
সুরে সুরে সরোদের কিংবদন্তিকে স্মরণ করবেন পণ্ডিত রণজিৎ সেনগুপ্ত ও তাঁর ছাত্রছাত্রীরা
বাবা সংগীতের তালিম দিচ্ছেন ছেলেকে। কড়া শাসনে দিনে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত রেওয়াজ করতে হয়। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে। কারো সঙ্গে কথা বলা নিষেধ। বাবার সঙ্গেই খেতে বসতে হয়। খাওয়ার সময় মাত্র ৩ মিনিট। সময় পেরিয়ে গেলে উঠতে হবে খাওয়া অসমাপ্ত রেখেই। কখনও মা লুকিয়ে জানলা দিয়ে খাইয়ে যেতেন ছেলেকে। বাবার যখন শতবর্ষ পেরিয়ে গিয়েছে, তার পরেও শিখিয়ে চলেছেন ছেলেকে। এমন গুরু আর ক’জনের ভাগ্যেই মেলে! বাবা তো আর যে সে মানুষ নন। তিনি উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ (Ustad Allauddin Khan)। আর ছেলের নাম আলি আকবর খাঁ (Ali Akbar khan), তিনিও সংগীতের সুরে জয় করেছেন গোটা বিশ্ব। দেখতে দেখতে একশো বছর পার করে ফেললেন এই সরোদ কিংবদন্তিও। গুরু-শিষ্য পরম্পরার সুরে তাঁর শতবর্ষ উদযাপন করতে চলেছে ‘মনমঞ্জরী ইনস্টিটিউট অফ পারফর্মিং আর্টস অ্যান্ড রিসার্চ’ (Monomanjari Institute of Performing Arts and research)। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার প্রখ্যাত সরোদিয়া পণ্ডিত রণজিৎ সেনগুপ্ত ও শ্রীমতী শিরিন সেনগুপ্ত নাথের তত্ত্বাবধানে আগামী ১৪ এপ্রিল এই শ্রদ্ধানুষ্ঠানটি হবে হো চি মিন সরণি (Ho chi minh sarani)-র আইসিসিআর (ICCR)-এ (সত্যজিৎ রায় অডিটোরিয়াম)।
যোধপুরের রাজদরবারে সংগীতশিল্পী হিসেবে নিয়োজিত হয়েছিলেন আলি আকবর খাঁ। মহারাজ হনবন্ত সিং তাঁকে ‘উস্তাদ’ উপাধি দেন। কয়েক বছর যোধপুরে থাকার পর আলি আকবর খাঁ চলে যান মুম্বাই। অবতীর্ণ হন সংগীত পরিচালকের ভূমিকায়। সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী’, তপন সিংহের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর মতো বাংলা ছবিতে তাঁর সুর এখনও অনুরণিত হয় আবিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের মনে। সারা বিশ্বে রাগসংগীত পরিবেশন করেছেন আলি আকবর খাঁ। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করার জন্য নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয় ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান প্রমুখ অংশ নিয়েছিলেন এই অনুষ্ঠানে। সেখানে উস্তাদ আলি আকবর খাঁ সরোদ পরিবেশন করেছিলেন। তিনি সংগীত শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। পেয়েছেন দেশে বিদেশে নানান সম্মাননা।
উস্তাদ আলি আকবর খাঁ-র কর্মশালায় যোগ দিয়েছেন পণ্ডিত রণজিৎ সেনগুপ্ত। উস্তাদজির দুই সুযোগ্য পুত্র উস্তাদ আশিস খাঁ এবং উস্তাদ ধ্যানেশ খাঁ-র কাছে তালিম নিয়েছেন। তিনিই সম্ভবত ভারতবর্ষের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি আলি আকবর খাঁ এবং রবিশংকরের উপর বিরল দুটি বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। তাঁর কথায়, “এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমার একটা আবেগ জড়িয়ে আছে। উস্তাদজির শতবর্ষ বলে কথা! ওনার তৈরি রাগ, ওনার তৈরি সিনেমার গান, জ্যাজ ওয়ার্ল্ড মিউজিকের উপর ওনার কাজ, মূলত এগুলোই এই অনুষ্ঠানে স্মরণ করা হবে। সরোদ বাজানো ছাড়াও উনি আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছেন, সেটা সারা পৃথিবীর সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। সব থেকে বড়ো কথা এই অনুষ্ঠানে কোনও পেশাদার শিল্পী বাজাচ্ছেন না বা গাইছেন না। শুধুমাত্র ‘মনমঞ্জরী ইনস্টিটিউট অফ পারফর্মিং আর্টস অ্যান্ড রিসার্চ’-এর শিক্ষার্থীরাই গানবাজনা পরিবেশন করবে বিকেল জুড়ে। অনুষ্ঠানের শুরুতে গুরুবন্দনা এবং শেষে নিজস্ব বন্দিশ পরিবেশন করবো আমি। এই অনুষ্ঠান উস্তাদজির প্রতি আমার সামান্য শ্রদ্ধার্ঘ্য।”

উস্তাদ আলি আকবর খাঁ-এর সঙ্গে পণ্ডিত রণজিৎ সেনগুপ্ত
উস্তাদ আলি আকবর খাঁ বলেছিলেন, “অন্তত দশ বছর সংগীত সাধনা করলে নিজে তৃপ্তি পেতে শুরু করবে। বিশ বছর সাধনা করলে তুমি তোমার শ্রোতাদের তৃপ্তি দিতে পারবে। সাধনা ত্রিশ বছর অতিক্রম করলে হয়তো তোমার গুরু তৃপ্ত হতে পারেন; কিন্তু ঈশ্বরকে তৃপ্ত করার জন্য তোমাকে আরো আরো অপেক্ষা করতে হতে পারে …”। সংগীতের প্রতি তাঁর এই দর্শনই বোধহয় সুর হয়ে বেজে উঠতে চলেছে শতবর্ষ উদযাপনে সন্ধের জলসায়।
