
মল্লভূমি অর্থাৎ বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত মিষ্টি মতিচুর। লাড্ডু গোত্রের এক মিষ্টি। ঈশ্বরের নৈবেদ্য হিসেবে তার জন্ম। পুরোনো লোকজ প্রবাদে রয়েছে, ‘‘গান-বাজনা-মতিচুর/ তিন নিয়ে বিষ্ণুপুর’’।
ভাবা যায় এক ঐতিহাসিক জনপদ, যার ইতিহাস কমপক্ষে হাজার বছরেরও বেশি! সেই শহরকে বোঝাতে একটি মিষ্টির নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। ভেবে দেখুন, কতটা জনপ্রিয় ছিল মতিচুর। পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের বাড়িতে সরস্বতী পুজো উপলক্ষ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃত শ্লোকের কথা কি ভোলা যায়?
“লুচি কচুরী মতিচুর শোভিতং
জিলিপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম।”
লুচি, কচুরির সঙ্গে মতিচুরও যে শোভা পাচ্ছে। মতিচুর গোটা বাংলা জুড়ে খ্যাতি পেয়েছিল। সম্প্রতি সেই মতিচুরের জন্য জিআই তকমা পেল বিষ্ণুপুর। মন্দিরনগরী বিষ্ণুপুরের সন্তান হল মতিচুর। মল্লভূমের মাটিতেই কোনও এক মোদকের হাতে তার জন্ম। জনশ্রুতি অনুযায়ী, আরাধ্য দেবতা গোবিন্দের ভোগে নৈবেদ্য হিসাবে বিশেষ ধরনের এক নতুন মিষ্টি তৈরির জন্য কোনও এক মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মল্লরাজা। তদানিন্তন সময়ে বিষ্ণুপুরের বিস্তীর্ণ অংশে ছিল জঙ্গল। জঙ্গলে প্রচুর সংখ্যায় পিয়াল গাছের দেখা পাওয়া যেত। ওই মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী অনেক মাথা খাটিয়ে স্থানীয় পিয়াল গাছের বীজ সংগ্রহ করে তা পেষাই করে বেসন তৈরি করেন। সেই বেসন থেকে ছোটো ছোটো দানা আকারে বোঁদের মতো ভেজে তা চিনির রসে ফেলে তৈরি করেন লাড্ডু। দানাগুলো দেখতে অনেকটা মোতি অর্থাৎ মুক্তোর মতো। সে কারণেই লাড্ডুর নাম হয় মতিচুর। মিহিদানা হোক বা বোঁদে, সব লাড্ডুর মেকানিজম এক, ছোটো ছোটো দানা পাকিয়ে বড়ো গোলক তৈরি করা। স্থানীয় বাসিন্দারা পিয়ালের বীজ সংগ্রহ করে ঢেঁকিতে পেষাই করে বেসন তৈরি করতেন। ওই বেসন দিয়েই বোঁদের চেয়ে ছোটো এবং মিহিদানার চেয়ে আকারে সামান্য বড়ো মতিচুর তৈরি করা হত। সেই মতিচুর দিয়ে পাকানো হত লাড্ডু।
মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী অনেক মাথা খাটিয়ে স্থানীয় পিয়াল গাছের বীজ সংগ্রহ করে তা পেষাই করে বেসন তৈরি করেন। সেই বেসন থেকে ছোটো ছোটো দানা আকারে বোঁদের মতো ভেজে তা চিনির রসে ফেলে তৈরি করেন লাড্ডু। দানাগুলো দেখতে অনেকটা মোতি অর্থাৎ মুক্তোর মতো। সে কারণেই লাড্ডুর নাম হয় মতিচুর।

আর একটি কিংবদন্তি অনুসারে মনে করা হয়, মল্লরাজ বীর হাম্বির আমলে মতিচুরের সৃষ্টি। কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর রাজা দেবতার অর্ঘ্যের মিষ্টি তৈরির জন্য মুর্শিদাবাদ থেকে হালুইকর নিয়ে এসেছিলেন। নবাবের জেলার প্রসিদ্ধ ময়রাদের হাতেই প্রথম তৈরি হয়েছিল ‘মতিচুর’। তারপর এলাকার ময়রারাও সে কৌশল শিখে ফেলেন। মতিচুরের সঙ্গে মল্লরাজাদের রাজধানী বিষ্ণুপুরের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে।
তবে মতিচুরের মূল উপাদান পিয়াল বীজের বেসন এখন আর সেইভাবে মেলে না। পিয়াল গাছই বিরল। এখন বিষ্ণুপুর শহরের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরা অন্যত্র মূলত ঝাড়খণ্ড থেকে পিয়াল বীজ আমদানি করেন। এতে খরচ বেড়ে যায়। কোনও কোনও মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী বুটের ডালের বেসন দিয়ে মতিচুর বানান। মতিচুরের লাড্ডু জিআই স্বীকৃতি পেতেই পিয়াল ফলের বীজের খোসা ছাড়ানোর মেশিন বসাতে উদ্যোগী হয়েছে প্রশাসন। মেশিন বসানো হলে ব্যবসায়ীরা নিজেদের চাহিদা মতো পিয়াল ফল এনে মেশিনে তার খোসা ছাড়িয়ে নিতে পারবেন। বনদপ্তরের মাধ্যমে বিষ্ণুপুরের জঙ্গলে পিয়াল গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিচ্ছে প্রশাসন। ফলে আগামী দিনে পিয়াল বীজের অপ্রতুলতা ঘুচবে।
এখন শহরের অল্প কিছু সংখ্যক দোকানেই মতিচুর পাওয়া যায়। বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যমণ্ডিত মতিচুরের লাড্ডুর জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য মিষ্টি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। প্রশাসনও সহযোগিতা করেছে। বিষ্ণুপুর স্টেশন রোডে অবস্থিত শতবর্ষ প্রাচীন দোকান লাহা সুইটস্-র কর্ণধার সৌরভ লাহা বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, ‘‘মল্লরাজাদের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে মতিচুরের সঙ্গে। এটাই আভিজাত্য। পিয়াল বীজ আছে। তার বেসন থেকে ‘মতিচুর’ লাড্ডুটা তৈরি হয়। বিষ্ণুপুরের এটাই বিখ্যাত মিষ্টি।’’ সৌরভের কাছেই জানা গেল, তাঁর দোকনে মতিচুরের দাম পনেরো টাকা প্রতি পিস।
সৌরভের দাদু রেবতী মোহন লাহার হাত ধরে পথচলা শুরু হয়েছিল লাহা সুইটস্-র। মতিচুরের জিআই ট্যাগ পাওয়া প্রসঙ্গে সৌরভ জানালেন, ‘‘জিআই পাওয়ার ফলে মানুষের মধ্যে খুব ভালো সাড়া রয়েছে। বিষ্ণুপুরের মানুষ তো খুবই উত্তেজিত বিষয়টা নিয়ে। এমনকী বিষ্ণুপুরের বাইরের লোকেদেরও খুব আগ্রহ রয়েছে। বিক্রিও বেড়েছে। এখন দেখা যাক, আমরা এটাকে কতদূর কী নিয়ে যেতে পারি। চিন্তা ভাবনা অনেক কিছু আছে।’’ তিনি আরও জানালেন, প্রায় দু-তিন বছর যাবৎ তাঁরা মতিচুরের জিআই প্রাপ্তির জন্য লড়াই চালাচ্ছিলেন। অবশেষে জয় এল।
মল্ল রাজারা আর নেই কিন্তু তাঁদের কীর্তিগুলো রয়ে গিয়েছে। তেমনই টিকে আছে মতিচুর। এবার জিআই স্বীকৃতির সুবাদে তার খ্যাতি আরও দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে। বাণিজ্য বাড়বে।

২০০৪ সালে ভারতে সর্বপ্রথম জিআই ট্যাগ পায় দার্জিলিং চা। দিনে দিনে আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে তালিকা। বাংলার একের পর এক পণ্য জিতে নিচ্ছে জিআই স্বীকৃতি। কোনও পণ্যের জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার মূল ভিত্তি হল অনন্যতা এবং প্রাচীনত্ব। মতিচুরের লাড্ডুর বয়স কয়েকশো বছর। কোন এক কালে স্থানীয় কোনও অখ্যাত মোদক-ময়রার হাতে মতিচুরের জন্ম, তাও রাজ ফরমান পূরণ করতে। স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করে এক অনন্য মিষ্টি বানিয়েছিলেন মতিচুরের আবিষ্কর্তা। স্মৃতির সরণি বেয়ে সেই দেবভোগ্য মিষ্টি আজও বয়ে নিয়ে চলেছে ইতিহাস। মল্ল রাজারা আর নেই কিন্তু তাঁদের কীর্তিগুলো রয়ে গিয়েছে। তেমনই টিকে আছে মতিচুর। এবার জিআই স্বীকৃতির সুবাদে তার খ্যাতি আরও দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে। বাণিজ্য বাড়বে। ভোজন রসিক, মিষ্টিপ্রেমী মানুষ ব্লাড সুগারের ভয়কে দূর ঠেলে মতিচুর চেখে দেখবেন, সেই সঙ্গে বিষ্ণুপুরের ইতিহাসও ফিরে দেখা হবে।

