সুদূর ডেনমার্ক থেকে ভেসে আসা গল্প বাংলায় নাট্যরূপ পেল চন্দন সেনের হাতে

রূপকথা। এ বড়ো আদরের শব্দ। রহস্যঘন মাধুর্য মেশানো এর শরীর। ঐন্দ্রজালিক মায়াঘোর জড়ানো এর অবয়ব। হৃদয়ের সুপ্ত বাসনাগুলির প্রকাশস্থল। কিন্তু এ কি অবাস্তব? অলীক? না-কি আমাদের বিড়ম্বনার মাঝে স্নিগ্ধ শান্তিময় সত্য? সত্য বটে কিন্তু সর্বদাই সুখময় কি? এ রূপকথা সুখের নয়। এ তো বড়ো সুখের সময় নয়। তবে এ সত্য তাই সুন্দর বটে।

রূপকথাটির জন্ম সুদূর ডেনমার্কে। হান্স আন্ডারসনের দেশে। গল্প ভেসে এলো রুশ দেশে। ইয়েভঘনি শার্ভাটাস্ তৈরি করলেন নাটক। সেখান থেকে বাংলায় হল ‘ছায়াবাজি’। নির্মাণ চন্দন সেন।

ছোটোদের নিয়ে চিন্তা নেই। ওরা রূপকথায় বিশ্বাস করে। সহজেই। বড়োরা অনেকেই রূপকথা পছন্দ করে না। বড়োরা জেনে গেছে সব রূপকথার শেষটা সব সময় সুখের হয় না। এ রূপকথা শেষতক পৌঁছয় আর এক রূপকথার খোঁজে। আসলে এই খোঁজটাই সত্য, খোঁজটাই সুন্দর।

ইতিহাসবিদ সাভান্ত আসে এক নতুন দেশে। যেখানে রূপকথারা সত্যি হয়ে ওঠে। না-কি সত্যিগুলোই রূপকথার মোড়কে প্রকাশ পায়! সেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গল্প। বন্দিনী রাজকুমারীর গল্প। আন্নুইজিয়াটা– হোটেল মালিকের কিশোরী কন্যা শোনায় সে গল্প। তাদের স্বপ্ন দেখা রাজার গল্প। রাজার নির্দেশের কথা। প্রাসাদের বাইরের হৃদয়বান বুদ্ধিমান কোনও মানুষকে যাতে রাজকুমারী বিয়ে করেন সে কথা। রাজকুমারীকে ভালোবেসে সাভান্ত কামনা করে অন্তত নিজের ছায়াটুকু দিয়েও যদি সে ঘিরে রাখতে পারতো রাজকুমারীকে!

এই নাট্যের আলোক বিন্যাস জয় সেনের। আলো ছায়ার কারিগরিতে ছায়া আলাদা হয়ে গেল সাভান্তের শরীর থেকে। সাভান্ত আসলে পৌঁছেছে সেই দুনিয়ায় যেখানে স্বপ্ন পূরণ হয়। এক বিকল্প জগৎ, এ জগতেরই ছায়া। এখানকার রাজনীতি অর্থনীতি চেনা দুনিয়াটার কথাই বলে, শুধু এমন ভাবে বলে যাতে দর্শক আমোদ পায়। তার পর ভেবে দেখে আসলে তার সামনে ধরা হয়েছে এক আয়না। যে ছায়াটি তাতে পড়ছে তা নিজেদেরই। চেনা চারপাশটিরই। হোটেল মালিক পিয়েত্রো, সাংবাদিক সীজার কিংবা সুন্দরী গায়িকা ইউলিয়া আমাদের চাওয়া পাওয়াগুলো ঝালিয়ে নেয়। আমরা খেয়াল করি আমরা নিজেদের চারপাশকে কম চিনি, আরও কম চিনি নিজেদের। ছায়া তো অনুগামী। অনুগামী না কি অন্তর্গত সত্ত্বা– স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে দিই কাকে? প্রতি মুহূর্তে আমার হয়ে আমার কাজটি অন্যকে দিয়ে করিয়ে নিতে চাই কিন্তু খেয়াল করি না, স্বীকার করি না তার অস্তিত্ব।

একটি শ্রেনীর মধ্যে অন্য শ্রেনীগুলোর অবস্থান বিষয়ে অসচেতন উদাসীনতা, যা পেয়েছি তা পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে ধন্ধ এমনকি অনুগামীর অস্তিত্বে নিরুত্তাপ সাভান্ত মুখোমুখি হয় তার ছায়ার। সাভান্ত ক্রিশ্চিয়ান থিওডোর এর সামনে দাঁড়ায় থিওডোর ক্রিশ্চিয়ান। যে ছিল পায়ের তলায়, কিন্তু ছিল চরম নমনীয়তায়, কখনও এমন ভাবে যখন তাকে দেখাই যায় নি আবার কখনও হয়েছিল তিনগুণ বড়ো। যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করে তারা এ সব জানে। তাই বন্দী করে ছায়াদের। কেটে কুটে মাপ মতো বানিয়ে নেয়। বেচারি সাভান্ত ক্রিশ্চিয়ান থিওডোর এসব জানে না। বিশ্বাস ভালোবাসা ভরসায় সে জীবনের পথ চলে। সুতরাং নিজের ছায়াকে তো সে বিশ্বাস করবেই। আর ছায়া? একজন ভালো মানুষের ছায়া, সাধারণ মানুষের মতোই ভালো। কিন্তু তার প্রতি উদাসীনতায় বঞ্চনায় সে নিজের ভেতরেই জন্ম দেয় এক প্রতিবাদী সত্ত্বা যা ক্রমশ হয়ে ওঠে প্রতিহিংসা পরায়ণ। প্রত্যেকটা সাদা মানুষের মধ্যে যেমন কালো মানুষ আছে তেমনি ছায়ার ভেতরকার কালো মানুষও বেরিয়ে আসতে চায়। সে এক তীব্র যন্ত্রণার শরীরী সংবেদে। আপাত ভাবে তার ওপর দীর্ঘ আধিপত্য তাকে করেছে এক নারীসত্ত্বা। কে না জানে এ সমাজে নারী ক্ষমতার উল্টোপিঠে অবস্থান করে।

ভালোবাসা এক চিরন্তন অনুভূতি। গড়ে ওঠে এক ত্রিকোণ ভালোবাসার পরত। লিরিক্যাল সংলাপে নাট্যমুহূর্ত তৈরি হয় যখন ছায়া জানায় তার ভালোবাসা। রাজকুমারীকে। ভালোবাসার অলৌকিকতায় ছায়া জেনে ফেলে রাজকুমারীর স্বপ্ন। প্রকাশ করে রাজকুমারীর মনের গোপনতা। প্রকাশিত হয় ছায়ার ক্ষমতা লিপ্সু মনও। অন্ধকার নামলেই যা হারিয়ে যায় সেও প্রাণপণে ক্ষমতা ব্যবহারে উদগ্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত…।

শেষ কথা যা বলার তা হল এ নাট্যের সঙ্গীত কবীর সুমন। অভিনয় করেছেন কমলিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, মিশকা হালিম, অসিত বসু, চন্দন সেন ও আরও অনেকে। সাভান্তের সাধারণ বুদ্ধিজীবী সত্ত্বার চমৎকার প্রকাশ ঘটিয়েছেন শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়। হৃদয়বান, বুদ্ধিমান কিন্তু রাজা হতে ভয় পাওয়া মানুষ। চিরকাল পায়ের কাছে থাকা, তাই নেতা হতে ভয় পায় না ছায়া। মাড়ানো যায় না, কিন্তু মাটিতে থাকা ছায়া। যে কোনও অবস্থায় খাপ খাইয়ে নেওয়া ছায়া। সে ও চায় অনুগামী। ছায়ার অনুগামী হবে মানুষ। সিস্টেমের বিরোধিতাও আসলে যেমন একটা সিস্টেমের জন্ম দেয় তেমনি ছায়া ও আদতে হয়ে ওঠে মানুষের অনুকৃতি। আর অনুকরণে মাত্রা বাড়ে বই কি! ছায়া, অনির্বাণ ভট্টাচার্য। এটুকু বলাই যথেষ্ট যে ‘ক্রিশ্চিয়ান…’ বলে ডাক দেবার জন্য বাংলা থিয়েটারের দর্শক অনেক নীরব অপেক্ষা করেছে। বারে বারে ফিরেছে নাট্যশালায়।

Developed by DXDasia