ার বিস্তর সম্ভবনা আছে নতুন এই কংক্রিটের পথে। তবে, শুরুর আগেই অত ভাবতে গেলে চলে না। পথ যেখানে দেবতার উদ্দেশ্যে, সেখানে ঘোর নাস্তিকও ‘জয় শ্রী কেদার’ (Jay Shree Kedar) রবে পথ হাঁটতে থাকেন এখানে৷

মন্দির চত্বরে ছ-মাস তীব্র ঠান্ডা, বরফ পড়ার পরেও, মন্দিরের কপাট যেদিন পুনরায় খোলা হয়, সবাইকে অবাক করে দিয়ে জ্বলতে দেখা যায় সেই প্রদীপকে। লোকবিশ্বাস, দৈবীশক্তিই ছ-মাস নিশ্চলভাবে জ্বালিয়ে রাখে এই প্রদীপ।

কেদারনাথ আগে ও এখন | ম্যাপ সৌজন্যেঃ NATMO

কেদারনাথ যেহেতু রুদ্রপ্রয়াগ (Rudraprayag) জেলায় অবস্থিত, তাই রুদ্রপ্রয়াগের উদ্দেশ্যে, উত্তরাখণ্ডের গেটওয়ে হরিদ্বার (Haridwar) থেকে যথাসম্ভব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়াই ভালো। রাস্তা ফাঁকা থাকলে মিনিট চল্লিশের মধ্যেই গাড়ি পৌঁছে যাবে হৃষিকেশ (Hrishikesh)। এরপর চন্দ্রভাগা নদীর ব্রীজ, মুনি কি রেতি পার হয়ে লছমন ঝুলা, রাম ঝুলাকে দূর থেকেই দেখে নিলে, সোজা পথে ৩৫ কিলোমিটার দূরে ব্যাসীর দিকে এগিয়ে যাবে গাড়ি। এই পুরো পথটারই সঙ্গী – গঙ্গার স্বচ্ছ সবুজ জল, পাহাড়ি বাঁক, আর রিভার রাফটিংয়ের বড়ো বড়ো পোস্টার। রাস্তা এরপর সোজা চলেছে দেবপ্রয়াগের দিকে। এখান থেকেই শুরু হয়, পাখির চোখে একযোগে পথের ডানদিকে অতল খাদ, বাঁদিকে সবুজে ঘেরা উঁচু  পাহাড় আর সামনেই বরফের চাদরে মোড়া হিমালয় দর্শন। ভাগীরথী, অলকানন্দা ও মন্দাকিনীর সঙ্গম দেবপ্রয়াগে এসে কিছুক্ষণ অন্তত দাঁড়ালে এতক্ষণের ক্লান্তিতে এসে লাগে তৃপ্তি ও মুগ্ধতার ছোঁয়া। অসাধারণ এই দৃশ্যপটকে মনের মধ্যে রেখেই একসময় আবার গাড়ি স্টার্ট নেয় এখানকার অন্যতম বাণিজ্যিক শহর শ্রীনগরের দিকে।

গুপ্তকাশী

রুদ্রপ্রয়াগ এখান থেকে ৩৩ কিলোমিটার। পথেই পড়ে কালিয়াসৌর। এখানে মানুষের মুখে মুখে সবসময় ঘোরে ধারিদেবীর মন্দিরের কথা। ধারিদেবীকে বলা হয় ‘চারধাম’ (Char Dham Yatra) অর্থাৎ যমুনোত্রী, গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ ও বদ্রীনাথের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। জনশ্রুতি, ধারিদেবীকে প্রথম পাওয়া গিয়েছিল অলকানন্দার গর্ভে। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী এক ব্রাহ্মণ অলকানন্দার নদীগর্ভেই তাঁর আরাধনা শুরু করেন। হাইডেল পাওয়ার প্রোজেক্টের কাজ শুরু হবে বলে, স্থানীয় প্রশাসন ২০১৩-র কিছুদিন আগে থেকেই উদ্যোগ নিয়েছিল নদীগর্ভ থেকে দেবীকে তুলে এনে শহরের মধ্যে নতুন মন্দির তৈরির জন্য। স্থানীয় মানুষের তরফ থেকে এরপর বাধা আসে বিস্তর। তাদের মতে, ধারিদেবীকে তাঁর দেবীস্থান থেকে সরালেই বিপর্যয় নেমে আসবে, ঠিক যেমনটা হয়েছিল ১৮৮২ সালে। সেসময়ও নাকি প্রবল ধসের শিকার হয় উত্তরাখণ্ড। তবু, বাধাবিঘ্ন এড়িয়ে ২০১৩ সালের ১৬ জুন সন্ধ্যার সময় দেবীকে তাঁর আদি মন্দির থেকে সরানো হয়। আর, এবারেও একইভাবে তারপরের দিনই নাকি বিধ্বস্ত হয় উত্তরাখণ্ড। ১৭ জুন প্রলয়ঙ্কর মন্দাকিনী তছনছ করে দেয় সবকিছু। এরপর অবশ্য পুনরায় কিছুদিন পর দেবীকে ফিরিয়ে আনা হয় তাঁর আদি মন্দিরে। বিশ্বাস আর ভক্তির মিশেলে তারপর থেকে পঞ্চকেদার কিংবা চারধাম যাত্রাপথে আরও বেশি করে যাত্রীদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এই ধারীদেবী মন্দির।

গৌরীকুণ্ড থেকে কেদারনাথ

হাতে সময় থাকলে মন্দির দর্শন সেরে এরপর রুদ্রপ্রয়াগের দিকে যত এগোনো যাবে, ততই প্রকট হবে অলকানন্দার ভয়ংকর গর্জন। পুরাণমতে, এই রুদ্রপ্রয়াগেই রুদ্রনাথ মহাদেব সৃষ্টি করেছিলেন রাগ রাগিণীর। দেবর্ষি নারদ এই রুদ্রপ্রয়াগেই তপস্যায় তুষ্ট করে শিবের কাছে সংগীতের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন বলে লোকশ্রুতি। আর, এ যুগে এই রুদ্রপ্রয়াগেই মানুষখেকো লেপার্ড মারার জন্য বিশেষ স্মরণীয় হয়ে আছেন বিখ্যাত ভারতদরদী সাহেব জিম করবেট।

 

শোনপ্রয়াগ

অলকানন্দা ও মন্দাকিনীর সঙ্গম রুদ্রপ্রয়াগেই পথ দু-ভাগ হচ্ছে। মন্দাকিনীর তীর বরাবর একটি রাস্তা এখান থেকে চলে যাচ্ছে কেদারনাথের দিকে। আর অন্য রাস্তাটি গেছে অলকানন্দার ধার বরাবর বদ্রীনাথ। উচ্ছলা, খামখেয়ালি,  দুধ-সাদা জলধারার ছন্দে বয়ে চলা মন্দাকিনীর তীর ধরে বিভোর হয়ে এরপর অগস্ত্যমুণি পেরিয়ে আরও ৩৫ কিলোমিটার এগোলে ‘কুণ্ড’ চটি। মন্দাকিনী এবারে চলে আসে পথের ডানদিকের। আর এই মন্দাকিনীর ঠিক ওপারেই রয়েছে কেদারনাথজির শীতকালীন আবাস সেই উখীমঠ। এরপর, কুণ্ড থেকে গুপ্তকাশী, নালা চটি হয়ে, ফাটা চটি। এখানেই বায়োমেট্রিক রেজিষ্ট্রেশন এবং মেডিকেল চেক আপ হয় কেদারনাথ যাত্রীদের। যারা হেলিকপ্টারে কেদার দর্শন করেন, তাদের রেজিস্ট্রেশনও হয় এই ফাটা চটিতে। কাগজকলমের সেসব সরকারি কাজকর্ম শেষে আরও কিছুটা এগোলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে রামপুর, সীতাপুর আর তারও ওপরে বিখ্যাত শোনপ্রয়াগ (Sonprayag)।

মন্দাকিনীর সঙ্গে শোনগঙ্গার সঙ্গম এই শোনপ্রয়াগ। পাহাড়ি ঢাল ঘেঁষে এবড়োখেবড়ো রাস্তা বরাবর, ডানদিকে মন্দাকিনীর ধবংসলীলার নমুনা দেখতে দেখতে এরপর আরও ৬ কিলোমিটার এগোলে চলে আসবে বহুশ্রুত সেই জায়গা ‘গৌরীকুণ্ড’। এখান থেকেই দীর্ঘ কেদার যাত্রার মূলপর্ব অর্থাৎ ১৬ কিলোমিটার ট্রেকিং পথের শুরু। প্রথমদিন চলতে শুরু করে এতটা পথ একবারে চলে আসা সাধারণ যাত্রীদের কাছে বেশ কষ্টসাধ্য। তাই প্রথম দিনের বিশ্রামস্থল হতে পারে গুপ্তকাশী, রামপুর, সীতাপুর বা সোনপ্রয়াগ। পরদিন ভোরেই তাহলে এখান থেকে জিপে গৌরীকুণ্ড পৌঁছে কেদারনাথের উদ্দেশ্যে শুরু করা যাবে হাঁটাপথের সেই রোমাঞ্চকর যাত্রা।

কীভাবে, কতক্ষণে পৌঁছবেন সেই পথ ধরে, পথে আর কী কী বা দেখবেন এই সব গল্প নিয়েই আবার হাজির থাকব পরের পর্বে।

চলবে…

__________________________

*কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, কল্পেশ্বর – পঞ্চকেদারের রোমহর্ষক ভ্রমণকাহিনি এবার বঙ্গদর্শনে। পড়ুন পিয়ালী বসুর (Piyali Basu) ধারাবাহিক ‘পাখির চোখ পঞ্চকেদার’। প্রতি শুক্রবার, দুপুর ৩টেয়।

Developed by DXDasia