বিবস্বান এখন কারেন্ট অলইন্ডিয়া র্যাঙ্কিং-এ পঞ্চদশ স্থানে। রাজ্যে এখনও এক
উত্তরপাড়ায় জন্ম তাঁর। ১৯৯০ সালের ২৪ জুলাই। এরপর আর পাঁচটি ছেলেমেয়ের মতোই শুরু হয় লেখাপড়া। কিন্তু ১৯৯৯ সাল নাগাদ, অর্থাৎ ন’বছর বয়সে হাতে উঠে আসে বন্দুক। না কোনও দেশের পক্ষে বা বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, এ যুদ্ধ নিজের সঙ্গে নিজের। ক্লাস ফোরে রাইফেল শ্যুটিং-এ হাতেখড়ি হয় বিবস্বানের। বিবস্বান গাঙ্গুলি। বেঙ্গল শুটিং-এর অন্যতম গর্ব।
২০০২ থেকে ২০১৫ সাল, লাগাতার ১৪ বছর নিজের ইভেন্টে স্টেট শ্যুটিং-এর স্বর্ণপদকে কাউকে হাত দিতে দেননি বিবস্বান। ২০০৩ সালে অল ইন্ডিয়া ইন্টার স্কুল শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম স্থান অর্জন করেন রেকর্ড স্কোরসহ। ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন বিবস্বানের প্রথম জাতীয় স্তরের সাফল্য এটিই।
খেলার বাইরে গান ভালোবাসতেন বিবস্বান। খুব অল্প একটা সময় রবীন্দ্রসংগীতও শিখেছেন তিনি। স্বভাবে ডানপিটে এই ছেলেকেই চেনা যেত না রেঞ্জে ঢুকে পড়লে। এরপর ধীরে ধীরে সময় গড়ায়, বিবস্বান ওরফে বুম ন্যাশনাল শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হন ২০০৫-এ। তারপর ২০০৭-এ ইন্ডিয়ান স্কোয়াড। এইবছরই এশিয়ান শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। ২০০৮-এ ইয়ুথ কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নেন ভারতের হয়ে। এরপর একটা ছোট্ট গ্যাপ।
২০১০-এ ট্রায়াল খেলে ফের স্কোয়াডে ফিরে আসেন বুম। এবছরই খেলেন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ। জয়েন করেন চাকরিতে। ইছাপুর গানশেল। এরপর কথা চলতে থাকে নিজেদের মধ্যে। যে পরোক্ষ রাজনীতিতে প্লেয়ারদের জীবন দুর্বিষহ হতে থাকে দিনকে দিন, সেই রাজনীতিকে জব্দ করার উদ্দেশ্যে কিছু করতে মন চায় তাঁর। ২০১২ সালে অলিম্পিক খেলে ফিরে আসার পর জয়দীপ কর্মকার ঘোষণা করেন একটি অ্যাকাডেমি করতে চান তিনি। নতুনদের সঠিকভাবে গাইড করতে চান তাঁরা। সমস্ত অন্য ডিস্ট্রাকশন ছেড়ে তাঁরা যেন কেবল মন দিতে পারে খেলায়।
এরপর শুরু হয় বিবস্বানদের অন্য এক জার্নি। জয়দীপ কর্মকার, বিবস্বান গাঙ্গুলি ও তাঁদের টিম মিলে বিভিন্ন জায়গায় টক-শো ও ছোটো ছোটো টুর্নামেন্ট করাতে থাকেন নিজেদের সেট-আপ নিয়ে। টেম্পোরারি রেঞ্জ বানিয়ে কলকাতার বিভিন্ন পশ জায়গায় এই টুর্নামেন্ট করানোর মূলে তাঁরা রাখেন- খেলাটিকে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করা এবং শিকড়ের কাছে নিয়ে যাওয়া। এতদিন বহু মানুষ শ্যুটিং সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতেই পারেননি।
বছর আড়াই চলে এই লড়াই। এরপর ২০১৪ সালে ডানকুনি রাইফেল অ্যাসোশিয়েশন রাজি হন তাঁদের প্রোপোজালে। প্রাইজ মানি থেকে জমানো টাকা পর্যন্ত সর্বস্ব দিয়ে বিবস্বানরা বানিয়ে ফেলেন একটি ইন্ডোর রেঞ্জ। ২০১৫-র জানুয়ারিতে সম্পূর্ণ হয় রেঞ্জ বানানোর কাজ। ২ ফেব্রুয়ারি থেকে এই রেঞ্জে সংগঠিত হয় সেকেন্ড ওয়েস্ট বেঙ্গল ইন্টার স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপ।
মধ্যের সময়ে বিভিন্ন স্কুলে ফ্রি ক্যাম্প করান তাঁরা। উদ্দেশ্য একই, সাধারণের কাছে এই খেলাকে পৌঁছে দেওয়া। ফাইনালি ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫, ঘোষিতভাবে শুরু হয় জে কে এস এ অর্থাৎ জয়দীপ কর্মকার শ্যুটিং অ্যাকাডেমি। আরও অনেক কিছুর সঙ্গে কোচিং-এরও দায়িত্ব নেন বিবস্বান। ২০১৬ সালে সাঁই কমপ্লেক্স ও ডানকুনির দু’টি রেঞ্জ মিলিয়ে পথচলা শুরু হয় জে কে এস এ-এর।
এরপর কিং-মেকার-এর রোলে কেটে যায় তাঁদের তিনটে বছর। ২০১৯-এ এসে বুম বুঝতে পারেন চাকরিটা বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ক্রমশ। পদত্যাগ করেন তিনি। ফিরে আসেন নিজের খেলায়। এবছর কুমার সুরেন্দ্র সিং সিলেকশন ট্রায়ালে মেহুলি ও বিবস্বান মিক্সড ডাবলসে রূপো জিতে শেষ করেন ম্যাচ। লাস্ট সেট অফ পয়েন্টে তিনটে টাই হয় চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে।
বুম এখন কারেন্ট অলইন্ডিয়া র্যাঙ্কিং-এ পঞ্চদশ স্থানে। রাজ্যে এখনও এক। ২০১৯-এর স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে পেপার টার্গেট ম্যাচ থেকে ঘোষিতভাবে অবসর নিলেন তিনি। খেলবেন ইলেকট্রনিক টার্গেটে। তবে আমাদের প্রশ্নে তিনি জানান, ‘এখন খেলা বলতে বুঝি জুনিয়রদের উৎসাহ দেওয়া। নিজের কেরিয়ার করতে তো খেললাম বহুদিনই!’
শ্যুটিং-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী বুম। তিনি জানান ২০০৫-২০০৬ নাগাদ কুহেলি গাঙ্গুলি, জয়দীপ কর্মকার আর বিবস্বান গাঙ্গুলি এইক’জন হাতেগোনা লোক ছাড়া সিলেকশন ট্রায়ালে দেখা যেত না বেঙ্গলের মুখ। এবছর সেপ্টেম্বরের ট্রায়ালে শুধু জে কে এস এ থেকেই যাবেন ২৩ জন শ্যুটার। তাঁদের মধ্যে ইন্ডিয়ার টপ ফিফটিনে আছেন ৬ জন।
এবছর কেবল ১০ মিটার ইভেন্টেই ১৮টি সোনা জিতে যুগ্ম স্টেট চ্যাম্পিয়ন হয় জে কে এস এ। জয়দীপ, বিবস্বানদের এই লড়াই গত তিন-চার বছরে অনেকখানিই প্রচারে আনতে পেরেছে এই খেলাকে। আশা রাখা যায় আগামীতে ক্রিকেট, ফুটবলের পাশাপাশি এই খেলার গর্বেও ভাগ বসাবে গোটা পশ্চিমবঙ্গবাসী।