নয়া শিক্ষানীতি কতটা বৈপ্লবিক?

সারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আসতে চলেছে ব্যাপক রদবদল

সারা পৃথিবী এবং অবশ্যই ভারতবর্ষ এখন কোভিড সন্ত্রাসে ত্রস্ত। প্রায় পনেরো লক্ষেরও বেশি মানুষ এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাস হানায় বিপর্যস্ত। সারা ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্রত্যেকদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জে প্রায় ক্লান্ত, তখন এই দেশের কেন্দ্রীয় সরকার এক নীতিগত পরিবর্তন সামনে আনল। জনস্বাস্থ্যগত কোনো নীতি না, শিক্ষানীতি এল। ক্যাবিনেটে পাশ হল। আর বহু পরিবর্তনের সুপারিশ কার্যকর হতে চলেছে আগামী দিনে। সমগ্র নাতিদীর্ঘ আলোচনার সূত্রপাতে ফিরে যেতে হয় প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে, ১৯৬৯ সালে, যখন লিওনার্ড নাডলার নামে এক বিশিষ্ট আমেরিকান সামগ্রিক মানব সম্পদ উন্নয়নের ধারণা দিয়েছিলেন বিশ্ববাসীকে। বস্তুত এক যুগান্তকারী কনসেপ্টে প্রায় বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন শিক্ষানুরাগী মানুষ-সহ সমাজকর্মীরা। যদিও এই উপমহাদেশের পরিকাঠামোয় মানব সম্পদ উন্নয়ন নামক এই কার্যপ্রণালীটি গ্রহণ করতে ও কার্যকর করতে লেগে যায় আরো বিশ বছর। ভারতের তরুণতম প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির সময়ে, ১৯৮৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। শিক্ষামন্ত্রককে মিশিয়ে দেওয়া হয় এই নব-প্রতিষ্ঠিত মন্ত্রকটির সঙ্গে। তারপরের ইতিহাসটিও বেশ উজ্জ্বলই বলা চলে। ইউজিসি, এআইসিটিই-সহ বিভিন্ন শিক্ষা-শিক্ষণ, প্রযুক্তিবিদ্যা ইত্যাদি সমস্ত শিক্ষামূলক সংস্থার নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদন প্রদানকারী মৌলিক ও প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ  অভিভাবক রূপেই কাজ করে আসছিল এই দপ্তর। শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ (বিএড) বাধ্যতামূলক করা-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সংস্কারধর্মী সিদ্ধান্তে শিলমোহর দিয়ে এসেছে এই মন্ত্রক। যদিও ইতিবাচক, নেতিবাচক, এই দুই ধরনের সমালোচনাই সামনে এসেছে বহুবার। কিন্তু মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক কখনই তার মূল সংস্কারধর্মী পদক্ষেপ থেকে পিছপা হয়নি, একথা বলাই বাহুল্য।

১৯৫০ সালে গঠিত হওয়া  অত্যন্ত সফল পরিকল্পনা কমিশনকে বন্ধ করে, সম্প্রতি তৈরি হয়েছে নীতি আয়োগ। ঠিক কী নীতিতে নীতি আয়োগ এগোচ্ছে তার মূল্যায়ন আগামী ভারত নিশ্চয় করবে। আজ ভারতবর্ষ যে সাক্ষী হল এক নজিরবিহীন  অভূতপূর্ব পদক্ষেপের, একথা নির্দ্বিধায় বলা চলে। রমেশ পোখরিয়াল নামটি মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের মন্ত্রী থেকে নতুন শিক্ষামন্ত্রীতে পরিবর্তিত হল শুধু তাইই নয়, যে কোনো অর্থেই তিনি যে ইতিহাসে রয়ে গেলেন, একথা ভীষণ রকম অনিবার্য। ভারতবর্ষের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, আজকের শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল। প্রায় যুগান্তকারী পদক্ষেপে শুধুমাত্র যে মন্ত্রকের নামই পরিবর্তন হল তাইই নয়; এককথায় ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দিয়ে আকস্মিকতারও অধিক আকস্মিকতায় যেন এক তুমুল বৈপ্লবিক পরিবর্তনের গন্ধ পাচ্ছে এই দেশ।

১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল অফ টেকনিক্যাল এডুকেশন, যা কিনা ১৯৮৭ সাল অবধি ভারত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা সংস্থা হিসেবে কাজ করত এবং নেহেরু, আজাদের  স্বপ্নের ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন যা ১৯৫৬ সাল থেকেই ভারত সরকারের এক অতি গুরুত্ববহ বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে প্রবল ভাবেই সফল, এই দুটি সংস্থা লোপ পেল। শিক্ষামন্ত্রকের এক ছাতার তলায় নিয়ে আসা হল সমস্তটাকে। নতুন শিক্ষামন্ত্রক ভারতীয় শিক্ষাক্ষেত্রে বহু মৌলিক পরিবর্তনের সুপারিশ করলেন এবং ক্যাবিনেটে তা অনুমোদিত হল জমকালো ভঙ্গিমায়। স্নাতক স্তরের সময়সীমা ৩ বছর বা ৪ বছর রাখা হল। স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশুনোও  ১ বছর বা ২ বছরে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব এসেছে। অতি তাৎপর্যপূর্ণভাবে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার পরে এমফিল নামক যে গবেষণাধর্মী কোর্স ছিল, সেটিও বিলোপ করার পথে নতুন শিক্ষানীতি। এছাড়াও বিদ্যালয় পঠন-পাঠনের আঙিনায় নিয়ে আসা হচ্ছে কিছু সংস্কার। যদিও সমস্তটাই ধারণাতীত তা নয়। এমন বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যেগুলি নিয়ে ইতিপূর্বে অনেক প্রদেশ নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছে, কখনো ব্যর্থ বা অব্যর্থ হয়েছে। যেমন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদানে জোর দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এই পরীক্ষার সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষাগার ছিল, বেশ কয়েক দশেক ধরেই। তদানীন্তন সরকার ‘মাতৃভাষা মাতৃদুদ্ধের সমতুল্য’, এই ধারণায় জোর সওয়াল করতেন এবং প্রাথমিক স্তরে ইংরাজি পড়ানো হয়নি বেশ দীর্ঘ সময়। এর পরিণাম যে মোটেও আশানুরূপ হয়নি, একথা বলাই বাহুল্য। যদিও নবনির্মিত ভারতীয় শিক্ষামন্ত্রক তিনটি ভাষা অধ্যায়নের কথা বলছেন এবং যেহেতু ক্লাসিকাল বা ধ্রুপদী ভাষা শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে ভারতীয় ক্লাসিকাল ভাষা সংস্কৃতর  উপর বিশেষ গুরুত্ব যে দেওয়া হবে, যা আশাতীত নয়। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরাজি ভাষার অবস্থান বিভিন্ন প্রদেশে ঠিক কেমন হবে তা সময় বলবে। এছাড়াও আরো বড়ো পরিবর্তন এসেছে বিদ্যালয় শিক্ষায়। ভারতের চিরাচরিত ১০+২ গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে কারিক্যুলাম নির্ভর ৫+৩+৩+৪ ধারণার প্রবর্তন করা হতে চলেছে। ভোকেশনাল শিক্ষার সুযোগ থাকবে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই। অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থাকে মজবুত করার কথাও বলা হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। ‘এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত’ এই মন্ত্র নিয়ে তৈরি হতে যাচ্ছে, ‘National Curriculum and Padagogical Frame work for early childhood care and education’ নামক সংস্থা যা শিশু মনস্তত্ত্ব  ও শিশু শিক্ষার বিষয়টি দেখবে। এছাড়াও সামগ্রিক বিদ্যালয় শিক্ষার মূল্যায়ন এর জন্য তৈরি  হতে চলেছে, ‘Performance Assessment Review Analysis of knowledge for Holistic Development’-এর মতো সংস্থা। PARAKH এর মতো তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা সারাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সরজমিন মূল্যায়ন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখনি একদমই বলা যাবে না এইসব কিছুই পর্বতের মূষিক প্রসব করবে। এমন হতেই পারে দীর্ঘ প্রতিক্ষীত বিকাশ ভারতীয় শিক্ষাঙ্গনের উন্মুক্ত আঙিনায় আবির্ভূত হবেন, এই চমকে দেওয়া পরিবর্তনের হাত ধরে।

যদি আকস্মিক সর্বাঙ্গীণ পরিবর্তনকে বিপ্লব বলা যায়, তাহলে ভারতীয় শিক্ষাক্ষেত্র কি এক বিপ্লবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে? নাকি সবকিছু যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থাকবে। সংবাদে প্রকাশ, জিডিপির মাত্র ০.৪৪ শতাংশ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। কার্যত সমস্ত দ্বিধার উত্তর দেবে সময়। এই উপমহাদেশ চিরদিনই সদর্থক এবং নতুন ধারণাকে আলিঙ্গন করেছে নির্দ্বিধায়। এক্ষেত্রেও তার অন্যথাকরণ হবেই না হয়তো। আজকের এই আমূল পরিবর্তনের গর্ভে কি জন্ম নেবে আগামী ভারতের নবজাতকের ভবিষ্যৎ? ভবিষ্যতই বলবে আজকের এই অধ্যায় ঠিক কী উদাহরণ প্রস্তুত করছে একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান প্রজন্মের জন্য।

Developed by DXDasia