স্বর্গ হতে বাঙালির পাতে পড়িল গরম ভাত আর ‘চিংড়ির ধোকা’

একবার নয়, এ ‘ধোকা’ নিজেই খেতে চাইবেন বারবার

সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় ‘জীবন তীর্থ’য় লিখেছেন খাবারের জন্য নিজের খিদেকে শান দিয়ে রাখার কথা। কারণ, ‘‘প্রথমে ভাতের সঙ্গে প্রচুর ঘি আর আলুভাতে; দ্বিতীয় পর্যায়ে ঘন ভাজা অড়রডাল, আলুর বড় তরকারি, প্রচুর তৈলসিক্ত; তৃতীয় পর্যায়ে একবাটি মহিষের দুধ। ঘন ক’রে জ্বাল দেওয়া। ঘি আর দুধ একেবারে খাঁটি। দুধটা বাবা সংগ্রহ করবার চেষ্টা করতেন এমন মহিষের, যার শেষের দিকে দুধটা শুকিয়ে ঘন হ’য়ে এসেছে।’’

বাঙালির আত্মপরিচিতির বেশ অনেকটাই খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে। দেশভাগ, ভিটেমাটি ছেড়ে আসা, ছিন্নমূলের ব্যথা মিলেমিশে এই অবিভক্ত বাংলাতেই তৈরি হয়েছে একের পর এক স্বাদ। মঙ্গলকাব্য থেকে শুরু করে সমকালীন প্রবন্ধ… সবেতেই মেলে তার প্রমাণ। এই বাঙালিই বোধহয় একমাত্র, যে ফলের খোসা থেকে ডগা, কাণ্ড থেকে শিকড়, ফুল থেকে পাতা সব কিছু দিয়ে তৈরি করে ফেলতে পারে নানা ব্যঞ্জন। আর রান্না? ভাজা, ভাতে, পোড়া, সিদ্ধ, শুক্তো, ঘণ্ট, ছ্যাঁচড়া, ছেঁচকি, চচ্চড়ি, ছক্কা, ছোকা, ঘ্যাঁট, লাবড়া, ঝাল, ঝোল, ভাপা, ডালনা, দোলমা, অম্বল, টক… এক পঙ্‌ক্তিতে ধরানোই মুশকিল।

কালের নিয়মে হারিয়ে গিয়েও লোকমুখে প্রচার পেয়ে পেয়ে ফিরে এসেছে মোচা, থোড়, ডুমুর, কোফতা, দোলমা। কিন্তু পানিফলের ডালনা? কিংবা নালতে পাতা দিয়ে সজনে ফুলের ঘণ্ট, তাল আঁটির ডালনা, শাক শশ্‌শরি, রসজ, বেগুনের বিরিঞ্চি, তিলেপটেশ্বরী, চিংড়ির ধোকা, ডিমের জিলিপি, কপির দম্‌পক্ত, ভেড়ার হাঁড়ি কাবাব, পিটুলি বাটা দিয়ে মাছের শুক্তো, থোড়ের কড়ুই, মাংসের অম্লমধুর শুষ্ক প্রলেহ কিংবা হেমকণার পায়েস? ইতিহাস ঘাঁটতে শুরু করলে নজরে পড়বে এমন শত শত পদের কথা, যা বাঙালি মনে রাখেনি। তবে ভুলে গিয়েও যে নতুন করে মনে করার প্রয়াস চলছে, সেটাও কম নয়।

পুজোর মরশুমে আজ রইল সেরকমই এক বিস্মৃতপ্রায় ব্যঞ্জন – ‘চিংড়ির ধোকা’র রেসিপি।

  • যা যা দিয়ে বানাবেনঃ

৫০০ চিংড়ি মাছ, ১টা বড়ো নারকেল (কুরিয়ে বেটে নিতে হবে), ৭-৮ কোয়া রসুন, ৬-৭টা কাঁচা লঙ্কা, নুন, চিনি ও অন্যান্য সাধারণ মশলা পরিমাণ মতো, সরষের তেল প্রয়োজন মতো।

  • যেভাবে বানাবেনঃ

প্রথমে চিংড়ি গুলো খোসা ছাড়িয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। তারপর চিংড়ি, কাঁচা লঙ্কা, রসুন একসঙ্গে বেটে নিতে হবে। বাটা হয়ে গেলে, নারকেল বাটা, হলুদ, সর্ষের তেল দিয়ে মেখে নিতে হবে। এবার যেভাবে ডালের ধোকা বানায় ঠিক সেভাবেই কড়ায় নেড়েচেড়ে নিয়ে থালায় ঠাণ্ডা করে বরফি করে কেটে নিতে পারেন অথবা, পুরো মিশ্রণটা কলাপাতায় মুড়ে পাতুরির মতোও করে নেওয়া যেতে পারে। তবে, প্রক্রিয়া যেমনই হোক না কেন, গরম ভাত এর সঙ্গে মাস্ট! নাহলে, মর্তলোকের স্বর্গীয় স্বাদে খানিক হলেও ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা থেকে যাবে।

 

 

 

Developed by DXDasia