
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২৯
গত কয়েকদিন সমুদ্র বড়ো উত্তাল ছিল। কালো থমথমে আকাশের প্রতিচ্ছবি জলের ওপরে আর যেন একটা চাপা আক্রোশে ফুলে ফুলে উঠছিল বিশাল ঢেউগুলি। জলের ঝাপটা উঠে আসছিল ডেকের ওপরে। কেবিনের খাটে শুয়ে আপনা-আপনি একবার ডানদিক আর একবার বাঁদিক পাশ ফিরছিলাম জাহাজের ডাইনে-বাঁয়ে হেলে পড়বার সঙ্গে সঙ্গে।
কাল রাত্রে আলমারির মাথা থেকে হঠাৎ লাইফ জ্যাকেটটা বিদঘুটে আওয়াজ করে মাটিতে পড়ায় বেজায় চমকে ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলাম। অন্ধকারে দেখি কেবিনের বসবার চেয়ারটা জাহাজের দোলার সাথে সাথে নিজে নিজে একবার খাটের কাছে এগিয়ে আসছে আবার দূরের দেওয়ালের দিকে ফিরে যাচ্ছে। বাইরের ডেকে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের আওয়াজ। এহেন পরিস্থিতিতে ক্লাস পড়ানো বেশ দুষ্কর হয়ে পড়ে। ছাত্ররা চেয়ারসুদ্ধু ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ পিছলে চলে যায় পাঁকাল মাছের মতো। পড়াতে পড়াতে কোনোরকমে দেওয়াল আর টেবিলের কোণ ধরে থেকে টাল সামলাই আরকি! এইরকম সময় জাহাজের রাঁধুনিদের বেশ অসুবিধা হয়, এত লোকের রান্না করতে। তবে জাহাজের রান্নার পাত্রগুলি স্টিলের আর সেগুলি দেয়ালের সাথে আটকানো। তলায় বিশাল গ্যাসের আঁচ আসছে। রান্না হয়ে গেলে ওই আটকানো পাত্রের নিচের ছিপি খুলে দিয়ে ভালো করে জল সাবান ঢেলে ধুয়ে ফেলা হয়। তখন রান্নার পাত্রগুলি বেসিনের রূপ ধরে। পরিষ্কার হয়ে গেলে নিচের ছিপি বন্ধ করে দিলেই আবার বেসিন থেকে কড়াই। তাই খারাপ আবহাওয়ায় যে গরম রান্নার পাত্র উল্টে পড়বে তেমন ভয় নেই। তবে কাপ, প্লেট, গ্লাস, চামচ তো আর দেওয়ালের সাথে সাঁটা নেই। তাই তারা ঢেউয়ের দোলায় ঝন্ঝন্ আওয়াজ তুলে মাটিতে গড়াগড়ি যায়। রাঁধুনিদের কাজ বাড়ে। ওরা এই সময়টা সাদা সাপ্টা রান্নায় সকলের স্বাস্থ্যরক্ষা করে। আমাদের পর্তুগিজ বেকার জুভি কিন্তু খারাপ আবহাওয়াতে ঘাবড়াবার পাত্র নয়। সে সর্বপ্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগকে উপেক্ষা করে আমাদের জন্য সাজিয়ে রাখে কেক, পেস্ট্রি, অ্যাপেল টার্নওভার, ম্যাকরুনস, চকলেট, চিপস, কুকি আরো কত কী! জুভি যতদিন জাহাজে রয়েছে ততদিন আমাদের কারো তন্বী শিখরদশনা হওয়ার সৌভাগ্য হবে বলে মনে হয় না!

ঝড়
এদিকে গত সপ্তাহ থেকে আমাদের জাহাজে আমাদের সাথে রয়েছেন ক্যাথলিক পাদ্রী ফাদার জিম। প্রতি সন্ধে সাড়ে সাতটায় উনি ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য প্রার্থনাসভার ব্যবস্থা করেন যেখানে সর্বধর্ম নির্বিশেষে সকলের আমন্ত্রণ থাকে। কিছু ছাত্র যারা সান জুয়ানে প্রচুর নেশা ভাঙ করে অকর্ম কুকর্ম করেছিল, তারা ফাদার জিমের কাছে সব কবুল করে পাপ মুক্ত হয় বলে শুনেছি।
এদিকে গত সপ্তাহ থেকে আমাদের জাহাজে আমাদের সাথে রয়েছেন ক্যাথলিক পাদ্রী ফাদার জিম। প্রতি সন্ধে সাড়ে সাতটায় উনি ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য প্রার্থনাসভার ব্যবস্থা করেন যেখানে সর্বধর্ম নির্বিশেষে সকলের আমন্ত্রণ থাকে।
কিছুদিন আগে খবর পেয়েছিলাম যে আমাদের এক প্রাক্তন ছাত্র ২৪ বছর বয়সী ইঞ্জিনিয়ার ক্রিস এরিকসন এক্সন মোবিলের একটা জাহাজে কাজ করতে করতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে। গত বছর ক্রিস আমাদের সাথে এই জাহাজে এসেছিল। আমরা যারা ওকে চিনতাম তারা স্বাভাবিকভাবেই এই খবরে খুব মুষড়ে পড়েছিলাম। আজ সন্ধেবেলা ফাদার জিম, ক্রিসের জন্য একটা স্মরণসভার আয়োজন করেছেন। আমাদের জাহাজে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ রয়েছে। ফাদার জিম চেয়েছিলেন যে এই স্মরণসভায় আমরা যেন ক্রিসের কথা ভেবে কিছু বলি।

ফাদার জিম
সন্ধে ঠিক আটটায় সব ছাত্র ও শিক্ষকেরা গিয়ে বসলো জাহাজের সেই ইস্পাতের বেলাভূমিতে। খোলা আকাশের নিচে একটা টেবিলে ফাদার কিছু মোমবাতি আর ধূপ জ্বালিয়েছেন। উনি প্রথমে ক্রিসকে স্মরণ করে কিছু কথা বললেন ওর সম্বন্ধে। জাহাজের ক্যাপ্টেন থমাস বুসি আর চিফ ইঞ্জিনিয়ার বিল লাফান-ও-মাইকের সামনে এসে ক্রিসের স্মৃতিচারণা করলেন। ২৪ বছরের তাজা একটি প্রাণকে হারিয়ে ফেলে সকলেই ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এরপর ফাদার জিমের অনুরোধে প্রফেসর জপ পোলিশ ভাষায় একটি প্রার্থনা করলেন। কিছু ছাত্র জুইশ ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করল। চিন উইন (Chinh Winh) বলে একটি ভিয়েতনামিজ ছেলে বৌদ্ধ শ্লোক উচ্চারণ করল। সকলে শান্ত হয়ে বসে রয়েছে খোলা ডেকে। মাথার ওপরে আকাশ আর চারিদিকে কেবল ঢেউয়ের শব্দ শোনা যায়। ফাদার জিমের অনুরোধে আমি গীতা থেকে কয়েকটি শ্লোক ও তার মানে ইংরেজিতে অনুবাদ করে ওদের শোনালাম।
যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন মৃত্যুর কদাকার রূপ দেখে অস্ত্র পরিত্যাগ করতে বদ্ধপরিকর। তখন সারথি কৃষ্ণ তাকে আত্মার চিরসত্যের কথা বর্ণনা করছেন।
“ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে॥”
আমি ওদের অনুবাদ করে বললাম, The soul is never born, so it cannot die. Birth is what exists now but did not exist before. Death is what does not exist now but did exist before. The soul does not have any of these two states as it exists forever. It does not decay with the body.
সন্ধে ঠিক আটটায় সব ছাত্র ও শিক্ষকেরা গিয়ে বসলো জাহাজের সেই ইস্পাতের বেলাভূমিতে। খোলা আকাশের নিচে একটা টেবিলে ফাদার কিছু মোমবাতি আর ধূপ জ্বালিয়েছেন। উনি প্রথমে ক্রিসকে স্মরণ করে কিছু কথা বললেন ওর সম্বন্ধে।
“বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহ্ণাতি নরোপরাণি৷
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা-ন্যন্যানি
সংযাতি নবানি দেহী৷৷”
The way we discard our old clothes and find new ones, the soul discards the old body and finds a new one.
“নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ॥”
No weapon can pierce this soul, no fire can burn it, no water can drown it and no air can dry it out. The invincible soul is omnipresent, unperturbed and sublime. Hence dear Arjuna, please be aware of the power of the soul and do not lament the death of the body.
তখন সমুদ্র শান্ত হয়ে এসেছে। চারিদিকে ধূপের গন্ধ, আকাশে গাঢ় অন্ধকার আর ঘন মেঘের ফাঁকে ঝকঝক করে জ্বলছে ভেনাস।
চলবে…
___________
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
