Other Ray : সত্যজিৎ রায়ের বিরল বিজ্ঞাপন, স্কেচ, সংগীত-ভাবনা নিয়ে তথ্যচিত্র

পরিচালক সত্ত্বার বাইরে সত্যজিতের অচেনা ভুবন

সত্যজিতের স্কেচে ভালো রাজা, খারাপ রাজা। ছবি সৌজন্যে- জয়দীপ মুখার্জি

সত্যজিৎ রায়ের পোস্টার-ভাবনা নিয়ে কথা হচ্ছিল বিশিষ্ট শিল্পী হিরণ মিত্রের সঙ্গে। দীর্ঘদিন বিজ্ঞাপন জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনিও।  তাঁর কথায়, “রায়সাহেবের ডিজাইনে একধনের সারল্য ও সর্বজনগ্রাহ্যতা ছিল। কমিউনিকেশন আর্ট বা আর্ট অফ কমিউনিকেশন-কে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে প্রয়োগ করা। অক্ষর কসরতের পাশাপাশি, নানা বার্তা, পোস্টারে ঢুকে পড়ত। যেমন ‘চিড়িয়াখানা’-র পোস্টারে নানা কথার শেষে ‘দেখুন’। এই ‘দেখুন’ তিনটি অক্ষর, শেষের দুটো অক্ষর ‘খুন’ লাল রঙে। অর্থাৎ এক নজরে বোঝা গেল একটা খুনখারাপির আবহ আছে চলচ্চিত্রে। তাতে রক্তপাত আছে কিনা, তা গৌন। কিন্তু  অক্ষর দুটি থেকে রক্ত ঝরে পড়লো।”

শুধু ‘চিড়িয়াখানা’ নয়, তাঁর সমস্ত সিনেমার পোস্টারেই ব্যবহার করেছিলেন ‘টাইপোগ্রাফিক্যাল জাগলারি’। ‘পথের পাঁচালি’র সারল্য, ‘জলসাঘর’-এর জমিদার বাড়ি, ‘দেবী’-তে চালচিত্র, একইসঙ্গে অক্ষরের ওপরে আলোর ছটা, গুপী গাইনের অক্ষরের নাচ, ভূতের নাচের মতো, ‘নায়ক’-এ তারা বা ফুটকিকে তারা বানানো, ‘মহানগর’-এ শহরের দিগন্তে বাড়ির ছাদ সারি সারি, ‘মহাপুরুষ’-এ মাছের আদল, ‘জনঅরণ্য’র অক্ষরের মেলা, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-তে দিন ও রাত, ‘চারুলতা’র সেলাইয়ের ফোঁড়, ‘ঘরে বাইরে’-র ‘ই’—এ আগুন, শেষ ছবি ‘আগুন্তুক’-এ অপরিচয়, ধাঁধা, আড়াল। পোস্টারে রং প্রয়োগের ক্ষেত্রেও খুব সচেতন থাকতেন।

অথচ, এসব গভীর ভাবে নিরীক্ষণ দূরের কথা পরিচালনার বাইরে বেরিয়ে, বিশেষত পথের পাঁচালির বাইরে যে সত্যজিৎ, তাঁর খবর ক’জন রাখেন? ‘দেশ’ পত্রিকা, নন্দন প্রেক্ষাগৃহের লোগো কার ডিজাইন, আজও অনেকেই জানেন না। জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’, পারিবারিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘এক্ষণ’ সহ নানান পত্রিকার একাধিক প্রচ্ছদ, নামাঙ্কন করেছেন, সেটাই বা ক’জন জানেন? তাঁর করা বিজ্ঞাপন অনেকেই দেখেননি। শিল্পী বা সুরকার সত্যজিৎ এভাবেই এখনও চর্চার অন্তরালে থেকে গেছেন।

চারুলতা ছবির পোস্টারের নামাঙ্কনে সেলাইয়ের মোটিফ

ঠিক এই অভাব বোধ থেকেই বেশ কিছু বছর আগে, বিশিষ্ট চলচ্চিত্র-নির্মাতা জয়দীপ মুখার্জি সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র করার ভেবেছিলেন। তখন সত্যজিৎ জীবিত। কিন্তু, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই ছবি তখন বানানো সম্ভব হয়নি জয়দীপবাবুর পক্ষে। আপেক্ষ নিয়েই দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে ২০২১ সালে পরিপূর্ণ রূপ রায় ‘আদার রে : দি আর্ট অফ সত্যজিৎ রে’। ৩৪ মিনিট ব্যাপী এই তথ্যচিত্রটি IFFI 2022-এর ইন্ডিয়ান প্যানোরামা বিভাগে প্রদর্শিতও হয়েছে।

বেশ কিছুদিন শান্তিনিকেতনে চিত্রশিল্প নিয়ে পড়াশোনা করার পর, পথের পাঁচালি বানানোর অনেক আগেই বিজ্ঞাপনী সংস্থা ডি জে কিমার-এ কাজ শুরু করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। বিজ্ঞাপনের ইলাস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সেসময়ের দিকপালেরা ছিলেন অন্নদা মুন্সী, মাখন দত্তগুপ্ত, ও সি গাঙ্গুলি। বিজ্ঞাপনের চাকরি বেশি দিন না করলেও বিজ্ঞাপনের লোকেদের (সুভাষ সেন, শাঁটুলবাবু, প্রশান্ত সান্যাল প্রমুখ) সঙ্গে তাঁর আমরণ বন্ধুত্ব ছিল। পথের পাঁচালির প্রথম প্রদর্শনীতে কলকাতার অ্যাডভার্টাইজিং ক্লাবের সদস্যদের দেখানো হয়েছিল। ১৯৯০-এ কলকাতার অ্যাডভার্টাইজিং ক্লাব আয়োজিত কলকাতার সেরা বিজ্ঞাপনকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য বিচারকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। সেটাই বিজ্ঞাপনের সঙ্গে ওনার শেষ ইন্টারঅ্যাকশন।

“১৯৯০/৯১ সাল নাগাদ আমার তৃতীয় ছবি, সেলুলয়েডে বানানো ‘গগনেন্দ্র’-র ভিএইচএস কপি নিয়ে দেখাতে গিয়েছিলাম সত্যজিৎবাবুকে, বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে। গগনেন্দ্র ঠাকুরকে নিয়ে কাজ করেছি শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন। ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে তো বটেই, ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের ঘনিষ্টতাও খুশি হওয়ার নেপথ্যে অন্যতম একটি কারণ ছিল। তখন আমার বয়স মাত্র ২৭। খুব ভয়ে ভয়ে বলেছিলাম যে, আপনার ওপর একটা কাজ করতে চাই। শুনে উনি বললেন, ‘আমার ওপর তো অনেক ছবিই হয়েছে, আবার কেন!’ বললাম, ‘আমার বিষয়টা একটু অন্যরকম। সিনেমা পরিচালনার বাইরে বেরিয়ে সত্যজিৎ রায়ের যে আর্ট ওয়ার্কস – পেন্টিং, বিজ্ঞাপন, প্রচ্ছদ, নামাঙ্কন, পোস্টার, কস্টিউম-ডিজাইন, সংগীত-ভাবনা –এসব নিয়েই কাজ করবো ভেবেছি।” বলছিলেন জয়দীপবাবু। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সত্যজিৎ রায়ের উপর বিভিন্ন গবেষণাধর্মী কাজ করে চলেছেন।

ডি জে কিমার-এ সত্যজিৎ রায়

বিজ্ঞাপনে সত্যজিৎ রায়

সেদিন জয়দীপবাবুর ইচ্ছে শুনে শেষে সম্মতিও জানিয়ে ছিলেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু, যেকোনও কারণে সেই সময় তথ্যচিত্রের কাজ আর এগোয় না। ১৯৯২ সালে চলে যান রায়বাবুও। তার বহু বছর পর ২০০৭ সাল নাগাদ বিড়লা একাডেমিতে ‘আদার ওয়ার্কস অফ সত্যজিৎ রায়’ এরকম একটা শিরোনামে একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। সেই সময় সন্দীপ রায়ের অনুমতি নিয়ে তিন দিন ধরে প্রদর্শনীতে গ্যালারি-শুট করেন জয়দীপ মুখার্জি। প্রচুর নথিপত্র পাওয়া যায়। কিন্তু, সেবারও স্পনসরের অভাবে থমকে যায় ছবিটা। সেই সময় ক্যাসেটে শুট হত, সেগুলোও কোথায় যেন হারিয়ে যায়। জয়দীপবাবুর কথায়, “মনের মধ্যে চাপা একটা দুঃখ তো ছিলই। তারপরে ২০২১ সালের প্রথম দিকে ‘মিনিস্ট্রি অফ কালচার, ইন্ডিয়া’-য় বিষয়টা নিয়ে কথা বলি। ছবির বিষয়বস্তু ওঁদের পছন্দ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত হলো ছবিটা!”

পথের পাঁচালির দৃশ্যাঙ্কন, ছবি সৌজন্যে- জয়দীপ মুখার্জি

হীরক রাজার দেশে ছবির জন্য পোশাক পরিকল্পনা, ছবি সৌজন্যে- জয়দীপ মুখার্জি

সম্পূর্ণ সাংগীতিক পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন সত্যজিৎ। সুর কোথায় ধরতে হবে, ছাড়তে হবে সেই পরিণত বোধ তাঁর ছিল। হবে নাই বা কেন! তাঁর ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোরও সুরকার ছিলেন। তুখড় বেহালা, বাঁশি, পাখোয়াজ বাজাতে পারতেন। অন্যদিকে, তাঁর মায়ের ঠাকুরদা শ্রী কালী নারায়ণ গুপ্তও ছিলেন একজন গুণী সুরকার। তাঁর মামার বাড়ির প্রায় প্রত্যেকেই গান গাইতে পারতেন। অন্যদিকে, শান্তিনিকেতনে যাঁদের সান্নিধ্যে এসেছিলেন, তাঁদের দৌলতে নন্দনতত্ত্বের পুরোটাই গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। নন্দলাল কিংবা বিনোদবিহারী ছাড়াও তাঁর আরেক মাষ্টারমশাই—অ্যালেক্স আরোন্সন – ইহুদি-জার্মান এই ইংরেজি শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর সময় কাটতো পাশ্চাত্য সংগীতের চর্চায়। সত্যজিত্যের ভাবনায় সংগীতের ছন্দ বিষয়ের ভেতরই নিহিত থাকে। তাই ফিল্মের বিষয় নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে ফিল্মের সামগ্রিক সাংগীতিক কাঠামোর একটা আভাস মনে কোথাও থাকে। সেই অস্পষ্ট আভাসের কাঠামোর ভেতরই গল্পটা তৈরি হতে থাকে। আবার গল্পের এই তৈরি হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই সাংগীতিক কাঠামো খানিকটা স্পষ্ট চেহারা নেয়। গল্পের শুরু, উত্থান, পতন, গতি সেই সাংগীতিক কাঠামোর সংগতিতে প্রাসঙ্গিক হয়। ভারতীয় সংগীতের ঘরাণায় ‘সুরকার’ সত্যজিৎ যে অবদান রেখে গেছেন, তা অদ্বিতীয় –এই বিষয়টিই ধরা হয়েছে 'আদার রে'-তে। সব মিলিয়ে এই তথ্যচিত্রে জয়দীপ মুখার্জি মূর্ত করেছেন এক অতুলনীয় ব্যবহারিক চিত্রশিল্পীকে, সুরের এক জাদুকরকে। 

পথের পাঁচালি তৈরি হল কীভাবে, সেটা নিয়ে ২০০৭ সালে জয়দীপবাবু একটা ছবি করেন। ছবির জন্য তাঁকে লন্ডন যেতে হয়েছিল। তখন স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবরো একটা দীর্ঘ বাইট দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে। সেই বক্তব্যের বেশ কিছুটা অংশ তিনি ব্যবহার করেছেন ‘আদার রে’-তে। ছবিতে সত্যজিতের সংগীত ভাবনা নিয়ে বলেছেন সন্দীপ রায়। পথের পাঁচালির সংগীত নিয়ে দারুণ বিশ্লেষণ করেছেন প্রয়াত সংগীতজ্ঞ ভাস্কর চন্দ্রভারকর। সত্যজিতের আর্ট প্রসঙ্গে বলেছেন পরিচালক গৌতম ঘোষ ও রিচার্ড অ্যাটেনবরো।

‘আদার রে’ এই মুহূর্তে রয়েছে সল্টলেকের ইস্টার্ন জোনাল কালচারাল সেন্টার (EZCC)-এ। এছাড়াও প্রদর্শিত হচ্ছে বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে। পরবর্তী সময়ে ইউটিউবে দেখা যাবে বলে জানিয়েছেন জয়দীপ মুখার্জি।  

Developed by DXDasia