২০০ বছরের পুরোনো ‘মাখনলাল’-এর স্বাদ আজও অমলিন

নতুনবাজারের ‘পুরোনো’ মাখনলাল অ্যান্ড সন্স

আমি আদ্যন্ত খাদ্যরসিক ঘরানার মানুষ। পরিমাণে যাই হোক, যেকোনো খাদ্যবস্তুকেই হতে হবে স্বাদে-গন্ধে-রূপে একেবারে ‘জেনুইন’ — এই হল আমাদের ঘরানার আদর্শ। চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়-তে থাকবে ছেঁচকি থেকে চাইনিজ; বঙ্গবাসী হওয়ার সুবাদেই বোধহয় এখনও এই ভাবাদর্শে আস্থা রাখতে পারি। খাঁটি স্বাদ কালের নিয়মে মুছে যায় তা জানা কথা, তাই সব থেকে ভালো উপায় যা কিছু ভালো তা মেমোর‍্যান্ডাম-এ পুঙ্খানুপুঙ্খ লাগিয়ে রাখা আর আজীবন তা ভাঙিয়ে খাওয়া। যেমন এখন খেতে হচ্ছে আর কি! ভাইরাস আর লকডাউন তো জীবন থেকে ‘ঘরে-বাইরে’ ব্যাপারটা বিলকুল বিকল করে রেখেছে, এখন শুধুই ‘ঘরে’।

ঘরের ‘থোড়-বড়ি-খাড়া’ মার্কা খাবার খেতে খেতে শুধু আমার নয়, অনেকেরই মুখোরচক জিভের সমস্ত জল শুকিয়ে সাহারা হয়ে যেতে বসেছে। এই তো কিছুদিন আগেই কথা হচ্ছিল আমার ইউনিভার্সিটির এক স্যারের সঙ্গে। আদি কলকাতার সবথেকে পুরোনো বাজার 'নতুনবাজার'-এর দু'শো বছরের ঐতিহাসিক ‘মাখনলাল অ্যান্ড সন্স’-এর মিষ্টির যারপরনাই তারিফ করছিলেন স্যার। মিষ্টির মধ্যে আবার বিভিন্নরকমের সন্দেশ দেখলেই আমার মনটা হু-হু করে ওঠে। আর মাখনলাল-এ সবই ‘শুকনো’, অর্থাৎ সন্দেশ। কোনোটা কড়া, কোনোটা নরম। ব্যবহার করা হয় খাঁটি দুধ-ছানা। ‘মাখনলাল’ প্রসঙ্গে মাখনের মতো গলে গিয়ে স্যার-কে গর্বের সঙ্গে বললাম, এ স্বাদের ভাগ আমিও পেয়েছি। আমার প্রথম মাখনলাল-অভিযান, যা আমি কখনও ভুলবো না, শোনালাম স্যার-কে।

মাখনলাল-এ সবই 'শুকনো', অর্থাৎ সন্দেশ

তখন স্নাতকোত্তর পড়াশোনা চলছে। ইউনিভার্সিটির তাবড় তাবড় মিষ্টি-গবেষক(বন্ধু)দের কাছে মাখনলালের রিভিউ শুনতে শুনতে একদিন মনে হল, ছ-বছর কেটে গিয়েছে পড়াশোনা সূত্রে কলকাতানিবাসী হয়েছি, অথচ মাখনলালের মিষ্টি চেখে দেখিনি, এ বড়ো অন্যায় কথা। সেই অন্যায়ের বোঝা কত শীঘ্র ঘাড় থেকে নামানো যায় এ দুশ্চিন্তা নিয়ে দলভারী না করে একা একদিন গিয়ে পৌঁছালাম মাখনলাল-এ, সরেজমিন রসনা-তদন্তে। সে এক কাণ্ড! ঠিকানা অনুসারে গিরিশ পার্ক মেট্রো থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে নতুন বাজারের দিকে এগোচ্ছি আর দেখতে পাচ্ছি চার পুরুষ ধরে চলা ১৭৫ বছরের পুরাতন অথচ ঝকঝকে ‘নলীন চন্দ্র আ্যান্ড সন্স’-এ ঠাঁ-ঠাঁ দুপুরেও উপচে পড়ছে ভিড়। আরও এগোতেই চোখে পড়ল 'কে সি দাস এন্ড সন্স'-এর কঙ্কাল, ভয় পাবেন না, ‘কে সি দাস এন্ড সন্স’ বহাল তবিয়তেই রয়েছে; যে কঙ্কালের কথা বলছি তা রবীন্দ্র সরণির উপর প্রতিষ্ঠিত আদি 'কে সি দাস এন্ড সন্স', পরবর্তীকালে যেখান থেকে দোকানটি স্থানান্তরিত করা হয়।

এসব কিছু দেখছি আর আমার গন্তব্য কল্পনা করতে করতে ভাবছিলাম আর একটু এগোলেই বোধহয় দেখতে পাব দু'শো বছরের পুরোনো মাখনলাল অ্যান্ড সন্স-এ উপচে পড়ছে ভিড় আর আমি অর্ডার করছি বাহারি গালভরা সব সন্দেশ। এক স্থানীয় দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম ‘মাখনলাল আর কতদূর?’

বললেন, আপনি সামান্য এগিয়ে এসেছেন।

— আমি তো রাস্তার দু’ধার দেখতে দেখতেই হাঁটছিলাম, কই চোখে পড়ল না তো!

— রাস্তার উপরে নয় তো, বাজারের ভিতরে ঢুকতে হবে।

— ও আচ্ছা। ধন্যবাদ।

মার্বেলের মেঝেতে বিছানো মাদুরে সুরূপা সব সন্দেশ

ঢুকলাম ‘পুরোনো’ নতুনবাজারের ভিতর। গলির রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাঠ-পিতল-কাঁসা-আল্যুমিনিয়াম-লোহা ইত্যাদি সরঞ্জামের সারিবদ্ধ দোকান টপকে আমি পৌঁছালাম এক মিষ্টির দোকানে। নতুনবাজারের পুরোনো ‘হ্যাল’ তো ছিলই, সে দোকান দেখে মনে হল আমি দু'শো বছর আগের টাইমলাইনে পৌঁছে গিয়েছি। শো’কেস নয়, সে দোকানে মার্বেলের মেঝেতে বিছানো মাদুরে সুরূপা সব সন্দেশ গোছানো রয়েছে পেল্লায় সাইজের দু'চারটে কাঠ আর কাঁসার থালায়, ব্যাস। পাশেই কর্মচারীরা শশব্যস্ত ছানায় পাক দেওয়ায়। সবকিছুই চলছে আড়ম্বরহীনভাবে।

এসব দেখে শুনে মিষ্টি খাওয়ার কথা ভুলে প্রথমটায় খানিক থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। সম্বিত ফিরে পেয়ে সব জেনেশুনেই বলে ফেললাম ‘রসের মিষ্টি করেন না আপনারা?’

এক কর্মচারী উত্তর দিলেন- ‘না, শুধু কড়া আর নরম পাক’।

পারিজাত, চকোলেট, দিলখুশ, নতুন বাটার স্কচ, ব্ল্যাক কারেন্ট — কত কী বাহারি নাম তাদের। থালায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে পছন্দসই দু’টো সন্দেশ দিতে বললাম। দিলেন। তারপর … আহা..আ…হা….কী খাইলাম, জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না! দিন দাদা, আরো দু'টো চকলেট আর গোকুল সন্দেশ।

মাত্র তিন টাকার মিষ্টি কিন্তু এখনও মেলে

খেতে খেতেই হিসেবে বসা মালিকপক্ষের উদ্দেশ্যে বললাম, ‘দোকানটা তো পুরোনো হয়েছে, আপনারা কখনও আর পাঁচটা দোকানের মতো নতুন করে সাজানোর কথা ভাবেননি?’।

বললেন, ‘আমার প্রপিতামহর হাতে তৈরি এ দোকান, বদল যে কিছু হয়নি তা নয়, তবে যৎকিঞ্চিৎ। বাজারের ভিতরের অতকিছু করেই বা কী হবে? সাউথে, বালিগঞ্জ কালচারালের কাছে অবশ্য একটা সময়োপযোগী শাখা হয়েছে আমাদের’।

— এখানে বাজারের ভিতরে খরিদ্দার হয়?

— হ্যাঁ হয়। সুনামে হয়। তাছাড়া এতবছরের পুরোনো দোকানের পুরোনো খরিদ্দারও তো রয়েছেন প্রচুর।'

ওঁর কথার সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখের সন্দেশও শেষ হল। দাম মেটাতে গিয়ে তো আর এক বিস্ময়! যা দাম নিলেন তাতে এ কালে আপনার অস্বস্তি বোধ হওয়াটাই সমীচীন। ‘তিন’ টাকার মিষ্টি এখনও মেলে?

ফেরার পথে ‘মনোলগ’ ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল এই কাঙ্খিত প্রশ্ন আর তৎক্ষণাৎ মেমোর্যােন্ডাম-এ পুঙ্খানুপুঙ্খ লেপ্টে নিয়েছিলাম দু’শো বছরের ‘মাখনলাল এন্ড সন্স’-এর ঐতিহাসিক স্বাদ-গন্ধ-রূপ; এক্কেবারে ‘জেনুইন’।
 

Developed by DXDasia