
১৯ জুন থেকে দেখানো হবে লন্ডনের উপটন পার্ক, বোলেয়ন সিনেমায়
‘হোমো’ কথাটা তখন খুব চলত। দুটো ছেলে বা মেয়ের মধ্যে সামান্যতম ঘনিষ্ঠতা মানেই তারা হোমো। তখন বলতে স্কুলজীবনের যে পর্যায়ে ধীরে ধীরে তারুণ্যের গন্ধ ধরছে মনে। আর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ মুক্তি হতে দেখলাম আমরা। বাইসেক্সুয়াল রিলেশনশিপের দোলাচল আর নারীবর্জিত যাত্রামঞ্চে মহিলা চরিত্র চিত্রায়ন করা প্রথিতযশা শিল্পীর জীবনের গল্প- এই দুই ঘটনাপ্রবাহকে একটি প্যারালাল ফ্রেমে চমৎকার দেখিয়েছিলেন পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’-এরও সাত বছর আগে ‘উষ্ণ তার জন্য’-র মতো প্রথাভাঙা ছবি উপহার দিয়েছিলেন দর্শককুলকে। ‘শব্দ’ বা ‘ছোটদের ছবি’ও পারতপক্ষে অন্তরালে থাকা, একঘরে হয়ে যাওয়া মানুষদেরই কাহিনি।
‘নগরকীর্তন’ ছবিতে বৃহন্নলা সমাজের বাস্তবতার নিখুঁত কাহিনিচিত্রটি তুলে এনে মধু-পুঁটির সম্পর্ককে যেন আরও জীবন্ত ফ্রেমে ধরলেন কৌশিক। মানুষ বৃহন্নলা হয় জন্মের সময়েই। কিন্তু জন্মগতভাবে পুঁটি এই সমাজের ছিল না কোনোভাবেই। এক সুস্থ পুরুষের শরীরেই তার জন্ম। তার মনে লুকিয়ে থাকা ক্রন্দনরতা মেয়েটিকে কেবল বাঁচিয়ে রাখার জন্যেই বুঝি ‘স্বাভাবিক’ সমাজের করালচক্ষু এড়িয়ে এই সমাজে অসহায় আশ্রয় নিয়েছিল রূপান্তরকামী পরিমল। ভাবেনি, এখানেও সেই একই কঠোর নিয়মাবলীর চক্রব্যূহ, একঘেয়ে অন্ধকার পরিণতি, প্রতিহিংসা-পরায়ণতা। ‘ভাই হয়ে ভায়ে কাটে’-র তাৎপর্যপূর্ণতা। আর এই চিত্রের পাশেই স্তরে স্তরে সাজানো থাকে ছোটোবেলায় মেয়েদের জিনিস নিয়ে খেলার ‘অপরাধে’ বাবার কাছে পরিমলের বকুনি খাওয়া আর পুঁটির পরিচয় জানবার পর মধুর দাদার মধুকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলার টুকরো চিরাচরিত দৃশ্য।

‘নগরকীর্তন’ ছবির জন্যই চতুর্থবার জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। এবার সেই ছবিই দেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে গেল সুদূর লন্ডনে। মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই রমরমিয়ে চলেছে একাধিক হলে। সিনেমার হল প্রায় ৫০ দিন পর্যন্ত হাউসফুল থেকেছে। এবার লন্ডনে দেখা যাবে সমপ্রেমের নজির সৃষ্টি করা এই ছবি। ১৯ জুন থেকে দেখানো হবে লন্ডনের উপটন পার্ক, বোলেয়ন সিনেমায়।
এবছর জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে ঋদ্ধি সেনের ডাক এসেছিল এই ছবির জন্যই। সেরা অভিনেতার সম্মান পেয়েছিলেন তিনি। ঋদ্ধির প্রশংসার পঞ্চমুখ হয়েছিলেন সমালোচক থেকে দর্শক। ইফির জন্য মনোনীত হয়েছিল ‘নগরকীর্তন’। এর আগে কান চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছিল এই ছবি। এশিয়ার মোট নয়টি ছবির মধ্যে শক্ত জায়গা করে নিয়েছিল ‘নগরকীর্তন’। জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে নগরকীর্তনের বরাতে জুটেছিল বিশেষ জুরি পুরস্কারও। এছাড়াও এই ছবির জন্য সেরা পোশাক পরিকল্পনার পুরস্কার পেয়েছিলেন গৌতম মণ্ডল এবং সেরা মেকআপ শিল্পী হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন রাজ রজক। সবমিলিয়ে আরেকবার দর্শকদের উল্লাস জানাচ্ছেন পরিচালক/অভিনেতা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় এবং ‘নগরকীর্তন’ টিম।
