সেদিনের ২১ জুলাই ছিল বৃহস্পতিবার, অভিযানের মূল দাবি ছিল, ‘নো কার্ড নো ভোট’
আজ মঙ্গলবার ২৭তম ২১ জুলাই। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২১ জুলাই যে পালবদলের সূচনা করেছিল, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে গিয়ে সেটা শেষ হয়। রাজনীতিতে এই ধরনের একেকটা আন্দোলন থাকে যাকে পালা বদলের সূচনা বলা যায়। যেমন, ১৯৬৫-৬৬-র খাদ্য আন্দোলন। ১৯৬৭ থেকে যে পালা বদল স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। বা, বলা যেতে পারে বোফোর্স-এর কথা। যে কামান কিছুদিনের জন্য উড়িয়ে দিয়েছিল কংগ্রেসকে। জরুরি অবস্থা। ৩০ বছরের কংগ্রেসের সাজানো বাগান চুরমার হয়ে গিয়েছিল ১৯৭৭-এর ভোটে। যদিও প্রগতির আন্দোলন হিসেবে ইতিহাসে জায়গা পাবে না কোনও দিনই, কিন্তু মানতেই হবে, রাম মন্দির আন্দোলনও ছিল পালা বদলের আন্দোলন। কিন্তু এখানে যতগুলি পালা বদলের আন্দোলনের কথা বলা হল, তার সব ক’টির পিছনেই ছিল শক্তিশালী পার্টি এবং দক্ষ নেতৃবৃন্দ। কিন্তু ২১ জুলাইয়ের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক ভূমিকাটাই সব থেকে বড়ো। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে অনেকে তুলনা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানকে। কিন্তু ফারাক আছে। কেজরিওয়ালের জমিটা তৈরি করে দিয়েছিল আন্না হাজারের আন্দোলন। মমতার জন্য কোনও আন্না হাজারে ছিলেন না।
সেই ২১ জুলাই ২৭ বছরে পড়ল। আমি সাংবাদিক হিসেবে যতগুলো ২১ জুলাই কভার করেছি, প্রায় প্রত্যেকটাতেই বৃষ্টি পেয়েছি। প্রত্যেকবারই মমতাকে বলতে শুনেছি, এই বৃষ্টি হল শহিদের মায়ের চোখের জল। বৃষ্টি হত বলে মঞ্চ ইত্যাদি নিয়ে সভার আয়োজকদের খুব মাথাব্যথা থাকত। এবার অবশ্য সেই সমস্যা নেই। কোভিড-১৯-এর দাপটে সভা-সমিতি এখন বন্ধ। হবে ভার্চুয়াল সভা। এই সভা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রবল কৌতূহল। তাছাড়াও, যদি দেখা যায়, ভার্চুয়াল সভায় মানুষ অভ্যস্থ হয়ে উঠছে, তাহলে, বলা যায় না, ভবিষ্যতে কলকাতার মতো ঘিঞ্জি শহরে হয়তো ভার্চুয়াল সভাই মানুষকে বাড়তি যান-জট থেকে একদিন মুক্তি দেবে।
আরও পড়ুন
সুকুমারের ‘হযবরল’ অসঙ্গতির উচ্ছ্বাস
বেশিরভাগ ২১ জুলাইয়ের দিন বৃষ্টি হলেও, ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই কিন্তু বৃষ্টির দিন ছিল না। সেদিনটা খুব গরম ছিল। ওই দিন দুপুরের পর কলকাতার রাস্তায় ১৩ জন যুবক পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন। এবং প্রত্যেকটি যুবক ছিলেন অতি দরিদ্র পরিবারের। বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে এই দিনটিকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৮৪ সালে। সে বছরই ভোটের আগে দেহরক্ষীর হাতে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু। সে বছরই লোকসভা ভোটে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংসদ হলেন। দেখা গেল, টিনের চালের বাড়িতে থাকা একটা মেয়ে বাংলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে গরিব মানুষের প্রতিবাদকে ভাষা দিতে। নির্যাতিতের পিঠে হাত রাখতে। মমতা তখন কংগ্রেসে। দলের কনিষ্ঠতম নেত্রী। প্রথম থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল একটা ঝড়ের গতি। মমতা যতই আন্দোলনমুখী হচ্ছিলেন, কংগ্রেস নেতাদের অস্বস্তি ততই বাড়ছিল। কংগ্রসের মধ্যে যে একটা নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে, বামপন্থীদের তা চোখ এড়াল না।
কেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়োজন হয়েছিল? কারণ, ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসা বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ততদিনে অ-বাম সুলভ আচরণ, মানবতাবিরোধী, ক্ষমতালোভী কাজ-কর্মের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। প্রকাশ্যে রাস্তায় আগুনে পুড়িয়ে আনন্দমার্গীদের হত্যা, মরিচঝাঁপি ঘটে গিয়েছে। শিকড় ছড়াতে শুরু করেছে পার্টিতন্ত্রের। ভোট-দুর্নীতি বাড়তে শুরু করেছে। উল্টোদিকে বিরোধী রাজনীতির জায়গাটা ছিল প্রায় শূন্য। সেই শূন্যস্থান ভরাটের একটা চাহিদা ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু ১৯৮৪ সালের নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছিল সন্দেহ নেই। একইসঙ্গে ১৯৮৪-এর লোকসভা ভোটে মমতার জয়, বঙ্গ রাজনীতিতে একটা নতুন যুগের সূচনা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
মমতা আওয়াজ তুললেন ‘নো কার্ড নো ভোট’, এই দাবিতে রাজ্য জুড়ে আন্দোলনের ডাক দিলেন
১৯৯০ সালে যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী হলেন মমতা। সে বছরই ১৬ অগস্ট বামফ্রন্টের ‘সার্বিক ব্যর্থতা’, মূল্যবৃদ্ধি, কংগ্রেস কর্মীদের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে রাজ্য যুব কংগ্রেস কলকাতায় হরতালের ডাক দেয়। ওই দিন হরতাল চলাকালীন হাজরার মোড়ে, পুলিশের মতো হেলমেট পরে 'পুলিশের' লাঠি দিয়ে পুলিশের সামনেই মমতার উপর হামলা হল। লাঠির আঘাত করা হয় সরাসরি মাথায়। আক্রমণ চালানো হয়েছিল খুন করার জন্যই। এক পুলিশ অফিসার রুখে দাঁড়ানোয় অপারেশন ব্যর্থ হয়। এসএসকেএমে যে ডাক্তাররা সেদিন মমতাকে প্রথমে দেখেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আমি পরে কথা বলেছিলাম। তাঁরা বলেছিলেন, একটু এদিক ওদিক হলে ওই দিন মমতার মৃত্যুও হতে পারত। ডাক্তারদের দু’জন আমাকে বলেছেন, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু রাতে হাসপাতালে ফোন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেমন আছেন, বিপদ কেটে গিয়েছে কী না, এই সব খোঁজ নিয়েছিলেন। ঘটনার দিন, পুলিশ বহুক্ষণ আক্রমণকারীদের পরিচয় গোপন রেখেছিল। বিকেলে মহাকরণে আমরা জ্যোতি বসুকে এই নিয়ে প্রশ্ন করলে, তিনি বলেছিলেন, ‘বনধ্ বিরোধীরা ওঁকে মেরেছে’। সরাসরি নিজের পার্টির নাম না বললেও সবটাই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
মমতা সুস্থ হয়ে ফিরলেন। কিন্তু তত দিনে তিনি বুঝতে পেরেছেন, এভাবে হবে না, দলটাকে নেতৃত্ব দিতে হবে সামনে দাঁড়িয়ে। দলের সভাপতি পদের জন্য লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। বিপরীতে দাপুটে সোমেন মিত্র।
১৯৯২ সালের ৮ এপ্রিল মহারাষ্ট্র নিবাস হলে ভোট হল। মমতা হারলেন। কিন্তু তিনি যে লড়াইয়ে আছেন, সেই বার্তা গেল দলের নিচুতলা পর্যন্ত। এল ১৯৯২, ৮ জুন। বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন। সকাল থেকেই শুরু হয়ে গেল বুথ দখল আর জাল ভোট পড়া। বিজনসেতুর নিচে শুরু হয়ে গেল খণ্ডযুদ্ধ। কংগ্রেস নেতাদের কোনও দেখা নেই। মমতা রাস্তায় নামলেন। এজেন্ট তুলে নিয়ে ঘোষণা করলেন তিনি প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। শুরু হল প্রতিবাদ। গড়িয়াহাট মোড়ের একটু দূরে মমতা যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন, পুলিশ গুলি চালাল গড়িয়াহাট মোড়ে। এক পথচারীর মৃত্যু হল। ক্ষিপ্ত সমর্থকেরা পাথর ছুঁড়তে শুরু করল। আমাদের গাড়িতেও বিরাট বিরাট দু’টো আধলা ইট এসে পড়ল। কোনও মতে গাড়ি ঘুরিয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা। এখনও গড়িয়াহাট মোড়ের কাছে একটু খুঁজলে মমতার তৈরি করা সেই নিহত পথচারীর ‘শহিদবেদী’ দেখতে পাবেন।
রবীন দেব উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে বিধানসভায় ঢুকতেই তাঁকে 'রিগিং দেব' সম্বোধন শুনতে হল। মমতা বুঝলেন, নির্বাচন কমিশন কঠোর না হলে, সচিত্র পরিচয়পত্র চালু না হলে, স্বচ্ছ নির্বাচন না হলে ভোট-দুর্নীতি আটকানো যাবে না। মমতা আওয়াজ তুললেন 'নো কার্ড নো ভোট'। এই দাবিতে রাজ্য জুড়ে আন্দোলনের ডাক দিলেন। এই দাবিতে ১৯৯২ সালের ২৫ অগস্ট মমতা ব্রিগেডে জমায়েত ডাকলেন। বিপুল জনসমাবেশ করে মমতা প্রমাণ করলেন, তিনিই এই রাজ্যের একমাত্র বিরোধী শক্তি। সেদিনের সেই ব্রিগেড উপচে পড়া ভিড়ে আনা হয়েছিল এক বিরাট মাপের ঘণ্টা। নাম দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুঘণ্টা। মমতা বাজালেন সেই সিপিএমের 'মৃত্যুঘণ্টা'। সেই ঘণ্টার ছবিও বেরিয়েছিল খবরের কাগজে।
এই ছিল ১৯৯৩-এর ২১ জুলাইয়ের পরিপ্রেক্ষিত। সেদিনের ২১ জুলাই ছিল বৃহস্পতিবার। সেই মহাকরণ অভিযানের মূল দাবি ছিল, 'নো কার্ড নো ভোট'। মোট চার পাঁচ জায়গায় সমাবেশ হয়েছিল। গুলি চলল, মেয়ো রোড আর এসপ্লানেড ইস্টে। ১৩ জন যুবকের মৃত্যু হয়েছিল। প্রায় সবারই গুলি লেগেছিল কোমড়ের উপরে। গুলি চালানো ছাড়া কি কোনও পথ ছিল না সেদিন? টিবোর্ডের সামনের জমায়েত সামলানোর দায়িত্ব ছিল তখনকার ডিসি ট্র্যাফিক চয়ন মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর ওখানে বৃষ্টির মতো ইট পড়েছিল। চয়নবাবু পরে আমাকে বলেছিলেন, তাঁর আত্মজীবনীতেও লিখেছেন, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের একটা দল নাগাড়ে ইট ছুড়ে যাচ্ছিল। তাদের সামলাতে লাঠি, টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করতে হয়েছিল। কিন্তু গুলি চালানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না।
গুলি চলল মেয়ো রোড-সহ অন্য জমায়েত কেন্দ্রগুলিতে। ১৩টি প্রাণ লুটিয়ে পড়েছিল। আক্রান্ত হয়েছিলেন মমতাও। অনেকেই মনে করেন, এই হত্যকাণ্ড ঘটিয়ে মমতাকে একটা চূড়ান্ত শিক্ষা দিতে চেয়েছিল সিপিএম। সিপিএম আরেকটা বড়ো ভুল করল। এত বড়ো একটা ঘটনায় নির্বিকার থাকল। অনেকে ভেবেছিলেন পুলিশ কমিশনারকে সরিয়ে দেওয়া হবে। সে পথেও হাঁটল না সিপিএম। পশ্চিমবঙ্গে বড়ো মাপের হত্যাকাণ্ডের কথা যদি বলতে হয়, অবশ্যই প্রথমে বলতে হবে ১৯৫৯ সালের অগাস্টে খাদ্য আন্দোলন দমনে বিধান রায়ের পুলিশের গুলিতে আন্দোলনকারীদের মৃত্যু, দ্বিতীয় অবশ্যই ১৯৭১-এর অগস্টে কাশীপুর-বরানগর হত্যাকাণ্ড, তৃতীয় ১৯৯৩, ২১ জুলাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা জনসমাবেশে পুলিশের গুলিতে ১৩ জনের মৃত্যু।
প্রায় প্রত্যেক বছরই ২১ জুলাইয়ের সভায় কিছু না কিছু চমক থাকে। এবারের ২১ জুলাই, ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের আগে শেষ ২১ জুলাই। কেউ কেউ ইঙ্গিত দিচ্ছেন বড়ো চমক থাকবে। আবার কারও মতে, ভার্চুয়াল সভাটাই তো সব থেকে বড়ো চমক। আর কী চাই!