আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন দাদামশাই রজনীকান্ত সেন রচিত গানের শুদ্ধতা চর্চায়
সংগীত বিশারদ দিলীপকুমার রায় (Dilip Kumar Roy)। নামটি নিয়ে গোড়াতেই সংশয়ের নিরসন করে রাখা দরকার। তিনি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (Dwijendralal Roy) খ্যাতকীর্তি পুত্র দিলীপ কুমার নন। কিন্তু তিনিও আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল। এই দিলীপকুমারের দাদামশাই হলেন রজনীকান্ত সেন (RajaniKanta Sen)। চাকরি সূত্রে পায়ের তলায় সরষে নিয়ে দুনিয়া ঘুরেছেন। বর্তমানে থিতু হয়েছেন শান্তিনিকেতনে (Santiniketan)।১০৫টি বসন্ত পেরিয়ে দাদুর গান—কান্তগীতি আগলে এখনও বেঁচে আছেন তিনি।
দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে আষ্ঠে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন রজনীকান্ত সেন, মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে যাঁর জীবনাবসান হয়। রোগ শয্যায় শায়িত রজনীকান্তকে দেখে এসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “শরীর হার মানিয়াছে কিন্তু চিত্তকে পরাভূত করিতে পারে নাই। কণ্ঠ বিদীর্ণ হইয়াছে কিন্তু সংগীতকে নিবৃত্ত করিতে পারে নাই”। রজনীকান্ত সারা জীবনে অন্তত দু’শো নব্বই খানা গান লিখেছেন। সুরারোপও করেছেন নিজে। কিন্তু কোন বাঁধা স্বরলিপি তৈরি করে যেতে পারেননি। দিলীপকুমার রায় আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন রজনীকান্ত রচিত গানের শুদ্ধতা চর্চায়।
দিলীপকুমার আজীবন ডুবে আছেন সংগীতে। রজনীকান্ত তো বটেই এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। শতবর্ষ পেরিয়েও তাঁর কন্ঠ সমান সজীব। সত্যরঞ্জন রায়ের পাঁচ ছেলের মধ্যে সবচেয়ে বড় দিলীপ কুমার রায় জন্মেছিলেন মামাবাড়ি পাবনার ভাঙ্গাবাড়িতে। মা শান্তি দেবী রজনীকান্ত সেনের কন্যা। বাবা ছিলেন কেমিস্ট। ১৯৩৯ সালে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বিএসসি পাস করে দিলীপ কুমার রায় কিছুদিন চাকরি করার পরে বাবার কেমিকেল ফার্মে যোগ দেন। সেই সঙ্গে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা চলতে থাকে।
তাঁর মা রজনীকান্তের কণ্যা শান্তিলতা দেবীর গলায় গান শুনে শুনেই তিনি রজনীকান্তের স্বরলিপি বাস্তবায়িত করেছেন। দিলীপকুমারের তত্ত্বাবধানে গান রেকর্ড করেছেন হেমন্ত (Hemanta Mukherjee), সন্ধ্যা (Sandhya Mukhopadhyay), অর্ঘ সেন, পান্নালাল ভট্টাচার্য (Pannalal Bhattyacharya)-রা। তিনি নিজে তালিম পেয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম (Kazi Nazrul Islam) এবং হিমাংশু রায়ের কাছে।
দিলীপ কুমার রায়ের সম্পর্কে মামা সুকৃতি সেন ছিলেন সেনোলা রেকর্ড কোম্পানির ট্রেনার। তিনি একদিন দিলীপ কুমার রায়ের গান শুনে ডেকে বলেন, ‘রেকর্ড করবে?’ তখন রেকর্ডের গানের বই ছাপা হতো। দিলীপ রায় চিন্তা করলেন যে রেকর্ডে যদি গান গাইবার সুযোগ পান, তবে অন্য শিল্পীদের পাশে তাঁর নামও সে বইয়ে ছাপা হবে। রাজি হয়ে গেলেন। একদিন মামার সঙ্গে সেনোলা কোম্পানিতে গেলেন অডিশন দিতে। পরীক্ষকেরা গম্ভীরমুখে গান শুনলেন। তাঁর কেন জানি মনে হলো অবস্থা ভালো না। কাজেই তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সেখান থেকে পালালেন। এর মধ্যে বেশ কিছুদিন মামার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। একদিন দেখা হতে মামা বললেন, ‘তুমি সেদিন না বলে সেখান থেকে চলে এলে, ওরা তো তোমাকে সিলেক্ট করেছে।’ এরপর গান রেকর্ডিংয়ের জন্য শুরু হলো রিহার্সাল। প্রথম দুটি গান শিখতে সময় নিয়েছিলেন দুই-আড়াই মাস। রেকর্ড হলো। সুকৃতি সেনের কথা ও সুরে রেকর্ডের দুই পিঠে দুটো গান। ১৯৩৮ সালের পুজোয় রেকর্ডটি বেরোল।
অজয় ভট্টাচার্যের কথা ও বীরেন ভট্টাচার্যের সুরে ‘তোমায় আমায় দেখা হবে অশ্রুনদীর তীরে/ আজি গোধূলির বাঁশরী’। দিলীপবাবু গ্রামোফোন কোম্পানিতে যদিও রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ এবং দ্বিজেন্দ্রলালের গানের ট্রেনার ছিলেন, কিন্তু তিনি প্রথম জীবনে আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে বেশ কিছু রেকর্ড করেন। যেমন ‘জানি জানি এ বেদনা মিছে নয়’, ‘গানগুলি মোর ভেসে চলে’; কাজী নজরুল ইসলামের কথায় ও সুরে ‘আমি রচিয়াছি নব ব্রজধাম’ ইত্যাদি। ১৯৩৯ সালে আকাশবানীতে গান গাইলেন প্রথমে আধুনিক, পরে রবীন্দ্রসংগীত। চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে হরিপদ রায়ের ট্রেনিংয়ে অতুলপ্রসাদ সেনের ‘তুমি গাও তুমি গাও’/ ‘ওগো দুঃখসুখের সাথি’ গান দুটি সেনোলা থেকে বের হয়। রজনীকান্ত সেনের গানও প্রথম রেকর্ড করেন সেনোলাতে। এই কোম্পানি থেকেই তাঁর শেষ রেকর্ডটি করেন চল্লিশের দশকের শেষের দিকে।
দিলীপবাবুর গাওয়া তাঁর দাদু রজনীকান্ত সেনের গানের প্রথম রেকর্ড ‘বেলা যে ফুরায়ে যায়/ কেউ নয়ন মুদে দেখে আলো’। এরপর দীর্ঘদিন রেকর্ড করেননি। এর মধ্যে পঞ্চাশের দশকে ট্রেনার হিসেবে যুক্ত হন এইচএমভিতে। গায়ত্রী মুখোপাধ্যায় প্রথম অতুলপ্রসাদের গান করলেন দিলীপবাবুর ট্রেনিংয়ে। গান দুটি ‘আর কতকাল থাকব বসে’ এবং ‘বধূয়া, নিদ নাহি আঁখি পাতে’।
শতবর্ষ পূর্ণ করে ১০৫ বছরে পদার্পণ করেছেন। এখনো তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করছেন। ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত গান শেখাচ্ছেন। তাঁর এই উদযাপন বাংলা গানের জগত থেকে এখনও ‘কান্তগীতি’ মুছে যেতে দেয়নি।