
কিভাবে বাঙালির হেঁশেলে জায়গা পেল গোয়ালন্দ স্টিমার কারি, জেনে নিন রেসিপিও।
এ গল্প কোনো রূপকথার নয়, এ গল্প বাঙালির স্বাদের। বাঙালি চিরকালই ভোজনরসিক। খেতে ভালোবাসে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়! এদেশ-বিদেশ ঘুরে আর কিছু আনুক আর না আনুক খাবারের স্বাদকে সে ডেকে এনেছে রান্নাঘরে। তবে শহুরে বাঙালির রান্নাঘরে শুধু যে বিদেশি খাবারই গৃহীত হয়েছে, তা নয়। কখনো কখনো দেশি মাঝিমাল্লার খাবারও ঠাঁই পেয়েছে তার হেঁশেলে।
আরও পড়ুন: বনলতা সেনের প্রিয় খাবার
“ত্রিশ বৎসর পরিচয়ের আমার আর সবই বদলে গিয়েছে, বদলায়নি শুধু ডিসপ্যাচ স্টিমারের দল৷ এ-জাহাজের ও-জাহাজের ডেকে-কেবিনে কিছু কিছু ফেরফার সব সময়ই ছিল, এখনও আছে, কিন্তু সব কটা জাহাজের গন্ধ হুবহু একই৷ কীরকম ভেজা-ভেজা, সোঁদা-সোঁদা যে গন্ধটা আর সব-কিছু ছাপিয়ে ওঠে, সেটা মুরগি-কারি রান্নার৷ আমার প্রায়ই মনে হয়েছে, সমস্ত জাহাজটাই যেন একটা আস্ত মুরগি, তার পেটের ভেতর থেকে যেন তারই কারি রান্না আরম্ভ হয়েছে৷ এ-গন্ধ তাই চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোয়ালন্দ, যে কোন স্টেশনে পৌঁছানো মাত্রই পাওয়া যায়৷” – সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নোনাজল’ ছোটোগল্প এভাবেই লিখে গেছেন গোয়ালন্দ স্টিমার কারির (Goalanda Steamer Curry) কথা।
গোয়ালন্দ স্টিমার কারির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গুঁড়ো মশলা নয়, আস্ত মশলা দিয়েই রান্না হয় এই পদ। গতানুগতিক রান্নার সঙ্গে স্বাদের তফাৎটা তৈরি হয় সেখান থেকেই।
ওপার বাংলার স্মৃতি উস্কে দিয়ে আজও টলটলে পদ্মা নদী (Padma)। রোদেলা দুপুর মেখে সে যেন অনন্যা। কখনও তার আক্রোশ পাড়ের প্রতি। কখনও আবার শান্ত হয়ে ধারণ করছে মানুষজনকে। নৌকা, ভেসেল, স্টিমার। রোজকার ব্যস্ততার গল্প বুনছে। আর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে গোয়ালন্দ (Goalanda)। কিংবা হয়তো এই নিঃশব্দতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে পুরাতনের গল্প-গাঁথা।
সময় বদলেছে। পুরোনো স্মৃতিতে মরচে ধরেছে খানিক, কিন্তু খাদ্যরসিক বাঙালির মেজাজে গোয়ালন্দ ঘাট বদলায়নি আজও। ব্রিটিশ-ভারত ভাগ হওয়ার আগে পূর্ব-বাংলার মানুষকে এই গোয়ালন্দ ঘাট থেকে কলকাতার (Kolkata) ট্রেন ধরতে হতো। আর গোয়ালন্দ পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হতো পদ্মা।
এই গোয়ালন্দ নামের পিছনে লুকিয়ে আছে নানান অভিমত। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, পর্তুগিজ, মগ, ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের আনাগোনা ছিল এখানে। এই পর্তুগিজ জলদস্যু গঞ্জালেসের নাম থেকেই নাকি ‘গোয়ালন্দ’ নামের উৎপত্তি। আবার, কারও কারও মতে স্থানীয় গোয়ালপাড়া থেকেই ‘গোয়ালন্দ’-নামের জন্ম হয়।
সময়টা ১৮৬২ সাল। শিয়ালদহ (Sealdah) থেকে কুষ্টিয়া (Kustia) পর্যন্ত চালু হয় রেল চলাচল। পরবর্তীতে ১৮৭১ সালে সেই রেল পথ সম্প্রসারিত হয় গোয়ালন্দ পর্যন্ত। কলকাতার সঙ্গে ঢাকার বন্ধুত্বের পথেও তাই গোয়ালন্দের ভূমিকা অপরিসীম। রাজবাড়ি জেলায়, পদ্মার তীরের এই জনপদ আজও নদী পারাপারের অন্যতম ঠিকানা। এই যাতায়াতের গল্পের পিছনে ছিল বাঙালির স্বাদের ঘরাণা। মাংসের গন্ধ। মনে পড়ে যায়, কবি পিনাকী ঠাকুরের লেখা বিখ্যাত কবিতা ‘রাতের ট্রেনে’-এর কথা, “নাম শোনছেন গোয়ালন্দ? স্টিমার ঘাটে ভাতের হোটেল।”
গোয়ালন্দ বিখ্যাত ছিল তার চিকেন কারির জন্য। সৈয়দ মুজতবা আলী কিংবা ধীরাজ ভট্টাচার্যের লেখার সেই বিখ্যাত চিকেনের গল্প। স্টিমারের নাবিকদের নিজস্ব রান্না। সেই গোয়ালন্দ ঘাটের রেস্টুরেন্টে, কিংবা স্টিমারের পাচকদের হাতের রান্না খাওয়ার সুযোগ যাঁদের হয়েছিল, তাঁদের মুখে যেন এখনো লেগে আছে সেই রান্নার স্বাদ। একসময়ের জিভে জল আনা জনপ্রিয় এই খাবারের নাম আজ আর কারোর মনে পড়ে না চট করে। সম্ভবত গোয়ালন্দ নদী বন্দর গুরুত্ব হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃতির গহ্বরে তলিয়ে যায় ‘গোয়ালন্দ স্টিমার কারি’ । অবশ্য গত কয়েক বছরে স্টিমার ঘাটের খাবারের স্মৃতিকাতরতা ঘিরে অনলাইনে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই রান্নার রেসিপি। কিন্তু কেমন ছিল এই গোপন রেসিপি?

গোয়ালন্দ স্টিমার কারির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গুঁড়ো মশলা নয়, আস্ত মশলা দিয়েই রান্না হয় এই পদ। গতানুগতিক রান্নার সঙ্গে স্বাদের তফাৎটা তৈরি হয় সেখান থেকেই। উপকরণ বলতে লাগতো একটা গোটা মুরগি। সঙ্গে লাগত তিন-চারটে বড়ো পেঁয়াজ, কয়েকটা রসুনের কোয়া, টুকরো আদা, শুকনো লঙ্কা, একচামচ হলুদ, ছয়-সাত চামচ সরষের তেল আর স্বাদমতো নুন। মুরগিটা কেটে নেওয়া হত প্রথমে। তারপর মুরগির মাংসের সঙ্গে মশলাগুলো মাখিয়ে, রেখে দেওয়া হত একঘণ্টা। আজকের রাঁধুনিরা যাকে বলেন ম্যারিনেশন। তারপর মাংসটা একটু মজে এলে একটা হাঁড়িতে ঢেলে চাপিয়ে দিতে হবে রান্নাটা। মাঝারি আঁচে ৫ থেকে ৭ মিনিট নাড়াচাড়া করে ঢেকে রেখে দিলেই, আসল কাজ শেষ। জল পর্যন্ত দেওয়ার দরকার নেই। মাংস কষে গেলে নিজে থেকেই বেরিয়ে আসবে ঝোল। তারপর মাংসটা নরম হয়ে গেলে ঢাকনা খুলে গরম ভাতের সঙ্গে জমিয়ে পরিবেশন। ব্যাস দিব্যি জমে যাবে দুপুর কিংবা রাতের মেনু।
এই রেসিপির গল্প শুনে আজও ঢাকার সদরঘাট থেকে টাঙ্গাইলের কাছে এলাসিন পর্যন্ত স্টিমারে ভ্রমণের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যায় বাঙালির। না, এ শুধু মুখের কথা নয়। তবে জিভের তো বটেই! আর জিভের স্বাদ পূরণে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। যুগের হুজুগে নতুন নতুন রেসিপি দিয়ে ইন্টারনেটে (Internet) জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই খাবার। উনুন থেকে গ্যাস ওভেন হয়ে মাইক্রোওভেনেও (Micro-oven) আজ চিকেনের এই রেসিপি তৈরি করছেন অনেকেই। দেশ ভাগ হয়েছে, কিন্তু ঐতিহ্য ভাগ হয়নি কোনোদিনই। তাই মাছে-ভাতে বাঙালি আজও পদ্মার ইলিশ কিংবা গঙ্গার চিংড়ির সঙ্গে নিজেদের মাতিয়ে রাখে প্রতিনিয়ত। কাঁটাতারের গল্প দিয়ে স্বাদের ঘরে ভাগ বসানো মুশকিল! হারিয়ে গিয়েও তাই আবার ফিরে এসেছে গোয়ালন্দ স্টিমার কারির গল্প।
