ট্যাবুর বাইরে বেরিয়ে, ছোটোদের রান্নার ক্লাসে ভর্তি করাচ্ছেন অভিভাবকরা

দেশ-বিদেশ থেকে রান্না শিখছে খুদেরা

“ছোটোদের সময় কাটবে, মন ভালো থাকবে ভেবে প্যানডেমিকের সময় রান্না শেখানো শুরু করেছিলাম। ভবিষ্যতে শেখাবো কিনা তখন অতশত ভাবিনি। কিন্তু প্যানডেমিক কেটে যাওয়ার পর দেখলাম,অনেকেই বাচ্চাদের রান্না শেখাতে চাইছেন। এছাড়া, আমি নিয়মিত বড়োদের রান্নার ক্লাস করাই। বড়োদের ক্লাস মাসে তিনটে থাকলে ছোটোদের ক্লাস মাসে একটাই। ছোটোদের ক্লাসে নিজে রান্না করে দেখাই না, যতটুকু বলি ওরা মন দিয়ে শোনে এবং চটজলদি শিখে নেয়।” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলছিলেন বিশিষ্ট Chef শমিতা হালদার।

মাত্র দশ বছর বয়সেই রন্ধনশিল্পে হাতেখড়ি হয়ছিল শমিতার। মায়ের অসুস্থতার কারণে ওই বয়সে, খানিক নিরুপায় হয়েই হাতাখুন্তির মর্ম বুঝতে হয়েছিল। পরে ইংরেজিতে অনার্স, বিএড করে রান্নাকে ভালোবেসে হয়ে উঠলেন পেশাদার বাবুর্চি। রান্নায় কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই। আজ তাঁর রান্নার স্বাদ নেওয়ার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ডাক আসে, ফাইভ স্টারে নিয়মিত পপ-আপ করেন। প্রথম সারির পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় রান্না নিয়ে তাঁর বিশেষ কলাম।  

শমিতার কথায়, রান্নার ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করে থাকে খুদে শিক্ষার্থীরা, এমনকী পরীক্ষা থাকলেও। যে সব বাচ্চারা বিগত কয়েক বছর ধরে ক্লাস করছে, তারা এখন পাকা রাঁধুনি। কারো কোনও সাহায্য ছাড়াই রান্নার পুরো প্রক্রিয়া নিজেরাই সমাধা করে। এমনকি অফলাইনে বিশেষ ভাবে সক্ষম শিশুরাও রান্না শিখছে তাঁর কাছে। কলকাতার ‘প্রথম পদক্ষেপ’ নামক একটি সংস্থা ছাড়াও গুরগাঁও-তে কিছু অটিস্টিক বাচ্চাদের শিখিয়েছেন। কোনও কোনও সামার ক্যাম্পেও বাচ্চাদের জন্য বিশেষ ভাবে রান্নার ক্লাস নেন শমিতা। বিশেষ ভাবে সক্ষম শিশুদের ছাড়া ছোটোদের রান্নার ক্লাস তিনি অনলাইনেই নেন। 

রান্না নিয়ে এখনকার প্রজন্মের মধ্যেও এই ধরনের ট্যাবু আর নেই এবং অভিভাবকরাও এখন অনেক মুক্তমনা। রান্না একটা শিল্প, যেকোনও মানুষই তা আপন করে নিতে পারেন, পেশা হিসেবেও নির্বাচন করতে পারেন। এখনকার সময়ে রান্না জানাটাও প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে।

৪+ থেকে ১৪+ বয়সী বাচ্চারাই শমিতা’র এই রান্নার ক্লাসে অংশ নেয়। ছোটোদের ক্লাসে সাধারণত কীধরনের রান্না শেখান? শমিতা বলছিলেন, “বাচ্চাদের ক্লাসে স্বাভাবিকভাবেই কোনও জটিল রান্না রাখি না। সেজন্য ওরাও খুব সহজেই শিখে যেতে পারে। এখনও পর্যন্ত এমন হয়নি যে, কেউ পারেনি। আমি সাধরণত মরশুমি রান্না করি, রান্নার ক্লাসেও তাই শেখাই। এখন যেমন গরমের মরশুম আসছে, এই সময় আমি চেষ্টা করবো সেরকম রান্নাই শেখাতে। তরমুজ, আম, আনারস – গরমে যেসব ফল পাওয়া যায় সেগুলো দিয়ে বিভিন্ন রান্না শেখাবো। শীতকালে যেমন ওরা স্ট্রবেরি, চকলেট দিয়ে কেক বানানো শিখেছিলো। টিফিনের খাবার হিসেবে ওরা শিখেছে পাস্তা স্যালাদ, স্মুদি এরকম বেশ কিছু রেসিপি। স্বাদ এবং স্বাস্থ্য, দুইই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তাই এভাবেই আমি ওদের সিজনাল বেসড রান্না শেখানোর চেষ্টা করছি।”  

ভালো করে হাঁটা শেখেনি, চার বছর বয়সী পুঁচকেরাও তাঁর রান্নার ক্লাসে যোগ দেয়। নেদারল্যান্ডস, ইউকে, ইউএসএ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাচ্চারা কুকিং-ক্লাসে অংশ নিচ্ছে। প্রতি ক্লাসে ৪০ থেকে ৬০ জন বাচ্চা থাকেই। এদের উৎসাহ এবং মনোযোগ দেখার মতো। শমিতা বলছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন রান্না নিয়ে এখনকার প্রজন্মের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক ট্যাবু আর নেই। অভিভাবকরাও এখন অনেক মুক্তমনা। ছেলেদের রান্না শেখার দরকার নেই, মেয়েদের আছে – এই অযৌক্তিক, প্রথাগত ধারণার যুগ আর নেই। এখন নাচ, গান, আঁকা, থিয়েটারের মতো পারফর্মিং আর্টের পাশাপাশি অভিভাবকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন বাচ্চাদের রান্না শেখায়। রান্না একটা শিল্প, যেকোনও মানুষই তা আপন করে নিতে পারেন, পেশা হিসেবেও নির্বাচন করতে পারেন। এখনকার সময়ে রান্না জানাটা প্রয়োজনের মধ্যেই পড়ে।  

“আমি যখন সামাজিক মাধ্যমে কিছু পোস্ট করি, অনেকেই উৎসাহ দিয়ে বলেন, লিঙ্গনির্বিশেষে রান্না শেখানোর এই ব্যাপারটা খুব ভালো লাগে। তাছাড়া অভিভাবকরা এখন যেভাবে তাঁদের সন্তানদের রান্নার ক্লাসে অংশ নেওয়াচ্ছেন, সেটাই প্রমাণ করে এর ইতিবাচক দিক। এমনকি বাচ্চাদের ক্লাসের যা চাহিদা, আমি পেরে উঠি না।” বলছিলেন শমিতা।  

কোভিডের সময় যখন শুরু করেছিলেন, ছোটোদের শেখানোর জন্য কোনও পারিশ্রমিক নিতেন না। এখন ন্যূনতম ফিজ নিয়ে থাকেন। সেই অর্থ ব্যয় হয় স্কুলছুট কিছু বাচ্চাদের মূলস্রোতে ফেরানোর কাজে, পড়াশুনোর জন্য। শমিতা’র ক্লাসের খুদেরাও জানে, ঠিক কী কারণে তাদের থেকে পারিশ্রমিক নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে একটা সেতুবন্ধন হয়। ছোটো শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যবহৃত জামা, জুতো, লেখাপড়ার সামগ্রী দিয়েও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়।  

মধ্যমণি Chef শমিতা হালদার (লাল টিপ)

রান্না শেখার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার নিরিখে ভবিষ্যতে হয়তো আরও একটু গুছিয়ে ক্লাস করাবেন, আপাতত এভাবেই নিজ তত্ত্বাবধানে খুদে রাঁধুনি গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে চাইছেন শমিতা।

______________

ছবি ঋণ:

শমিতা হালদার

   

Developed by DXDasia