
বলছেন বাংলার জনপ্রিয় ফুড ভ্লগাররা
ফুড ভ্লগারদের প্রিয় শব্দ কি ‘কন্ট্রোভার্সি’? তাঁদের প্রিয় খাদ্য কি ‘গালাগাল’? ফেসবুক স্ক্রোল করছেন, প্রতি সেকেন্ডে একটা করে বিরিয়ানির ভিডিও আসছে। ও হ্যাঁ, শুধু বিরিয়ানি নয় সঙ্গে রয়েছে পোলাও, মাছ-মাংস, শাহি থেকে পেটাই পরোটা, মুড়ি-মুড়কি নানাবিধ কম্বো। কেউ আস্ত খাসি ধরে নাচছেন আবার কেউ ছাগলের ডাক ডাকছেন! রিভিউ বলতে মাংস কতটা নরম আর কত কেজি ঘি পড়ছে তাতে। মাংসের টুকরোর ওজন কত, ঝোল কতটা লাল, কতটা ঝাল, আনলিমিটেড দেওয়া হয় কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটামুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষেত্রে এটাই ফুড ভ্লগিংয়ের (Food Vlogging) সংজ্ঞা হয়ে গিয়েছে।
ভ্লগারদের (Vlogger) কল্যাণে নেটপাড়ায় রোজ একটা করে দাদা, দিদি, কাকার উত্থান হচ্ছে। কিছু দিন তাঁরা ট্রেন্ডিং থাকছেন, তারপর শুরু হচ্ছে লড়াই। ওই দিদির সঙ্গে এই দিদি, সেই দাদার সঙ্গে ওই দাদাকে লড়িয়ে দিচ্ছেন ভ্লগাররাই। ঝগড়া হচ্ছে, যুযুধান দুই শিবিরের কাজিয়ায় মিলছে ফায়দা, যত লড়াই তত ভিউ! ফুড রিভিউ ছাড়া বাকি সব রয়েছে অধিকাংশ ফুড ভ্লগে। কোনও কোনও ভ্লগার তো আবার কয়েকটা দোকান ছাড়া অন্য কোথাও যান না। অনেকের আবেগের বহিঃপ্রকাশ হয় হিন্দিতে, ঘি ঢালা দেখে বলে ওঠেন ‘ও ভাই সাব!’। খাবার আবার তাঁরা পেটপুরে খান না, খাবার খান দাবিয়ে, অর্থাৎ ‘দাবাকে খায়ে’-র বঙ্গীয় সংস্করণ!
তবে ব্যতিক্রমও আছে, এমন বহু দোকান রয়েছে যেগুলো ভ্লগারদের জন্য রীতিমতো চুটিয়ে ব্যবসা করছে। ফুড ভ্লগিংয়ের জন্যেই সস্তা ও সুস্বাদু খাবারের সন্ধান পাচ্ছেন মানুষজন। অনেক অজানা খাবারের কথা উঠে আসছে, কোথায় কোনটা ভালো তার ধারণা মিলেছে। কোন হোটেলে কী পাওয়া যায়, কোন রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম কেমন, ইত্যাদি জানা যাচ্ছে। জানা হচ্ছে খাবারের ইতিহাস।

ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ী
আজকের দিনে একের পর এক তরুণ ফুড ভ্লগিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। ফি দিন তৈরি হচ্ছে কয়েকশো ফুড ভ্লগিং চ্যানেল। এই প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ কী? আজকাল ‘ফুড ভ্লগিং’ শব্দবন্ধের আওতায় যা যা হয়, তাতে কি সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে? ফুড ভ্লগিংয়ের আদৌ কি কোনও ব্যাকরণ হয়? এ’সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় ফুড ভ্লগারদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাতেই উঠে এসেছে সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি।
লেখক তথা ফুড ব্লগার এবং ফুড ভ্লগার ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ী অর্থাৎ ফুডকা’র মতে, “ফুড ভ্লগিং বেড়ে যাওয়া কারণ হল; লোকজন সোশ্যাল মিডিয়ায় সোশ্যাল অ্যাকসেপ্টেন্স চায়। সেটার জন্যেই ফুড ভ্লগিং। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনভেস্টমেন্ট কম, রিটার্ন কম-বেশি আছে, সেখানে এটা না-হওয়াটাই অস্বাভাবিক।” তিনি আরও বললেন, “ফুড ভ্লগিংয়ের সেই অর্থে তো কোনও সংজ্ঞা নেই। আমার ক্ষেত্রে ব্লগ আর ভ্লগ দুটো আলাদা, আমি দুটো মিডিয়ামেই আছি। দুটোর কনটেন্ট প্যাটার্ন আমার ক্ষেত্রে সম্পূর্ন আলাদা।” উল্লেখ্য, ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ীর ফুড ব্লগিং ওয়েবসাইটের নাম ‘মহামুশকিল’, তিনি এখনও ফুড ব্লগ লেখেন, তাঁর নিজের কথায় মহামুশকিল আজও জীবন্ত।
ভ্লগারদের কল্যাণে নেটপাড়ায় রোজ একটা করে দাদা, দিদি, কাকার উত্থান হচ্ছে। কিছু দিন তাঁরা ট্রেন্ডিং থাকছেন, তারপর শুরু হচ্ছে লড়াই। ওই দিদির সঙ্গে এই দিদি, সেই দাদার সঙ্গে ওই দাদাকে লড়িয়ে দিচ্ছেন ভ্লগাররাই। ঝগড়া হচ্ছে, যুযুধান দুই শিবিরের কাজিয়ায় মিলছে ফায়দা, যত লড়াই তত ভিউ!
হাল আমলের ফুড ভ্লগিং প্রসঙ্গে তাঁর মত, “লোকে যেটা দেখছে, ভ্লগাররা সেটাই করছেন। লোকে যদি না দেখে, তাহলে নিশ্চয়ই কেউ সেটা করবে না। কেউ গালাগাল খাওয়ার জন্য করে না। ভালো হোক, খারাপ হোক যাই হোক, দর্শকের একটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে। আমরা যদি ক্রিঞ্জ না দেখি তাহলেই ক্রিঞ্জ তৈরিও হবে না। এটা ডিমান্ড আর সাপ্লাই চেন। সব কিছুরই ভালো দিক, খারাপ দিক আছে, প্রচুর রেস্টুরেন্ট, দোকান বা স্টল আছে, যেগুলো ফুড ভ্লগারদের জন্য দাঁড়িয়ে গেছে। তার মধ্যে হয়তো ফুডকা আছে, অনেক অনামী চ্যানেল আছে, এমন চ্যানেল আছে যাঁদেরকে হয়তো সারাক্ষণ লোকে গালাগালি দেয়, তাঁদের জন্য প্রচুর দোকান দাঁড়িয়ে গেছে।”
কথা বলেছিলাম, ফুড ফ্যারিস্তা (Food Farishta) চ্যানেলের শর্মিলা বসুঠাকুরের সঙ্গে। তাঁর মতে তরুণ প্রজন্মের ফুড ভ্লগিংয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ হল, জনপ্রিয় হতে চাওয়ার খিদে। তাঁর কথায়, “রান্না ও খাবার এমন একটা জিনিস, এটা খুব সহজেই জনপ্রিয় হয়ে যায়। যদিও কতটা রিসার্চ ওয়ার্ক থাকছে, কতটা অথেনটিসিটি থাকছে, অনেক জায়গাতেই সন্দেহের অবকাশ থাকছে। কত ভিউ হচ্ছে, কত উপার্জন হচ্ছে ইত্যাদি নানান কিছু প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সেটা খারাপ বা জরুরি নয়, সেকথা আমি বলছি না। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই অনেক সময় ওটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। অন্য জিনিস নিয়ে করলে হয়তো এতটা সম্ভব না। এতে কম সময়ের মধ্যে সাফল্য পাওয়া যায়, সেজন্যেই হয়তো ভ্লগিং বাড়ছে বলে আমার ধারণা।”
ভ্লগিংয়ের নামে দুই দোকানের মধ্যে লড়াই বাঁধিয়ে দেওয়া, ভ্লগে খাবারের রিভিউ বাদ দিয়ে বাকি সব থাকা, এগুলো কি সমাজে বা ফুড ভ্লগিং দুনিয়ায় কোনও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে? শর্মিলা বসুঠাকুর বলছিলেন, ফুড নিয়ে সিরিয়াসলি কিছু করতে গেলে, প্রথমেই তার ইতিহাসটা জানা দরকার। পড়াশোনা করা দরকার। সেটা সময়সাপেক্ষ, একাগ্রতা দরকার। মনে হয় না এগুলো খুব বেশি লোকের আছে, কারও নেই এমন ধারণাও ঠিক নয়। যাঁদের আছে তাঁরা সফল হন। এখন উদ্দেশ্য, বিধেয় গুলিয়ে গিয়ে কোনওমতে কীভাবে জনপ্রিয় হওয়া যাবে। কী বলছে না বলছে, মাথমুণ্ডু কোনও কিছুর ঠিক নেই! এগুলো তো এক ধরনের ডকুমেনটেশন। কেউ সিরিয়াসলি যদি করে তাহলে থেকে যাবে। কাজে যদি গলদ থেকে যায়, তাহলে তো যথাযথভাবে ডকুমেন্টেড হল না। সেটা নিঃসন্দেহে খারাপ দিক, সেই অর্থে তার একটা প্রভাব পড়তেই পারে।

শর্মিলা বসুঠাকুর
বহু রেস্তোরাঁ আছে, বাঙালি খাবার বলতে কয়েকটা পদ ছাড়া আর কিছুই নেই! সেই আলু পোস্ত, না-হলে চিংড়ি মাছের মালাইকারি, আলু দিয়ে মাটন আর এখন তো ঠাকুরবাড়ির নামে সব চলে। ডাব চিংড়ির পদ্ধতিই তো আসল। আজকাল রান্না করে নিয়ে ডাবের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, উপর দিয়ে চিংড়ি মাছের লেজ দিয়ে সাজিয়ে, হয়ে গেল ডাব চিংড়ি। এটা তো ঠিক নয়। এই সততাগুলো থাকা দরকার, পড়াশোনা, রিসার্চের প্রতি মনোযোগ দরকার। সেগুলো আজকাল থাকে না। বাঙালিদের অজস্র রান্না আছে। একটু বই পড়ে, গবেষণা করে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে যদি কেউ ভ্লগিং করে তাহলে আমাদের রান্নার সঠিক ইতিহাসটা মানুষ জানতে পারবে। স্বাদ জানতে পারবে। বিদেশে বাঙালি রান্না মানেই কারি নয়তো ভর্তা। এত বৈচিত্র কেউ জানেই না। এত যখন ভ্লগিং হচ্ছে সেগুলোও তো করা দরকার। ভ্লগিংয়ের ক্ষেত্রে দায় সারা, উপর উপর কাজ। আবারও বলছি, সবার ক্ষেত্রে নয়। অনেকেই আছেন যাঁরা সত্যিই খুব ভালো করেন। শুধু শহর নয় গ্রামগঞ্জ, মফস্সলেও অনেকই ভালো ফুড ভ্লগিং করে জনপ্রিয় হয়েছেন। পুষ্পরানির মতো গ্রামবাংলার অনেক প্রবীণা, গৃহবধুই ফুড ভ্লগিং-এর মাধ্যমে বাংলার সনাতনী স্বাদকে পৌঁছে দিয়েছেন দেশ-বিদেশের হেঁশেলে।
100& Above চ্যানেলের দীপের মতে, “বর্তমানে ফুড ভ্লগিংয়ের নির্দিষ্ট কোনও ব্যাকরণ হয় না। যে যাঁর নিজের ধারায় নিজের মতো করে ফুড ভ্লগিং করছে। কোনও নিয়ম নেই। অনেকে ‘দেখিয়ে দেবো’ মনোভাব নিয়েও নিজের মতো করে ভ্লগিং করেছে। একটা নিজস্বতা আছে।”
ফুড ভ্লগিং বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসাবে দীপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিকের কথা উল্লেখ করলেন, “খাবার সম্পর্কিত কোনও ভিডিও বানিয়ে সহজেই নিজের চ্যানেল শুরু করা যায়। ফুড ভ্লগিং নিয়ে কাজ করলে সে চটজলদি শুরু করতে পারবে। খুব কম খরচে, সামান্য সেটআপেও এটা করা সম্ভব। খাবার সংক্রান্ত যা খুশি এমনকি খাবারের দোকান, খাবার দোকানের মালিক নিয়ে ভিডিও বানিয়েও সে টিকে যেতে পারে আপাতত। সে জন্যেই ফুড ভ্লগিং এত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে লোকে আর খাচ্ছে না, খেয়ে ভিডিও বানাচ্ছে না। না খেয়ে গল্প করে ফুড ভ্লগিংয়ের নামে ভিডিও করলে, তাঁর খরচ শূন্য। যা অনেকের পক্ষে সুবিধার। কারণ অনেকেই সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে আসেন। অনেকে স্টুডেন্ট, তাঁদের পক্ষে সুবিধা। অন্য কিছু করতে গেলে, কেবল দক্ষতা দিয়ে হবে না। অর্থেরও প্রয়োজন। এটার এন্ট্রি পয়েন্ট অনেক সুবিধাজনক। এটা মানুষ বেশি বেছে নিচ্ছেন পছন্দ থেকে নয়, বাধ্যবাধকতা থেকে।”
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফুড ভ্লগিং থেকে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছে খাবারের রিভিউ। এসে পড়ছে ঝগড়া, বিবাদ। এটা কি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না?
“লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দুনিয়ার অন্যান্য ক্ষেত্রে এই নেতিবাচক জিনিসগুলোই চলছে। হিন্দি আর বাংলা সিরিয়ালগুলো কে দেখছে? যেখানে একই ব্যাক্তির চারটে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দর্শকই এটা দেখছে। যতই আমরা বলি, এটা যুবদের মাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুক আসার পরে, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, যাঁদের হিউমার-স্যাটায়ার নিয়ে ধারণা নেই, জানতেও চান না, যাঁদের পড়াশোনা নেই, তাঁদের জন্যই মূলত এই ধরনের ফুড ভ্লগিংগুলো বানানো হচ্ছে। যাঁরা বানাচ্ছেন, তাঁরা এটা ভেবেই বানাচ্ছেন যে সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষ কোনও রেস্তোরাঁর খাবারের রিভিউ দেখে কী করবে! এমন লোকের সংখ্যাই বেশি। দিন শেষে রিভিউ করা হচ্ছে কিনা, তাঁদের কিছু যায় আসে না। বরং তাঁর পাশের পাড়ার কাকুর দোকানে ভিডিও করতে গিয়ে চারটে ভালো বা খারাপ কথা বললে, তিনি কোনও একটা শুনে মজা পাবেন। আর এই ভিডিওগুলো একবার দেখলে মুক্তি নেই। অ্যালগোরিদম! কোনও আবেগ নেই এতে। শেষ দশটা ভিডিও তুমি কী দেখেছো, চাও আর না চাও! ওরম ভিডিও দেখলে তোমার কাছে ওরকম ভিডিওই আসবে। রিভিউ করতে গেলে খরচও তো হবে। সবাইকে কেউ ফ্রিতে খাবার দেবে না, আর টাকা দিয়েও ডাকবে না। অনেকেই বটম জোনে রয়েছে, যা করতে হবে নিজের পয়সায় করতে হবে। আমাদের অর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে টাকা একটা বড়ো ফ্যাক্টর। যাঁরা সমাজের উঁচুস্তরে আছেন, তাঁরা বলবেন বটে ‘খারাপ প্রভাব পড়ছে’। খারাপ প্রভাব তো আগে থেকেই রয়েছে। নতুন করে আর কী পড়বে!” বলছিলেন দীপ।

100& Above-এর দীপ
দীপের কথা অনুযায়ী, সবই দর্শকের উপর নির্ভর করে। বাংলায় ফুড ভ্লগিং এভাবেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। দর্শক নিম্ন মধ্যবিত্ত বা গরিব শ্রেণীর মানুষ। শহর বলতে কলকাতা, শিলিগুড়ি কিছুটা। গ্রাম-গঞ্জে লোকে রাস্তার খাবারই বেশি খায়, স্ট্রিট ফুড। পরিস্থিতিই আমাদের চালনা করছে।
জিরোওয়াট (Zerowatt)-এর সৌম্যজিৎ ঘোষ, ২০১৫ চাকরির সুবাদে মুম্বইতে থাকাকালীন দেখেছিলেন, ইউটিউব চ্যানেলের নিজস্ব অফিস আছে, কর্মীদের মাইনে দেওয়া হচ্ছে। ভেবেছিলেন একটা চ্যানেল থেকে এত রোজগার সম্ভব? কী করে সম্ভব? তারপর ইউটিউব নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমি বুঝতে পেরেছিলাম চার-পাঁচ বছরের মধ্যে ইউটিউব এমন জাগায় পৌঁছবে, যা কেউ ভাবতেই পারেনি সে’সময়। এখন কোটি কোটি টাকা ইনভেনস্টমেন্ট হচ্ছে ইউটিউবে। ইউটিউব নিয়ে পড়াশুনো করি। ২০১৯ সালে ফুড ভ্লগিং শুরু করি। তখন ফুড ভ্লগিং নিয়ে মানুষের ধারণাই ছিল না। হাতে গোনা কয়েকজন ছিল। আমি ভাবলাম নিজস্ব কিছু তৈরি করতে হবে। মায়ের সঙ্গে কথা হল। মা বললো চল, আমি কিছু রান্না করি, তুই খা। মাকে এভাবে পাশে পাবো, বুঝিনি। এভাবেই শুরু। মায়ের রান্না আর আমার উপস্থাপনা। বাঙালি মানেই ভোজনরসিক, খাওয়াদাওয়া নিয়ে আবেগ একমাত্র বাঙালিরই আছে। তাঁরা খাবার নিয়ে কল্পনাপ্রবনও। আমার ভিডিও দেখে দেশ-বিদেশের মানুষ মেসেজ করে। কেউ বলে মাকে মিস করছে, কেউ বলে দেশকে মিস করছে, কেউ বলে শহরকে মিস করছে।”
ফুড ভ্লগিংয়ের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সৌম্যজিতের মত, “ফেসবুক হোক বা ইউটিউব ফুড কনটেন্ট মানুষ দেখে বেশি। অনেকে আছে মডেল হতে চায়, লাইফ স্টাইল ভ্লগার হতে চায়, তবুও সব ফুড ভ্লগিংয়ে ঢুকে যাচ্ছে, কারণ ফুড ভ্লগিংয়ে দর্শক বেশি। মানুষ দেখে বেশি। ফুড ভ্লগিং করার জন্য খাওয়ার প্রতি প্যাশন থাকতে হবে, ভালোবাসা থাকতে হবে। আমি চেয়েছিলাম আমার বাড়ির খাবার খেয়ে ফুড ভ্লগিং করবো। মানুষকে বাড়ির খাবারমুখী করবো। বাড়ির মা, মাসি, দিদা, ঠাকুমা তাঁদের-কে ফুড ভ্লগিংয়ের মাধ্যমে তুলে ধরাই ছিল আমার কনসেপ্ট। আমাকে দেখে প্রচুর মানুষ শুরু করেছে। আমার প্রচুর খুদে দর্শক, কিশোর দর্শক আছে, যারা মেসেজ করে আমায়। বাবা-মারা বলে দেখো তোমার ভিডিও দেখে খাচ্ছে, না হলে তো খেতেই চায় না। প্যাশন আমার প্রফেশন হয়ে গেছে।”
ফুড ভ্লগাররা দিনরাত মিম, ট্রোলের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে বিদ্রুপ হচ্ছে। ট্রোলে কি ফুড ভ্লগাররা বিচলিত হন? সবাই ভাবে ফুড ভ্লগাররা ফ্রিতে খাচ্ছে, তাই ট্রোল বেশি হয়। সবাই টাকা দেয়, টাকা দিয়ে খায়। কেউ কেউ ভালোবেসে বা প্রোমোশনের জন্য বিনামূল্যে খাওয়ায়। “ট্রোল নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই” বলছিলেন সৌম্যজিৎ। তাঁর কথায়, যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজ করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই কম-বেশি ট্রোল হন। খারাপ লাগলে, এটা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। ফুড ভ্লগারদের জন্য সৌম্যজিতের পরামর্শ, “ফুড ভ্লগাররা বড্ড বেশি বিরিয়ানি, বড্ড বেশি মটন কষা, এই নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছেন। মটন কি ঝরে ঝরে পড়ছে! আরও অনেক কিছু আছে, সেগুলো এক্সপ্লোর করো, যেখানে কাজটা একঘেঁয়ে লাগবে না। তোমারও লাভ হবে, অন্যেরও।”

সৌম্যজিৎ ঘোষের ফুড ভ্লগ জিরোওয়াট-এর অতিথি অভিনেতা অম্বরীশ ভট্টাচার্য
স্পষ্টত, মানুষ সহজে জনপ্রিয় হতে চাইছেন। কম পরিশ্রম করে, আশু সাফল্য পেতে চাইছেন, মাধ্যম হিসাবে তাঁরা বেছে নিচ্ছেন ফুড ভ্লগিংকে। সে’কারণে দর্শকদের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে, দোকানে দোকানে লড়াই, বিরিয়ানির ব্যাটেলকে ভিডিওর মাধ্যমে নিয়ে আসছেন ভ্লগাররা। এমন জিনিস বেড়ে যাওয়ার দায় অনেকাংশেই দর্শকদের। একজন দর্শক হিসেবে এবার আপনিই ঠিক করুন কী করবেন। সচেতন হবেন নাকি গড্ডালিকায় গা ভাসাবেন!