সার্বিক বিপন্নতার শিকার আজ বাংলা ভাষা। কোন্ পথে মুক্তির উপায় খুঁজব আমরা
মার্কিন ঔপন্যাসিক ফিলিপ রথ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত চেক লেখক মিলান কুন্দেরা বলেছিলেন—“মানুষ জানে সে অমর নয়। কিন্তু সে বিশ্বাস করে তার জাতি ও তার ভাষার মৃত্যু নেই… রুশ অধিগ্রহণের পর প্রত্যেকটি চেক নাগরিকের মনে হয়েছিল, সে তার নিজস্ব ভাষা হারিয়ে ফেলবে…”। আসলে একটা ভাষা মানে কেবল কিছু অক্ষরের সমষ্টি নয়, ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতির সবটুকু অস্তিত্ব আর সংস্কৃতির যোগ। কিন্তু পৃথিবীতে কোনও ভাষারই বৃদ্ধি, বিকাশ, আয়ু নিছক ওই ভাষার উপর নির্ভর করে না। আরও হাজারটা উপাদান নির্ধারণ করে ভাষার বেঁচে থাকা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না। সেই উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতিসত্তার অহং, আত্মমর্যাদাবোধ, লড়াইয়ের মানসিকতা, পুঁজির সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক, আধিপত্যমূলক অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সেই ভাষাগোষ্ঠীর যুঝবার ক্ষমতা ইত্যাদি। বাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। পূর্ববঙ্গে ১৯৫২-র বাংলাভাষার দাবিতে লড়াই ও ১১ জনের আত্মাহুতি, ১৯৬১ সালে আসামের শিলচরে বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য ১৯ জন শহিদের প্রাণ বলিদান— এই সবটুকু ইতিহাস ছাপিয়েও আজ যেটা বাস্তব সত্য তা হল— সর্বভারতীয় প্রেক্ষিতে, নতুন গ্লোবালাইজড দুনিয়ায়, পুঁজি আর পণ্যরতির সঙ্গে এক তীব্র অসম লড়াইয়ে ক্রমশই পিছু হটছে আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা। আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত বর্গ আজ তাদের উত্তর-প্রজন্মকে আর বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়ায় না। ধুঁকছে সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক শহর-জেলার সরকারি-বেসরকারি বাংলা বইয়ের লাইব্রেরি। এক সার্বিক বিপন্নতার শিকার আজ বাংলা ভাষা। কোন্ পথে মুক্তির উপায় খুঁজব আমরা? একটা অপসৃয়মান মুমূর্ষু ভাষার উত্তরাধিকার নিয়ে বিলাপ করব? না কি নতুন পথ খুঁজব আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষাকে বাঁচানোর?
স্বাধীনতার ঠিক পরেই বাংলা ভাষা নিয়ে একটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক প্রবন্ধ লিখেছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। লেখাটির নাম— ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’। সেই পঞ্চাশের দশক শুরুরও আগে লেখা প্রবন্ধে বাংলা ভাষার আসন্ন সংকটের তিনটি দিক তুলে ধরেছিলেন জীবনানন্দ। আশ্চর্যের হলেও সত্যি, সেই দিকগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পরবর্তী কালেও। জীবনানন্দ বলেছেন, একটা ভাষার উৎকর্ষ ও আয়ু দীর্ঘজীবী হয় সেই ভাষায় শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের ধারাটি বহমান রয়েছে কি না, তার উপরে। দুঃখজনক হলেও তাঁর মনে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের পর আর সেই মাপের কোনও যুগপুরুষের আশু আবির্ভাবের আর কোনও সম্ভাবনা নেই বাংলা ভাষায়। অর্থনৈতিক কুম্ভীপাকে আজ বাংলার সাহিত্যিকদের জীবন এতোটাই জর্জরিত যে, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সঠিক সংস্থান না হওয়া পর্যন্ত বাঙালি শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকেরা তাঁদের সেরা ক্ষমতাটুকুর সদ্ব্যবহার করতে অক্ষম আজ। দ্বিতীয়ত, দেশভাগের পর পূর্বতন বৃহৎ বঙ্গের ভৌগোলিক সীমা ছোটো হয়ে গেছে ভারতবর্ষে। বিহার-আসামের বাংলাভাষী অঞ্চলগুলোয় অন্য আঞ্চলিক ভাষার আধিপত্য স্বাধীন ভারতে বাস্তব। তার চেয়েও বড়ো কথা কেন্দ্রীয় সরকার হিন্দিকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা করার পর একটি আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে বাংলা পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সাপোর্ট পাবে না। বিশ্বের অন্য বহু ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোয় এক দেশে একাধিক ভাষার সমানাধিকারের কথা ভাবা হয়েছে। ভারতে তা হয়নি। জীবনানন্দ সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে। বলেছেন, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র বাংলাকে, বিশেষত গোটা পূর্ববঙ্গ ব্যাপী বাংলার অসংখ্য উপভাষাকে ধীরে ধীরে হত্যা করবে। এর ফলে উর্দুর চাপে বিশ্বের বৃহত্তম বাংলাভাষী রাষ্ট্রটির নিজস্ব ভাষা ও কৃষ্টি বিপন্ন হয়ে পড়বে। তখনও বাহান্নর ভাষা-আন্দোলন শুরু হয়নি। অথচ কবিরা ত্রিকালদর্শী হন। জীবনানন্দও স্বাধীন বাংলাভাষী রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপ্ন ও প্রয়োজনীয়তা জ্ঞাপন করেছেন।
আজ জীবনানন্দের সবকটি আশঙ্কাই সত্য হয়েছে। পূর্ববাংলায় ভাষার ভিত্তিতে নতুন স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গঠিত হলেও মুসলিম মৌলবাদী শক্তি আজও বিভিন্ন ভাবে সেখানকার মুক্ত বাংলা ভাষা-চর্চাকারী লেখকদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনছে। সবচেয়ে বড়ো কথা উত্তর-বিশ্বায়িত এই পৃথিবীতে, পুঁজিবাদী গ্লোবালাইজেশনের পর বাংলার মতো স্থানিক ভাষা আজ প্রত্যক্ষ বিপন্নতার সম্মুখীন। একথা কে না জানে, পুঁজি যার, ভাষা তার— এটাই আজকের দুনিয়ার সত্য। কলকাতার ৫৬% জনসংখ্যা আজ অ-বাংলাভাষী, কারণ অবাঙালি পুঁজির দাপটে নিঃস্ব বাঙালি আজ কোণঠাসা। এই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে গেলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী প্রত্যয় নিয়ে নতুন লড়াইয়ে নামা যেমন দরকার, তেমনই প্রয়োজন বাঙালি পুঁজির বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা। পুঁজিবাদী বিশ্বে জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটানো ছাড়া ভাষাকে মর্যাদায় পৌঁছে দেবার আর কোনও শর্টকাট রাস্তা নেই। আর এপার বাংলায় মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত সহ আপামর বাঙালি যতোদিন বাংলা ভাষার গৌরবহীনতায় লজ্জা বোধ করতে না শিখবে, নিজেদের উত্তর-প্রজন্মকে বাংলা ভাষায় নতুন করে দীক্ষা না দেওয়াবে, ততোদিন বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য কোনও সার্থক পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
(শিরোনামে কবীর সুমনের গানের পঙ্ক্তি ব্যবহৃত)