
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ৯
এদিকে ‘কবি’ বিক্রম সেদিন ডায়েরিতে এলিজি লিখেছিলেন। গান-কাকুকে উদ্দেশ্য করে মধ্যরাতের সেই ডায়েরিতে লেখা ছিল, ‘‘কোথায় রেখেছো পথিকের ঘুম/ পথের দু-ধারে শালবন কথা বলে?/ হৃদয়ে ঝরেছে আলোর শীর্ষ?/ জানো কি, বুকের গহনে দীঘল মেঘ খুলে যায়…!’’
খাটো চাইনিজ কলারের ফতুয়া পরে ছেলেটা দৌড়চ্ছে বকুলবীথির দিকে। তারপর পাঠভবন। রাস্তার ধারে ছড়িয়ে থাকা কাগজ ফুল। বুনো ছাতিমের গন্ধ। বসন্তে রাঙা পলাশ। আর জলরঙের কোপাই নদীটা। এই সবকিছু ছিল বিক্রমের বড্ড প্রিয়। সাইকেল করে বেরিয়ে পড়তেন লাইব্রেরির দিকে। কখনও সোনাঝুরি। বাড়ি ফিরেই হয়তো মা’কে বলে উঠবেন, “দু-পিস মাছ ভেজে দাও। খুব খিদে পেয়েছে।” তখনও কি শিল্পী জানেন, সোনাঝুরির গাছে গাছে টাঙানো থাকবে তাঁর ক্ষণস্থায়ী আয়ু!
(গত পর্বের পর)
পালাবে কোথায়?
শান্তিনিকেতনের রেডিওতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় মোহন সিংকে দিয়ে গাওয়াচ্ছেন অতুলপ্রসাদের গান। এমনকি মোহন সিংকে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন সুপ্রিয় ঠাকুর। প্রথম থেকেই সুপ্রিয় ঠাকুর চাইতেন মোহন যাতে গানটা না ছেড়ে দেয়। মোহরদি অর্থাৎ কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় মোহন এবং রণধীরকে বললেন,
– তোমরা কোনটা চাও? তোমরা অর্গানাইজারদের পিছনে ঘুরবে? নাকি অর্গানাইজাররা তোমাদের পিছনে ঘুরবে?
– দ্বিতীয়টাই তো ভালো। (হাসি)
– তাহলে অত চিন্তা কোরো না। সংগীত ভবনের ফর্ম বেরোলে অ্যাপ্লাই করে দিও।
যুবকবেলার মোহন সিং
কয়েকটা চাকরির বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। মোহন অ্যাপ্লাই করলেন। কিন্তু মোহন এবং টুকু (রণধীর) বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনের ফ্যাকাল্টি হিসাবে নিযুক্ত হলেন। ঘটনাচক্রে তাঁদের দুজনের চাকরি শুরু হয়েছিল একই দিনে। ১৯৭৮ সালের ৫ নভেম্বর। এই খবর শুনে মোহরদি বলেছিলেন, “হ্যাঁ, এইবার ঠিক হয়েছে। পালাবে কোথায়? শান্তিনিকেতন ছেড়ে কেউ কোথাও যেতে পারবে না।” এই মোহরদিই একবার বলেছিলেন, আমাদের পরে একমাত্র মোহনকেই লোকে মনে রাখবে।
মোহন-টুকু এবং বিক্রম-আবির
রণধীর রায় ওরফে টুকুর সঙ্গে মোহন সিং বা তাঁর স্ত্রীর বন্ধুত্বের কথা আমরা প্রায় সকলেই জানি। আগের দুই পর্বে মোহনের দুই সন্তান বিক্রম এবং আবিরের সঙ্গে টুকু কাকুর সম্পর্কের কথাও বলা হয়েছে অল্পবিস্তর। একটি ঘটনার কথা আজ বরং উল্লেখ করা যাক। সেদিন তবলা আর তানপুরা টেনেটুনে দুই ভাই বসেছে রেওয়াজে। তবলায় আবির আর বন্দিশে টুংটাং সুর লাগিয়ে গলা ছাড়ছে বিক্রম। গাইছে, ‘আজহু না-আয় সখিরি’। হঠাৎই বাড়িতে এলেন রণধীর রায়। দুই ভাইয়ের এই গান শুনে তিনি বললেন, “তোমরা জানো, এই গান আমি তোমাদের বাবাকে শিখিয়েছি”। বিক্রম তো অবাক! আবির পাশ থেকে বলল, “গাও দেখি”। রণধীর শুরু করলেন গান। গানের শেষে দুই ভাই যেন কোরাসে বলে উঠল, “তোমার থেকে বাবা ভালো গায়।” হেসে ফেলেছিলেন রণধীর। সেই থেকেই দুই ভাইয়ের সখ্য হয়ে গেলেন রণধীর রায়। মোহন সিং-এর কাছে যিনি টুকু, বিক্রম-আবিরের কাছে তিনিই হয়ে উঠলেন গান-কাকু।
আনন্দ পুরস্কারের অনুষ্ঠানে সপরিবারে
সন্ধেগুলো কাটত বাবার কাছে গল্প শোনার আশায়। যে মোহন একদিন বাংলা জানতেন না, স্ত্রীর কাছে সেই কবে উপহার পেয়েছিলেন ‘সহজপাঠ’। তারপর বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন, সেই মোহন দুই ছেলেকে শোনাচ্ছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’।
“মানুষের আয়ু মানুষের জীবনের ভুল মাপকাঠি। দশ বছরের জীবন সে উপভোগ করেছে দেড় বছরে।” – সেই কবে লিখে গিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ। বাবার কাছে এই সব গল্প শুনে আবির হয়তো বুনে চলেছেন নতুন কোনো সুর আর বিক্রমের চোখে তখন হাজার হাজার স্বপ্ন।
(চলবে… )
*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত
অনিবার্য কারণবশত এই সপ্তাহে কোনো ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হল না।
