
ধানকে কেন্দ্র করে নবান্ন উৎসব পালিত হয় রাঢ়বঙ্গে
সেই প্রাচীনকাল থেকে এই বঙ্গদেশে রাঢ়ের গুরুত্ব ছিল আলাদা। কারণ সেই আদি অস্ট্রেলীয় সমাজের সঙ্গে আর্যসংস্কৃতি মিশে যে মিশ্রসংস্কৃতি তৈরি করেছিল, তার আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্য ছিল অনন্য। রাঢ়দেশের সীমানা হিসাবে যদি উত্তর থেকে দক্ষিণ দিক পর্যন্ত ধরি তাহলে ভাগীরথী তীরস্থ কাটোয়া মহকুমা থেকে দামোদর উপত্যকা হয়ে বাঁকুড়া পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। এখানকার ধানই হল মূল শস্য এবং ধানকে কেন্দ্র করেই অর্থনৈতিক ক্রমবিকাশের ধারা বয়ে চলে। তাই ধানকে কেন্দ্র করে নবান্ন উৎসব যে রাঢ়বঙ্গে বিশাল সমারহে পালিত হবে সেটাই স্বাভাবিক।
নবান্ন মূলত গোটা অঘ্রাণ মাস জুড়ে পালিত হলেও এর প্রাথমিক সূত্রপাত হয় কার্তিক সংক্রান্তির দিন ভোরে। এই সংক্রান্তি তিথিতে গৃহস্থের বাড়ির একজনকে স্নান করে শুদ্ধবস্ত্রে যেতে হয় জমিতে, যেখানে নবান্নের জন্য ধান লাগানো হয়। তারপর দূর্বাঘাস, গঙ্গাজল, মন্ডা বা সন্দেশ দিয়ে আড়াই গাছি ধানকে কেটে বাড়ি নিয়ে আসা হয়। সেই ধানের পুজো বা মুঠপুজো দিয়েই শুরু হয় নবান্নের আসল আরাধনা। পরে চাষীরা সেই ধান মাঠ থেকে কেটে নিয়ে ঝাড়াই করলে গ্রামে গ্রামে এখনও নবান্নের জন্য বেছে নেওয়া ধানকে বাড়ির পুরুষরা শুদ্ধ বস্ত্রে সংগ্রহ করেন এবং বাড়ির মহিলারা স্নান সেরে ভোরে উঠে নবান্নের ধানকে সিদ্ধ করে উঠোনে বা ছাদে শুকোতে দেন। ধান শুকিয়ে গেলে সঠিক তিথি দেখে, সেই ধানকে ভাঙিয়ে আনা হয় ধানকল থেকে, যা আগে ঢেঁকিতে ভাঙা হত, তাই আগেকার দিনে সারা কার্তিক মাস জুড়ে ঢেঁকি সারানো হত। ধানকল থেকে ভাঙিয়ে আনা নবান্নের চালকে, নবান্নের আগের দিন বিকালে বা সন্ধ্যাতে হামালদিস্তাতে গুঁড়ো গুঁড়ো করা হয় শুদ্ধ কাপড় পরে। মূলত লঘু ধান বা গোবিন্দভোগ চাল দিয়েই নবান্ন হয় রাঢ়দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে। সেই ধান দিয়েই নবান্নের জন্য শিন্নি তৈরি হয়, তাতে চালগুঁড়োর সঙ্গে মেশানো হয় বিভিন্ন ফলের কুচি, ক্ষীর, দুধ, সন্দেশ, আদাকুচি, আখের টুকরো, মুলোকুচি প্রভৃতি। নবান্নের দু-দিন আগে থেকেই সবজি ও ফলের বাজার করা শুরু হয়ে যায়, কারণ অঘ্রাণ মাসের বিভিন্ন শুভদিনগুলিতে নবান্নের দিন স্থির হওয়ায় বাজার আগুন থাকে, তাই আগাম বাজার করা সাধারণ মানুষের পক্ষে খুবই লাভজনক হয়।

তবে নবান্নের আগের দিন সকালে মুদিখানা বাজার করেন বেশিরভাগ মানুষ। কারণ বিকাল থেকে বিভিন্ন সবজি ও মাছের পদগুলিকে আগে থেকে তেলে কষে রাখা হয়। এছাড়াও মানুষরা সেদিন গ্রামের সব পুকুরেই মাছ ধরেন। যাঁদের পুকুর আছে, তাঁরা নিজেদের পুকুরে জেলে নামিয়ে মাছ ধরেন। যাঁদের পুকুর নেই, তাঁরা বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করেন বা কিনে আনেন।
গ্রামের সংস্কৃতিতে আজও শহুরে হাওয়া পুরোমাত্রায় প্রবেশ না করার জন্য, পুকুরের অতিরিক্ত মাছ পড়শিকে দিয়ে দেন মানুষ নবান্নের জন্য। বহুকাল আগে থেকে সংরক্ষিত কুমড়ো ও জমির বেগুন, মুলো বা পালংশাক জ্ঞাতিগোষ্ঠী ও পাড়াপ্রতিবেশীর মধ্যে ভাগ করে নেন। অবশেষে নবান্নের ভোর থেকেই গ্রামের মধ্যে শুরু হয় সাজো সাজো রব। সেদিন ভোরে ৩টে নাগাদ পূর্ব বর্ধমানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভোরাই গান ‘রাই জাগো রাই’ শোনা যায়। বাড়ির মহিলারা ভোর থাকতেই উঠে বাড়িতে ঝাড়পোছ, মারুলি সেরে লেগে পড়েন রান্নায়। কোথাও চোদ্দ রকম ভাজার পদ রান্না হয়, কোথাও বা একুশ পদ, সঙ্গে মাছের তিন রকম আইটেম (ভাজা, ঝোল, টক), নিরামিষ টক, ডাল, মালপোয়া, বেগুনি ইত্যাদি তো হবেই এবং শেষে পায়েস রান্না হয়। সকাল হতেই কলাবাগানে গিয়ে কলাপাতা কেটে নিয়ে আসার ধুম পড়ে যায় ছোটো বড়োদের। তারপর একে একে সকলে চা খেয়েই স্নানপর্বটা সেরে নেন, কারণ নবান্নের জন্য গ্রামের মূল মন্দিরগুলোতে নবান্নকে উৎসর্গ করে পুজো হয়, বিশেষত গ্রাম্যদেবীর পুজো, কোথাওবা অন্নপূর্ণা পুজো। শেষে বাড়ির তুলসী মন্দিরে বাড়ির যজমানি পুরোহিতকে দিয়ে হরির নবান্ন পুজো এবং সমস্ত পুজোর প্রসাদ একত্রিতভাবে চালগুঁড়ো শিন্নির সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে বাড়ির সক্কলকে দেওয়া হয়।
প্রথমে বাড়ির বাস্তুদেবতার উদ্দেশ্যে নবান্নের ভোগ দেওয়া হয় মাঝউঠোনে, তারপর শিশুকিশোররা স্নানের পর নতুন জামা পরে মাটিতে আসন পেতে বসে, কলাপাতার উপর নবান্ন খাবে বলে। ছোটোদের সারা হলে বড়োরা বসেন। নবান্নের চালগুঁড়ো খাওয়া হলে নিয়ম মিলিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে হয়, কারণ বারবেলা পড়ে গেলে আর খাওয়ার নিয়ম থাকে না। তাই খাওয়ার সময়টা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এভাবে দুপুর পার হয়ে রাত আসে কিন্তু বাড়িতে আর রান্না চাপে না, কারণ নবান্নের দিনে নতুন করে আর উনুন জ্বালাবার বিধি নেই।
নবান্নের পরের দিনকে বলে পান্ত (বাসি) বা বাস নবান্ন। সেদিন নবান্নের দিনে তৈরি সমস্ত পদগুলির বাসি খাওয়ার নিয়ম। অনেক জায়গায় অবশ্য এই বাসি পদের সঙ্গে যুক্ত হয় খাঁসির মাংস। সেদিনও উনুন ধরানো হয় না বাড়িতে। পান্ত নবান্নের দিন কার্তিক পূজার দিন হিসাবেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কার্তিক লৌকিক দেবতা তথা প্রজননের দেবতা। তাই নবান্ন উপলক্ষে তাঁর পুজো হওয়াটা রাঢ়বঙ্গের সংস্কৃতির একটি অঙ্গ বলা যায়।
নবান্ন উৎসব আজও এই বাংলায় টিকে আছে সংখ্যাতীত গ্রামে, যার খবর শহরবাসী মানুষদের কাছে ভিনদেশি উৎসবের মতো। আমরা যদি আমাদের আদি উৎসবগুলো ভুলে না যাই, গ্রামের দিকে একটু দৃষ্টি ফেরাই, তাহলে শহুরে হাওয়ার বাইরেও যে বিরাট একটা অঞ্চল জুড়ে নবান্ন আছে, তার খোঁজ পাব।
