জরুরি অবস্থার অন্ধকার সময়, যাত্রা শুরু করল বাংলা টেলিভিশন

আজ বিশ্ব টেলিভিশন দিবস

ভারতে প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচার হওয়ার পর তখন এক দশকেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আসনে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ইন্দিরা গান্ধি। ১৯৭৫-এর জুন মাসে রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ ঘোষণা করলেন অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা। প্রধানমন্ত্রী কার্যত স্বৈরাচারি হয়ে উঠলেন। নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হতে লাগল নির্বিচারে। শিল্প-সাহিত্য-গণমাধ্যমের ওপর নেমে এল কণ্ঠরোধের খাঁড়া। রবীন্দ্রনাথও বাদ যাননি। ২৭ জুন ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় তাঁর ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ কবিতার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। নিষেধাজ্ঞার শিকার হয় সেই কবিতা। বিশ্বকবির বেশ কিছু গান এবং অন্যান্য লেখাও সেন্সরশিপের আওতায় আসে। প্রতিবাদী মানুষদের বন্দি করা হতে থাকে কারাগারে। ভারতীয় ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক অধ্যায় ১৯৭৭ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত চলেছিল।

এমন অন্ধকার সময়ের মধ্যেই এক চিলতে আশার আলো হয়ে পথ চলা আরম্ভ করে বাংলা টেলিভিশন। টালিগঞ্জের রাধা ফিল্মস স্টুডিওতে সৃষ্টি হল ইতিহাস। ১৯৭৫-এর ৯ আগস্ট টিভির পর্দায় প্রথম ভেসে উঠল ঘোষিকা শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্তের ছবি। হাত জোর করে তিনি বললেন, “নমস্কার, আজ থেকে কলকাতা টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হল।” অবশ্য টিভি যন্ত্রটি সহজলোভ্য ছিল না মোটেও। সরকারের থেকে লাইসেন্স নিতে হত, যথেষ্ঠ খরচ ছিল তাতে। কলকাতায় টিভির প্রথম লাইসেন্স হোল্ডার ছিলেন চা ব্যবসায়ী বিকে সাহার পরিবার। আকাশবাণীর অংশ হিসেবেই তখন টেলিভিশন সম্প্রচার চলত। 

‘দূরদর্শন’ কথাটি অবশ্য চালু হয় কিছু পরে, টেলিভিশনের ভারতীয় নাম হিসেবে । ১৯৭৬ সালে আকাশবাণী ও দূরদর্শন আলাদা হয়ে গেল। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজাইনের পড়ুয়াদের উপর লোগো সৃজনের ভার দেওয়া হয়। ১৪টি নকশার মধ্যে থেকে বাঙালি ছাত্র দেবাশিস ভট্টাচার্যের আঁকা লোগো বেছে নেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি।

প্রথম দিনের ঘোষণায় শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত

জরুরি অবস্থার সময় সেন্সরশিপ থেকে ছাড় পায়নি কলকাতার টেলিভিশন। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ‘সাহিত্য-সংস্কৃতি’ অনুষ্ঠানের প্রথম তথ্যচিত্র ছিল ‘জন্মদিন মৃত্যুদিন’। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন এবং অবনীন্দ্রনাথের জন্মদিন নিয়ে স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। অবনীন্দ্রনাথের যাত্রাপালার নির্বাচিত অংশ পাঠ করা হয়। একটা লাইন ছিল- “তখন ইন্দ্রের ভয়ে ঘরে কুলুপ দিয়েছেন ব্রহ্মা”। স্টেশন ডিরেক্টরের আপত্তিতে বাদ দেওয়া হয় সেই লাইন। দর্শকদের কাছে ‘ইন্দ্র’ যাতে ‘ইন্দিরা’ না হয়ে যায়, তাই এমন ত্রস্ততা। 

এসবের মধ্যেও বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছিল। ‘সাহিত্য-সংস্কৃতি’ অনুষ্ঠানটিই ছিল যথেষ্ঠ সমৃদ্ধ। পয়লা বৈশাখে আয়োজিত হয় ‘নববর্ষের আড্ডা’। ‘দর্শকের দরবারে’ অনুষ্ঠানও বেশ জনপ্রিয় হয়। 

বাংলা টেলিভিশনের শুরুর দিকে প্রায় বাইশ বছর সংবাদ প্রযোজকদের দায়িত্ব পালন করেছেন সুমিত বন্দ্যোপাধ্যায়। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “দূরদর্শন ছিল আমাদের গর্ব করার মতো জিনিস। শিল্প-সাহিত্য-খেলা-বিনোদন এই এতকিছু মানুষ দেখতে পাবেন ছোটোপর্দায় বাড়িতে বসেই। এই ভাবনার শরিক হতে পারার একটা আলাদা আনন্দ আছে। এই দীর্ঘ ৪৫ বছরে আমি অনেক সহকর্মীদের হারিয়েছি। … আমি চাই দূরদর্শন কারোর সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতায় না থেকে নিজ উদ্যমে এগিয়ে যাক আরও অনেক অনেক বছর।”

তথ্যঋণ – মৃণালকান্তি দাস, পঙ্কজ সাহা, সুমন সাধু।  

Developed by DXDasia