পঞ্চাশে মৃণাল সেনের কোরাস : ৩০ হাজার চাকরিপ্রার্থীর মিছিল

সমস্বরে উচ্চারিত চিরন্তন বিদ্রোহের ধ্বনি

কোরাস-এ এভাবেই মৃণাল দেখিয়েছিলেন ৩০ হাজার চাকরিপ্রার্থীর মিছিল

আপনি কি বেকার? খুউউউব উঁচু থেকে বৃষ্টির মতোই ঝরে পড়ছে অজস্র লিফলেট… চাকরির আবেদনপত্র। মুনাফা, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি আর ক্ষমতাসর্বস্ব মন দিয়ে বানানো একটা দুর্গ, অনুমতি ছাড়া যেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এই দুর্গ স্বঘোষিত বিধাতাদের বানানো। তাঁদের হাতেই যত ক্ষমতা। তাঁরা চাকরি দেবেন। তাই দুর্গের বন্ধ সদর দরজার বাইরে অপেক্ষারত হাজার হাজার মুখ। নিরন্ন ও বিপন্ন। তাঁরা এসেছেন নাগরিক অধিকার বুঝে নিতে, চাকরির দাবি নিয়ে। কিন্তু চাকরির বদলে জোটে এলোপাথাড়ি গুলি, বেপরোয়া লাঠি। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর সন্ত্রাসের সংঘর্ষ। অসহ্য পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে এগিয়ে আসছে কলকাতার মানুষ, গ্রামের কৃষক, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক। এগিয়ে আসছে মেয়ে, পুরুষ, ছেলে, বুড়ো—সবাই। মাঠ-ঘাট-আলপথ-নদীনালা পেরিয়ে এগিয়ে আসছে ৩০ হাজার চাকরিপ্রার্থীর মিছিল। শ্রমজীবী মানুষের মিছিল।

কোরাস-এ উৎপল দত্ত

সেরা ছবি ও সেরা সংগীতের জন্য জাতীয় পুরস্কার পায় এই ছবি। মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-এ নির্বাচিত হয় এবং রৌপ্য পদক পায়। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে পায় ‘ফোরাম অফ নিউ সিনেমা’র (FIPRESCI Award) পুরস্কার।

১৯৭৪ সালে বানানো মৃণাল সেন (Mrinal Sen)-এর ‘কোরাস’ (Chorus)। ১৯৭৪ থেকে ২০২৪ – ৫০ বছরে ছবিটা কিন্তু পাল্টায়নি! ৩০ হাজারের জায়গায় মিছিল এখন ৩০ লাখের। সেদিনের কোরাস এখনও বেজে ওঠে পথ-হাঁটা পরিযায়ী শ্রমিকদের পায়ের ধুলোয়, ছাঁটাই হওয়া মজুরের ঘামের বিন্দুতে, চাকরি না পাওয়া আন্দোলনরত যুবক-যুবতীদের ক্লান্তি বা হার না মানা জেদের ভেতর। 

আবেদনপত্রের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে

কলকাতাত্রয়ী-র মতো সময়োচিত, একই সঙ্গে সময়ের থেকে অনেক এগিয়েছিল এ ছবির নির্মাণ। কলকাতাত্রয়ীতে যে প্রচলিত ফর্ম ভাঙার কাজ মৃণাল শুরু করেছিলেন, এ ছবিতে যেন তা আরো তীব্রতা পায়। তবু কলকাতাত্রয়ীর জনপ্রিয়তার নিরিখে একটু আড়ালেই থেকে গেছে ‘কোরাস’। সেরা ছবি ও সেরা সংগীতের জন্য জাতীয় পুরস্কার, মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রৌপ্য পদক আর বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ফোরাম অফ নিউ সিনেমা’র (FIPRESCI Award) পুরস্কার পায় মৃণালা সেনের এই কাজ।

থিসিস এবং অ্যান্টিথিসিস-এর সমন্বয় দেখা যায় এই ছবিতে। বাস্তবের সঙ্গে বিমূর্ততার সহাবস্থান। যেন সত্যি রূপকথা। এ ছবির দ্রষ্টব্য ডকুমেন্টারি সিকোয়েন্সের স্টাইলাইজেশন, ক্যারিকেচার এবং ক্যামেরার অদ্ভুত রসায়ন। ছবির ‘টাইটেল কার্ড’-এ আলাদা করে বলে দেওয়া হয় না কে অভিনেতা, কে পরিচালক, কে সংগীতকার, কারা  কলাকুশলী। পরিবর্তে লেখা হয় ‘সংগঠনে’। এই সংগঠনের ভিতরেই আছেন সকলে, আছে সকলের নাম। ছবির সেট পরিকল্পনা, বিগ ক্লোজআপে চরিত্ররা, দৃশ্যকে স্প্লিট করে চমকে দেওয়ার মতো নিও-সম্পাদনা ছবির শুরু থেকেই লক্ষণীয়।

কলকাতার একটি উঁচু ছাদে কে কে মহাজন, লিফলেট ড্রপ ক্যাপচার করছেন

বুর্জোয়া নিষ্পষণ ও আপাত স্বাধীনতার মধ্যে হতাশ ব্যর্থ শ্রমিক ও তার প্রতিক্রিয়া, ইচ্ছে, স্বপ্ন ইত্যাদি প্রকাশ করেছেন কখনো পালাকারের মতো। কখনো প্রাবন্ধিকের মতো। শোনা যায় নিপীড়িতের সংলাপ: ‘খাবার কেনার পয়সাও নেই। রাস্তায় কেউ খেতে দিলে খাচ্ছি, না-হলে খালিপেটেই হাঁটছি।’

শাসকদের নির্মমতার পাশাপাশি এ ছবিতে মৃণাল দেখিয়েছেন শাসকদের ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থাও। শাসকদের যিনি নায়ক, তাঁর মুখে সংলাপ বসিয়েছেন, ‘আচ্ছা আপনাদের কখনও গা ছমছম করে না? কেন জানি না আমার মাঝেমাঝেই মনে হয়, পুরো দেশটা একটা ভলক্যানোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যে কোনও সময় এক্সপ্লোড করতে পারে!’  

ছবির শুরু থেকেই ক্যাওস। হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থির তুলকালাম চিৎকার–চাকরি চাই, চাকরি চাই। মৃণাল দেখিয়েছিলেন চাকরির এই আকাল কৃত্রিম, শাসকদের বানানো। ছবিতে মৃণাল দেখিয়েছেন তীব্র হাহাকারের মধ্যে সংবাদপত্রের 'টিআরপি'-সর্বস্ব ভূমিকা। চাকরিপ্রার্থীদের দুর্দশা কাগজের সম্পাদকের কাছে লোভনীয় প্লট, গল্প-উপন্যাস হিসেবে বেচে দিলে তিনি লাভবান হবেন।

 

এই ছবিতে মৃণাল থিয়েটার-শৈলী, থিয়েটারের উপাদান, ভঙ্গি ও রীতিও ব্যবহার করেছেন ইচ্ছেমতো। এই ছবি প্রসঙ্গে মৃণাল নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার সিনেমার জীবনে কোরাস বাস্তবিকই একটি মস্ত সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা।’

ছবির শুটিং চলাকালীন মৃণাল সেন

এই ছবিতে মানুষের আবেগ, পরিবর্তনকামীতার নাম কোরাস। এ ছবির গতিময় ভাষা বুঝিয়ে দেয় পরিচালকের তারুণ্য, অস্থিরতা; অনেক হয়েছে, নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে হবে—পথ একটাই, বিদ্রোহ। মৃণালের ছবির ভাষাই হলো, চিরন্তন বিদ্রোহ। তাঁর অন্যতম চিরন্তন বিদ্রোহের ভাষা এই ছবি। ক্যাওসের মধ্যে থেকেই মৃণাল বের করে এনেছিলেন কোরাস—সমস্বরে উচ্চারিত ধ্বনি। ঠিক বললাম কিনা, ৫০ বছর বয়সী ছবিটি দেখে যাচাই করে নিতে পারেন। 

মৃণাল সেন দুর্গের স্কেল মডেলে ক্ষুদ্রাকৃতির লিফলেট উড়িয়ে দিচ্ছেন। মডেলটি ডিজাইন ও নির্মাণ করেছেন খালেদ চৌধুরী

এক নজরে কোরাস :

১৯৭৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি
পরিচালনা : মৃণাল সেন
প্রযোজনা: মৃণাল সেন প্রোডাকশন
গল্প: মোহিত চট্টোপাধ্যায, গোলাম কুদ্দুস, মৃণাল সেন
ক্যামেরা: কে কে মহাজন
সংগীত : আনন্দ শঙ্কর
অভিনয়ে : উৎপল দত্ত, রবি ঘোষ, শেখর চ্যাটার্জি, দিলীপ রায়, হারাধন ব্যানার্জি, অজয় ব্যানার্জি, শুভেন্দু ব্যানার্জি, গীতা সেন, রসরাজ চ্যাটার্জি, সুপান্থ ভট্টাচার্য প্রমুখ

ছবিঋণ : https://www.mrinalsen.org/ 

Developed by DXDasia