
৩৯তম বর্ষে পদার্পণ করল নাকতলা উদয়ন সংঘের পুজো
দেশ মানে ভিটে। দেশ মানে শৈশব-কৈশোর-যৌবনের স্মৃতিমাখানো দিন আর দিনযাপনের অভ্যাস। সেই দেশের উপর মাঝেমাঝে শাসনের দাগ পড়ে আর ভিটে ভাগ হয়ে যায়। জীবন, অভ্যাস আর যাপন হাতে নিয়ে মানুষ দেশ পাল্টায়। ভিটে হারানোর ক্ষত আর অনিশ্চিত ভবিষ্যত জুড়ে ছিন্নমূলের কলোনি গড়ে ওঠে। সেই কলোনি ধীরে ধীরে পাড়ায় বদলে যায়। অচেনা মুখগুলো চেনা হতে শুরু করে, আর পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে গল্প জমাতে শুরু করে নতুন দেশ, নতুন ভিটে। কলোনির পাড়া হয়ে ওঠার সেই গল্পই এবার শোনাচ্ছে নাকতলা উদয়ন সংঘ (Naktala Udayan Sangha) সর্বজনীন দুর্গোৎসব। ৩৯-তম বর্ষে নাকতলা উদয়ন সংঘের থিম হৃদয়পুর।

আজকের তুচ্ছতা যেন ভবিষ্যতের মহাসম্পদ। দক্ষিণ কলকাতার এই উদ্বাস্তু কলোনির বাসিন্দাদের হৃদয়পটে দঙ্গলবদ্ধ স্মৃতির যে ক্রমাগত বুনন ও বিবর্তন, তারই খন্ডচিত্র উঠে এসেছে মণ্ডপে। থিম ভাবনা এবং মণ্ডপসজ্জায় রয়েছেন শিল্পী প্রদীপ দাস। তিনি গত দুবছর ধরে নাকতলার পুজোর মণ্ডপসজ্জার কাজ করছেন। এই নিয়ে তৃতীয় বছর। গত দুই বছর থিম ছিল যথাক্রমে চলচিত্র ও মোটা কাপড়। সেখানেও ধরা পড়েছিল দেশভাগ, উদ্বাস্তুদের ক্যাম্প, ছিন্নমূল মানুষের যন্ত্রণা, ভিনদেশে এসে নিজের দেশ গড়ে তোলার লড়াই। এবার থিম যেন সেই যাপনের পরবর্তী ধাপ, যেখানে পুরোনো ভিটের স্মৃতি ঝরে পড়ে নতুন ভিটের উঠোনে, সেই স্মৃতি কুড়োতে কুড়োতে নতুন ভিটে হয়ে ওঠে হৃদয়পুর। প্রদীপ দাস বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “নাকতলায় যখন প্রথমবার মণ্ডপ করেছিলাম, তখন পরপর তিনবার উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে কাজ করার কথা ভাবিনি। আসলে দেশভাগের ইতিহাস এত বড়ো এবং গভীর, তাই বোধহয় ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাকে ধরতে হয়। আর নাকতলার পিনকোড হলো কলকাতা-৪৭। এটা আমার কাছে খুবই ইঙ্গিতবহ মেটাফোর।”
ছিন্নমূল হওয়ার স্মৃতি, আর সম্মিলিত হওয়ার স্পৃহা দিয়ে গড়ে ওঠা কলোনি, তার পাড়া হয়ে ওঠার এই যাত্রায় এলাকাবাসীই যেন গোটা থিমের অবয়ব নির্মাণ করেছেন। ব্যবহৃত হয়েছে তাঁদের স্মৃতিসঞ্জাত ব্যবহার্য দ্রব্য- পানের বাটা, আলমারি, পাখা, দোয়াত ইত্যাদি। গোটা মণ্ডপজুড়ে এলাকার মানুষের, তাঁদের পরিবারের পুরোনো ছবি ফ্রেমবদ্ধ করে সাজানো রয়েছে। সেই সময়ের ছবি, যে সময়ে নিজেদের শৈশব-কৈশোর দুহাতে বয়ে নিয়ে এসে নতুন ভিটেয় আসন পাতছেন তাঁরা। ওপারের ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে লোহার রড আর সুতো দিয়ে। আর ব্যবহৃত হয়েছে এপার আর ওপার বাংলার নদীর জল। প্রদীপবাবু বলেন, “শিশিতে বিভিন্ন নদীর জল ভরে মণ্ডপের বিভিন্ন স্থানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।” নদীর জল বয়ে যায়। বয়ে যায় জীবনও। কৈশোরের পদ্মা আর মেঘনা পেরিয়ে ভিড় করা স্টিমার আঘাটায় ভেড়ে। ঘাটে নেমে ভবিষ্যতের দিকে, গঙ্গার পাড় দিয়ে হাঁটতে থাকে যৌবন, যার ভিটে নেই, পরিজন নেই, রোজগার নেই। বহমান সময়ের দ্যোতক, বয়ে যাওয়া সেই নদীর জল যেন বয়ে গেছে থিমের ভাবনা জুড়ে।
প্রতিমাশিল্পী পিন্টু শিকদার বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “উদ্বাস্তু কলোনির প্রাণ এক অর্থে ছিলেন মেয়েরাই। নতুন দেশে নতুন সংসার পাতা, সন্তানদের পালন করা, সব মিলিয়ে তাঁরাই যেন দশভূজা। সেই আঙ্গিক ধরা পড়েছে প্রতিমায়। প্রতিমার সামনে কাঠ আর লোহা দিয়ে নির্মিত ছোটো ছোটো ঘরের আদল। যেন স্নেহ আর যত্নে নির্মিত ঘরে মা তাঁর সন্তানদের আগলে রেখেছেন। প্রতিমার দুই হাতে দুটি কলসি। সেই দুটিতে ভরা আছে ওপার বাংলার নদীর জল।” ইঁট, কাঠ, লোহা দিয়ে ঘরবাড়ির আদল তৈরি করা হয়েছে। সেইসব বাড়িতে লাগানো হয়েছে নামের ফলক। মাটির অধিকার যেন বুঝে নিচ্ছেন পালিয়ে আসা মানুষ।

আবহসঙ্গীত রচনা করেছেন এবং সুর দিয়েছেন দীপময় দাস। “থিমের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই আবহসঙ্গীত সৃষ্টি করেছি। কোরাসে গান হচ্ছে। আর রয়েছে সানাইয়ের ব্যবহার। ছিন্নমূল মানুষের কাছে সময় যেন থমকে গিয়েছিল। সেই কথা মাথায় রেখে আবহসঙ্গীতের সুরেও কিছুটা মনোটনি রেখেছি। গানের কিছু কিছু কথা বারবার ঘুরে ঘুরে এসেছে।”
“কলস ভাসে এ ঘাট থেকে অন্য ঘাটে প্রভু, জল মেলে না তবু”… ভাসতে ভাসতে সে আঘাটায় ঠেকে। তারপর কাব্যের বিপরীতে গিয়েই জল খুঁজে নেয়। সময় বয়ে যায়, জীবনও। অন্ধকার যৌবন সময় হাতড়ে পাড়া গড়ে, দেশ গড়ে। প্রৌঢ়ত্বে এসে সেই দেশ হৃদয়ে মিশে যায়। জন্মভিটের মাটিকাদা লাগা স্মৃতির হাত ধরে, রাজধানীর থেকেও বড়ো হয়ে ওঠে হৃদয়পুর। সেই কলোনির হাসিকান্না মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে নাকতলার পুজোমণ্ডপ।
