ব্রাজিলের বধির ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় চারটি পদক বাঙালি কিশোরের

নবম শ্রেণির ছাত্র সৌম্যদীপ পুরুষদের সিঙ্গলসে ব্রোঞ্জ জিতেছে

দুই বছর বয়সেও ছেলে যখন কোনো কথা বলছে না, তখন চিন্তায় পড়লেন শিশুটির বাবা-মা। ডাক্তার দেখানো হল। জানা গেল, শিশুটি ৭৫ শতাংশ বধির হয়ে জন্মেছে। এখান থেকেই মধ্যবিত্ত পরিবারটির ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু হল। বাবা-মা, শিক্ষক, শুভানুধ্যায়ীদের সমর্থনকে সঙ্গে নিয়ে সেই ছেলেটি খেলাধুলোর সুবাদে একদিন পৌঁছে গিয়েছিল ব্রাজিলের ছোট্ট পুর শহর প্যারা ডি মিনাসে। তারপর রূপকথার মতো সোনালি জয়ের স্বাদ লেগে রইল ছেলেটির হাতে।

না, কোনো সাহিত্য বা সিনেমার প্লট বলছি না। অনেকের মনে হতেই পারে, ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শ্রেয়স তালপাড়ে অভিনীত ‘ইকবাল’ চলচ্চিত্রের গল্পটাই হয়তো বলছি।

না, তেমনটি নয়। আদতে সত্যিই ব্রাজিলে প্যারা ডি মিনাস-এ এবার ২০২৩ সালের বধিরদের বিশ্ব যুব ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা হয়েছিল। ভারত সদ্য সমাপ্ত এই প্রতিযোগিতায় সব মিলিয়ে নয়টি পদক জিতেছে। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAI) সোশ্যাল মিডিয়ায় উল্লেখ করেছে ভারতের এই জয়। এই প্রতিযোগিতায় এক বঙ্গসন্তানও এই উজ্জ্বল কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছে। 

বিশ্বের দরবারে পশ্চিমবঙ্গের মুখ উজ্জ্বল করেছেন যাদবপুর সন্তোষপুরের বাসিন্দা সৌম্যদীপ চক্রবর্তী। এই বাঙালি কিশোরের ঝুলিতে চারটি পদক। নবম শ্রেণির ছাত্র সৌম্যদীপ পুরুষদের সিঙ্গলসে ব্রোঞ্জ জিতেছে। পুরুষদের ডাবলসে এবং মিক্সড ডাবলসে সৌম্যদীপ যুগ্মভাবে যথাক্রমে রুপো ও ব্রোঞ্জ জিতেছে। টিম ইন্ডিয়ার তরফে সৌম্যদীপ সোনা পেয়েছে।

বঙ্গদর্শন.কমের সঙ্গে সৌম্যদীপের সাফল্য ও লড়াইয়ের কাহিনি ভাগ করে নিলেন সৌম্যদীপের বাবা সরোজ চক্রবর্তী। কীভাবে তাঁরা বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন? কেমন ছিল সৌম্যদীপের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই? 

কলকাতার একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী সরোজ চক্রবর্তী বঙ্গদর্শন.কমকে বলেন, “আমরা কোনোদিন ছেলেকে বিশেষভাবে সক্ষম ভাবিনি। তেমনি কোনো বিশেষভাবে সক্ষম শিশুকে আলাদা করে দেখা উচিত নয়। সকলের মধ্যেই কিছু করার তাগিদ তৈরি হয়। প্রত্যেকটি শিশুই তার মধ্যে পড়ে।”

আর পাঁচজনের থেকে আলাদা ছেলে। আড়াই বছর বয়স থেকে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করে ছেলে। এই পার্থক্যটা সৌম্যদীপের বাবা-মাকে হতাশ করে দিতে পারেনি কখনও। ছোটো থেকেই খেলাধুলোর দিকে আগ্রহ ছিল ছেলের। তাই ডাক্তারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই একপ্রকার ব্যাডমিন্টনে ভর্তি করেন অভিভাবকরা। মনে মনে তাঁদের শপথ ছিল, ছেলে আর পাঁচটা স্বাভাবিক শিশুর মতোই বড়ো হয়ে উঠবে। পাশে ছিল, খেলার মাঠের শিক্ষকদের ভরসা।

২০১৯ সালে কেরালায় অনুষ্ঠিত সারা ভারত বধির ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় সৌম্যদীপ সাফল্য পায়। বর্তমানে বাংলার অনুর্ধ ১৫ বিভাগে ডাবলস ও সিঙ্গলসে সৌম্যদীপের দ্বিতীয় স্থান। জাতীয় স্তরে বধিরদের ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় সৌম্যদীপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ইন্দর, আমেদাবাদ, কেরালা, ভুবনেশ্বর এরকম বহু জায়গায় রয়েছে তার কীর্তি।

পড়াশুনার পাশাপাশি সৌম্যদীপ ছবি আঁকতে ভালবাসে। গতানুগতিকতার বাইরে বেরিয়ে ছবি আঁকতে পছন্দ করে সৌম্যদীপ। অনেকটা ‘তারে জমিন পর’ চলচ্চিত্রের ঈশানের মতো। পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলোও চলবে তার। অবসরে দেশাত্মবোধক সিনেমা দেখতে পছন্দ করে। প্রিয় সিনেমা ‘এইটটিথ্রি’। দেশের জন্য পদক জিতে এখন সৌম্যদীপ নিজেই দেশকে গর্বিত করেছে। ৭৫ শতাংশ বধিরতা মনের জোরে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে সে। মাসাদুর রহমানের মতো স্রোতের প্রতিকূলে ছুটে চলাই তার লক্ষ্য।

Post Tags
Developed by DXDasia