বিশ্ব শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম বাঙালি হিসাবে পদক জয় মেহুলি ঘোষের

প্যারিস অলিম্পিকের শ্যুটিং বিভাগে নিশ্চিত করলেন ভারতের একটি স্থানও

মানুষ স্বপ্ন দেখে, লক্ষ্য স্থির করে। এগিয়ে যায়। হারে, জেতে। আবার পরের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। হতাশা আর হেরে যাওয়ার অন্ধকার থেকে সাফল্যের আলোয় উত্তরণে, বাস্তব জগতেই তৈরি হয় রূপকথার গল্প। ক্রীড়াবিদদের জীবনে বোধহয় এই ঘটনা আরও স্পষ্ট। বা এটাই তাঁদের জীবন। হাঁটুর চোট, টোকিও অলিম্পিক (Tokyo Olympics)-এ সুযোগ না পাওয়া, কোভিডের প্রভাবে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার হতাশা থেকে বিশ্ব শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপ-এ ব্রোঞ্জ জয় এবং ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিক (Paris Olympics 2024)-এর জন্য ভারতের একটি স্থান নিশ্চিত করা। মেহুলি ঘোষ (Mehuli Ghosh)-এর যাত্রা খানিকটা রূপকথার মতনই, কিন্তু আসলে প্রবল বাস্তব। আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত ৫৩-তম আইএসএসএফ বিশ্ব শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপ-এ (ISSF World Shooting Championships) ১০ মিটার এয়ার রাইফেল বিভাগে (10 Meter Air Rifle Event) ব্রোঞ্জ পদক জিতেছেন তিনি। সঙ্গে প্যারিস অলিম্পিকে, শ্যুটিং প্রতিযোগিতায় ভারতের জন্য একটি স্থান নিশ্চিত করেছেন। এছাড়াও, বিশ্ব শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে কোনও বাঙালির ব্যক্তিগত স্তরে এটাই প্রথম পদক জয়।

প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে গত ১৪ অগাস্ট থেকে। চলবে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। মেহুলি পদক জিতেছেন গত ১৯ অগাস্ট। দেশে ফিরেছেন সদ্য। প্রতিযোগিতা এবং যাত্রার ধকল কাটিয়ে মেহুলি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “খুবই খুশি। গত তিন বছর ধরে এই মূহূর্তটার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেছি। আমার কোচ, সাপোর্ট স্টাফ, পুরো দল আর বাবা-মা কে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। তাঁরা পাশে না থাকলে এই সাফল্য সম্ভব হতো না।” সোনা জিততে না পারার খানিকটা আক্ষেপ অবশ্যই আছে, তবে লক্ষ্য ছিল অলিম্পিকের জন্য ভারতের একটি স্থান নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ায় খুশি বলে জানান মেহুলি। তবে কাজ এখনও শেষ হয়নি। তাঁর কথায়, “মূল লক্ষ্য প্যারিস অলিম্পিকে সুযোগ পাওয়া এবং পদক জয়।”

খুশি তাঁর মা মিতালি ঘোষ (Mitali Ghosh)-ও। তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “টোকিও অলিম্পিকে সুযোগ না পাওয়ার জন্য একটা আক্ষেপ ছিলই। মাঝে কিছুদিন, বিভিন্ন কারণে, নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী পারফর্মও করতে পারেনি। কিন্তু মেয়ের উপর ভরসা ছিল যে, ও ঠিক ঘুরে দাঁড়াবে।”

মেহুলি বর্তমানে হায়দ্রাবাদের গান ফর গ্লোরি শ্যুটিং একাডেমি (Gun for Glory Shooting Academy Hyderabad)-তে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাঁর কোচ বিবস্বান গাঙ্গুলি (Bibaswan Ganguly)-র কথায় ধরা পড়ল কতটা কঠিন ছিল পদক পাওয়ার এই লড়াই। তিনি জানান, “ইউরোপিয়ানদের তুলনায় এশিয়ানদের কাছে দেশের জন্য অলিম্পিকের স্থান নিশ্চিত করার কাজ খানিকটা কঠিন। কারণ সুযোগ অপেক্ষাকৃত কম। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিযোগিতা থেকেই অলিম্পিকের কোটা পাওয়া যায়।” নিজের বাড়ি, নিজের রাজ্য ছেড়ে দিনের পর দিন ভিনরাজ্যের একাডেমিতে থাকা, সেখানকার খরচ জোগানোর কাজ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে কতটা কঠিন, তা অনুমান করাই যায়। তার উপর টোকিও অলিম্পিকে সুযোগ না পাওয়ার হতাশা, কোভিডের কারণে মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, সবই পারফরমেন্সে প্রভাব ফেলেছিল বলে জানান বিবস্বান। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এসেছে এই সাফল্য। তাঁর কথায়, “গোটা দলের সাফল্য এটা। কোচ, নিউট্রিশনিস্ট, ডাক্তার, সাইকোলজিস্ট- সবার অবদান থাকে একজন খেলোয়াড়ের সাফল্যের পিছনে। তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মেহুলির জেদ এবং অধ্যাবসায়।”

বিবস্বান গাঙ্গুলি

এমনিতেই ২০০৪ আথেন্স অলিম্পিক (2004 Athens Olympics)-এ রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোর রৌপ্যপদক পাওয়ার পর থেকেই (যা ছিল কোনও ভারতীয়ের অলিম্পিকে প্রথম ব্যক্তিগত পদক জয়) শ্যুটিং নিয়ে এই দেশ আগ্রহী হয়েছে। অভিনব বিন্দ্রা ২০০৮ বেজিং অলিম্পিক (2008 Beijing Olympics)-এ স্বর্ণপদক পাওয়ার পর সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে। তৈরি হয়েছে পরিকাঠামোও। এখন ভারতের জাতীয় স্তরের শ্যুটিং প্রতিযোগিতাগুলির মান এমনকি এশিয়ান গেমস বা কমনওয়েলথ গেমস-এর থেকেও বেশি বলে দাবি করলেন বিবস্বান। সব মিলিয়ে মেহুলির এই সাফল্যকে অসাধ্যসাধন বলাই যায়। কারণ ইতিহাসে জড়িয়ে গেছে তাঁর নাম (বিশ্ব শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে, কোনও বাঙালির ব্যক্তিগত স্তরে এটাই প্রথম পদক জয়)। তাই খুশি মেহুলির কোচও। প্রসঙ্গত, গত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদকজয়ী ভারতীয় দলেও ছিলেন মেহুলি। প্রথম বাঙালি হিসাবে শ্যুটিং বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে দলগত বিভাগে পদকজয়ের কৃতিত্বও মেহুলির। এমনটাই জানালেন বিবস্বান।

কিন্তু লড়াই এখনও শেষ হয়নি। সামনের মাসেই রয়েছে এশিয়ান গেমস। তারপর অলিম্পিক ট্রায়াল। ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (National Rifle Association of India-NRIA)-র নিয়মানুযায়ী, অলিম্পিকের আগে ট্রায়াল রাউণ্ড অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন দেশের প্রথমসারির কয়েকজন শ্যুটার। তাঁদের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হয়, কারা অলিম্পিকে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। বিবস্বান গাঙ্গুলি বিশদে বললেন, “ধরুন অলিম্পিকে শ্যুটিং বিভাগে ভারতের তিনটি স্থান রয়েছে। অর্থাৎ মোট তিনজন ভারতের হয়ে অলিম্পিকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। এবার ট্রায়ালের মাধ্যমে বেছে নেওয়া হবে যে, কারা হবেন সেই তিনজন।” জানা গেল, যিনি দেশের জন্য অলিম্পিকের স্থান নিশ্চিত করেন, তাঁকে কিছু বাড়তি পয়েন্ট দেওয়া হয়।

পদক জয়ের পর পোডিয়ামে মেহুলি ঘোষ(ডানদিকে)

প্রসঙ্গত, এখনও পর্যন্ত শ্যুটিং-এর সব বিভাগ মিলিয়ে (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) ভারতের মোট ছয়টি স্থান নিশ্চিত হয়েছে। তার মধ্যে মেহুলি নিশ্চিত করেছেন চতুর্থ স্থানটি। তাই মনঃসংযোগ একেবারেই হারাচ্ছেন না মেহুলি বা তাঁর দলের কেউই। দু-একদিন বিশ্রাম নিয়েই ফের শুরু হয়ে যাবে প্রস্তুতি। আগের মাসে প্রস্তুতির জন্য প্যারিসে গিয়েছিলেন মেহুলিরা। প্র্যাকটিস করেছেন সেই শ্যুটিং রেঞ্জে, যেখানে অনুষ্ঠিত হবে অলিম্পিক প্রতিযোগিতা। এবারও তেমনই কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে আছে বলে জানালেন তাঁরা। এখন লক্ষ্য শুধুই এশিয়ান গেমস-এ পদক জয় আর প্যারিস অলিম্পিক।

Post Tags
Developed by DXDasia