
সুবোধ চন্দ্র মল্লিক-এর অন্যতম জনপ্রিয় মিষ্টি
কলকাতাকে ময়রা ও মিষ্টির শহর বললে অত্যুক্তি হয় না। এ শহরের বাঁকে বাঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক একটি শতাব্দী প্রাচীন মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। তাদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং কিংবদন্তি। কেবল দোকানে নয় মিষ্টিতেও মিশে থাকে কত কাহিনি…! লেডি ক্যানিংয়ের জন্যই লেডিকেনির ধরাধামে আসা, আবার জমাইকে ঠাকতে জন্মেছিল জলভরা। কোনও কোনও মিষ্টি আবার ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং’ ছাড়া দৈবাৎ জন্মে গিয়েছে। প্রতিটি মিষ্টি আবিষ্কারের নেপথ্যে আছে মজার, রোমাঞ্চকর গপ্পো।
বিশ শতকের কলকাতায় ‘ট্রেন্ড’ হয়ে গিয়েছিল স্মারক মিষ্টি। স্মরণীয়, বরেণ্যদের নামে মিষ্টি উৎসর্গ করতেন শহরে বিখ্যাত ময়রারা। খ্যাতনামাদের নামের সঙ্গে নাম মিলিয়েই মিষ্টির নাম রাখা হত। যেমন বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নামে ভীমনাগ বানিয়েছিল ‘আশুভোগ’। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সন্দেশের ভক্ত ছিলেন। ভীমনাগের সন্দেশ খেতে পছন্দও করতেন। তাঁকে সম্মান জানাতেই ভীমনাগের ভেনঘরে আশুভোগের জন্ম হয়েছিল। মতিলাল নেহেরুর জন্য তৈরি হয়েছিল ‘নেহেরু সন্দেশ’। মতিলাল নেহেরুকে, ১৯২৭ সালে কলকাতা সফরের সময় নবকৃষ্ণ গুঁই এই সন্দেশ খাইয়েছিলেন। খাঁটি ছানা দিয়ে তৈরি এই সন্দেশের রং একেবারে সবুজ। যার জন্য দায়ী পেস্তা বাটা। সন্দেশের নাম ছিল পেস্তা বল। মতিলাল নেহেরু সামনে তা হাজির করার পর থেকে নেহেরু সন্দেশ হিসাবে খ্যাতি পায় পেস্তা বল। তেমনই একটি মিষ্টি হল ‘মাদার ইন্ডিয়া’। মাদার টেরিজাকে উৎসর্গ করে এই মিষ্টির নাম রাখা হয়েছে। মিষ্টিটি বানায় হেঁদুয়ার রামদুলাল দে সরকার স্ট্রিটে অবস্থিত শতাব্দী প্রাচীন মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠান সুবোধ চন্দ্র মল্লিক।
বিশ শতকের কলকাতায় ‘ট্রেন্ড’ হয়ে গিয়েছিল স্মারক মিষ্টি। স্মরণীয়, বরেণ্যদের নামে মিষ্টি উৎসর্গ করতেন শহরে বিখ্যাত ময়রারা। খ্যাতনামাদের নামের সঙ্গে নাম মিলিয়েই মিষ্টির নাম রাখা হত।

সুবোধ চন্দ্র মল্লিক-এর অন্যতম কর্ণধার অভিজিৎ মল্লিক বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, ‘‘মাদার টেরিজাকে সম্মান জানিয়ে, তাঁকে উৎসর্গ করেই আমরা ‘মাদার ইন্ডিয়া’ নামটা দিয়েছি। মাদার টেরিজা নাম তো দেওয়া যাবে না। তাই মাদার ইন্ডিয়া রাখা হয়েছে। প্রায় আট-দশ বছর ধরে এই মিষ্টি বানানো হচ্ছে। আমরা ছাড়া ‘মাদার ইন্ডিয়া’ আর কেউ বানায় না। অনেক দোকানদার চেষ্টা করেছে কিন্তু কেউই সেইভাবে বানাতে পারেনি।’’
মিষ্টিটির বিশেষত্ব কোথায়, সে প্রসঙ্গে অভিজিৎবাবু জানালেন, ‘‘মাদার ইন্ডিয়ার আসল রহস্য ড্রাই ফ্রুট-এ। কী ভাবে মিষ্টির ভিতরে ড্রাই ফ্রুট ঢোকানো হয় সেটাই মূল। আরও অনেক রকম জিনিস থাকে, সব বলা যায় না। পেস্তা, কাজু এগুলো তো থাকেই। ওপরে সন্দেশ, ভিতরে ড্রাই ফ্রুট।’’
তাঁর মাতৃত্বের অপার ছোঁয়া পেয়ে এ শহর, তার বাসিন্দারাও মাদারকে আপন করে নিয়েছে। বাঙালি নিজের প্রিয় খাবার, মিষ্টির নামকরণ করেছে তাঁর নামে। এও তো এক কৃতজ্ঞতা জানানোর নামান্তর।
দাম ত্রিশ টাকা। প্রতিদিন বেলা একটার পর থেকে এই মিষ্টি সুবোধচন্দ্র মল্লিক-এ পাওয়া যায়। মাদার টেরিজার নামে উৎসর্গীকৃত মিষ্টির চাহিদা প্রসঙ্গে অভিজিৎবাবু জানাচ্ছেন, ‘‘আমাদের এই মিষ্টির চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। বিয়ে বাড়িতেও এখন বেশিরভাগই ‘মাদার ইন্ডিয়া’ নিচ্ছে।’’
১৯২৯ সালের ৬ জানুয়ারি কলকাতায় পা পড়েছিল সিস্টার টেরিজার। সেখান থেকে দার্জিলিংয়ে চলে যান তিনি। ১৯৩১-র ২৫ মে বিশেষ উপাসনার মাধ্যমে সিস্টার টেরিজা সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন। এরপর এন্টালির লোরেটো কনভেন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। শুরু হয় শিক্ষিকার জীবন। সেখানে সেন্ট মেরিজ স্কুলে ভূগোল এবং ধর্ম বিষয়ে পড়াতে থাকেন। ১৯৪৪ সালে সেন্ট মেরিজ-এর অধ্যক্ষা হন। ১৯৪৮ সালে লোরেটো সঙ্ঘের সঙ্গে দুই দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করে, কালো গাউন ছেড়ে নীল পাড় সাদা শাড়ি পরে তিনি হয়ে উঠলেন মা। ততদিন বাংলা শিখে ফেলেছেন। মতিঝিল বস্তিতে গড়লেন স্কুল, পাঁচের দশকে তৈরি হল মিশনারিজ অব চ্যারিটি। একের পর এক কর্মযজ্ঞ।
ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছে ‘নির্মল হৃদয়’, ‘শিশু ভবন’, ‘প্রেমদান’, ‘দয়াদান’, কুষ্ঠরোগীদের জন্য আশ্রম। মাদার অ্যাগনেস টেরিজা বা মাদার টেরিজা, আজীবন আর্ত, দুঃস্থ মানুষের সেবা করে গিয়েছেন। অসহায়, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দিয়েছেন, অনাথকে দিয়েছেন মাতৃত্বের ছায়া, ক্ষুধার্থকে দিয়েছেন খাবার। তাঁর কাজ, তাঁর জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতা শহর। তাঁর মাতৃত্বের অপার ছোঁয়া পেয়ে এ শহর, তার বাসিন্দারাও মাদারকে আপন করে নিয়েছে। বাঙালি নিজের প্রিয় খাবার, মিষ্টির নামকরণ করেছে তাঁর নামে। এও তো এক কৃতজ্ঞতা জানানোর নামান্তর।