নীলাচলের মাছের কচুরি: বাঙালির উদ্ভাবনী শক্তি ও খাদ্যপ্রীতির মিশেলে জন্মানো এক পদ

বাগবাজারের নীলাচলে কচুরি আর মাছের যুগলবন্দী

বাঙালির পরিচয় মাছে-ভাতে। নদী, খাল, বিল, পুকুরের দেশ বঙ্গে, স্বাভাবিক নিয়মেই মাছ উঠে এসেছিল বঙ্গসন্তানদের পাতে। ল্যাজা থেকে মুড়ো মাছের কিছুই বাদ দেয় না বাঙালি। শাক থেকে ডাল, টক থেকে পাতুরি, সবেতেই মাছ মিলেমিশে একাকার। কিন্তু কচুরির পুরে মাছ? হ্যাঁ, তারও দেখা মেলে। কচুরি আর মাছের যুগলবন্দী ঘটেছে রসগোল্লা আর চপের পীঠস্থান বাগবাজারে। অধুনা বাগবাজারকে মাছের কচুরির আঁতুড়ঘর বলা যেতে পারে। বাগবাজার এলাকায় প্রায় চার-পাঁচটি দোকানে মাছের কচুরি পাওয়া যায়। কিন্তু মাছের কচুরির জন্ম ঠিক কোথায়? কীভাবেই বা এই পদটির জন্ম হল?

বাঙালির পাকঘর কোনও গবেষণাগারের চেয়ে কম কিছু নয়। সেখানে যে কত নিত্য নতুন রান্নার জন্ম হয়, তা গুনে শেষ করা যাবে না। মাছের কচুরিও বাঙালির সহজাত উদ্ভাবনী শক্তির ফসল। কোনও কোনও খাদ্যরসিক বাঙালি-বাড়িতে অনেক আগে এর প্রচলন শুরু হলেও বাণিজ্যিক ভাবে কলকাতায় বাগবাজার  নীলাচলের উদয় দাসের হাতে জন্ম হয়েছিল মাছের কচুরির (Fish Kachuri)। সালটা ছিল ১৯৮২, অর্থাৎ চার দশক পেরিয়ে এসেছে খাবারটি। এখনও নীলাচলের ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা রয়েছে, রয়েছে রেস্তোরাঁও। উদয় দাসের পুত্র, বর্তমানে নীলাচল যিনি সামলাচ্ছেন সঞ্জয় দাস জানালেন মাছের কচুরির জন্ম কথা। তাঁর কথায়, “১৯৮২ সালে বাবা প্রথম এই আইটেমটা বানান। ক্যাটারিংয়ের ব্যবসায়। বাবারই প্রথম কনসেপ্ট ছিল। মাছের চপ ভেঙে ময়দার মধ্যে পুর ভরে উনিই প্রথম মাছের কচুরি বানান।” সঞ্জয়বাবু জানালেন, তাঁর বাবা এখনও মাঝে মধ্যে দোকানে আসেন। ঘণ্টাখানেক বসেন। 

মাছের পুর প্রসঙ্গে জানলাম, ওঁরা পুরের জন্য ভেটকি মাছ ব্যবহার করেন। সঞ্জয়বাবু বলছিলেন, আগে রুই, কাতলা, চিংড়ি মাছ মিশিয়ে পুর করা হত। কিন্তু চিংড়ি মাছে অনেকের অ্যালার্জি হয়, তাই এখন ভেটকি মাছ ব্যবহার করা হয়। স্বাদ ভাল হয়।

ক্যাটারিংয়ে জন্ম তো হল কিন্তু সেটা ক্যাটারিংয়ের মেনু থেকে আম বাঙালির মধ্যে পৌঁছলো কীভাবে? সেই গল্প শুনছিলাম সঞ্জয়বাবুর কাছে, বললেন “১৯৯০ সালে আমরা ব্যবসা শুরু করি (রেস্তোরাঁ)। তখন থেকেই এটা শুরু হয়েছে। বছর তিন-চারেক চলার পর আইটেমটা বন্ধ রাখা হয়েছিল। তখন এত ভিড় হয়ে যেত, তাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অনেকদিন বন্ধ থাকার পর ১৯৯৮ সালে এখানে (বাগবাজার বাটা বাস স্টপেজের কাছেই, মিনিট তিনেকের হাঁটা পথ) যখন দোকান শিফট করল, তখন এখানেও কিছুদিন করে আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। লকডাউনের পরে কাস্টমারদের চাহিদায় আবার চালু করা হয়েছে।” 

মাছ-কচুরি নিয়ে ইন্টারনেটে কয়েক হাজার কনটেন্ট পাওয়া যায়। অধিকাংশই নীলাচলের ভিডিও। ফুড ভ্লগিং প্রসঙ্গে সঞ্জয়বাবুর মত হাল আমলে খাবারের ব্যবসাকে গতি দিয়েছে ফুড ভ্লগাররা। তিনি বললেন, “ব্যবসার জন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে, টাকা পয়সা খরচ করে যেটা হয় না, ফুড ভ্লগাররা সেটা করছেন। তাঁরা আসছেন, খাচ্ছেন। তারপর ভালো লাগলে ভিডিও করে নিয়ে যাচ্ছেন। আগে কেউ ভিডিও করেন না। খেয়ে সন্তুষ্ট হচ্ছেন, তবেই না ভ্লগ করছেন। এখন প্রতিদিনই মোটামুটি কেউ না কেউ আসছেন।” 

অনেকেই দাবি করেন মাছের কচুরি তাঁদের সৃষ্টি। এ প্রসঙ্গে সঞ্জয়বাবু বললেন, “আমরাই প্রথম এই কনসেপ্টটা নিয়ে এসেছি। তারপর একটা জিনিস চালু করলে যা হয়। যাঁদের রান্না সম্পর্কে জ্ঞান আছে, তাঁরা খাওয়ার পরেই বুঝে যায় কী কী দেওয়া আছে, কীভাবে তৈরি হয়েছে। আমাদের কচুরির ভিতরে আছে মাছের স্টাফিং। যাঁরা রান্না জানেন তাঁরা ধারণা করে নেন।”

এবার খাবার সম্পর্কে বলি। খেয়ে যা মনে হল। স্বাদে মাছের কচুরি দিব্য। পুরে ঠাসা। মাছ যাঁরা ভালবাসেন, তাঁদের ভাল লাগতে বাধ্য। মাছের আঁশটে গন্ধ নেই। অর্থাৎ মাছ শুনলেই যাঁরা ভ্রু কুঁচকান, তাঁদেরও খারাপ লাগবে না। পুরে একটা হালকা মিষ্টিত্ব রয়েছে। কচুরির সঙ্গে একটা আলুর তরকারি পরিবেশন করা হয়। খেয়ে বুঝলাম, সেটি বেশ সহজপাচ্য ও লঘুপাক রান্না। মশলা বাহুল্য বর্জিত, সব্বাই খেতে পারবেন। সঙ্গে দেওয়া হয় স্যালাদ। 

মাছের পুর প্রসঙ্গে জানলাম, ওঁরা পুরের জন্য ভেটকি মাছ ব্যবহার করেন। সঞ্জয়বাবু বলছিলেন, আগে রুই, কাতলা, চিংড়ি মাছ মিশিয়ে পুর করা হত। কিন্তু চিংড়ি মাছে অনেকের অ্যালার্জি হয়, তাই এখন ভেটকি মাছ ব্যবহার করা হয়। স্বাদ ভাল হয়। মাছের কচুরি দাম চল্লিশ টাকা প্রতি প্লেট, প্লেটে দুটি করে কচুরি দেওয়া হয়। একেবারে প্রথম নব্বই সালে দাম ছিল তিন টাকা, তারপর ধাপে ধাপে কুড়ি, ত্রিশ হয়ে এখন চল্লিশ টাকা, এমনটাই জানালেন সঞ্জয়বাবু। 

সন্ধ্যায় দোকানে দাঁড়িয়ে দেখলাম। মাছের কচুরির চাহিদা বিস্তর। দোকানে আসা প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দু থেকে তিনজন মাছের কচুরির সন্ধান করছেন। নীলাচলে অন্যান্য অনেক পদই তৈরি হয়, সেগুলোও মানুষজন খাচ্ছেন, নিচ্ছেন। দেখলাম অফিস ফেরত তিনজনকে, তাঁরা এসেই অর্ডার দিলেন, “তিন প্লেট ফিস কচুরি দেবেন।” আরেকজন প্রবীণকে দেখলাম সঞ্জয়বাবুকে বলছেন, “লেকটাউন থেকে আসছি। কত বছর আপনাদের এখান থেকে নিই।” বুঝলাম খাবারের মান ভাল না হলে এ জিনিস হয় না। 

একটি যুগলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁরা কলেজ পড়ুয়া, বাঁশদ্রোণীর বাসিন্দা। তাঁরা জানালেন, “ফেসবুকে ভিডিও দেখে এখানে এসেছি মাছের কচুরি খেতে।” বাগবাজার গিরিশভবনের কাছে, নীলাচল নামেই আরও একটি দোকান রয়েছে সঞ্জয়বাবুদের। কয়েক বছর হল দোকানটি হয়েছে। সেখানেও মাছের কচুরি পাওয়া যায়। সে দোকানেও গিয়েছি কিন্তু তেমন ভিড় চোখে পড়েনি। কিন্তু পুরোনো দোকানটিতে উপচে পড়ছে ভিড়। 

মাছের কচুরির চাহিদা প্রসঙ্গে সঞ্জয়বাবু জানালেন, “চাহিদা প্রচুর প্রতিদিন দু-তিনশো প্লেট মাছের কচুরি বিক্রি হয়। শনি, রবিবার প্রচুর বিক্রি হয়। আটটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ছুটির দিনে পাঁচ-ছশো প্লেট কচুরি বিক্রি হয়।”

কচুরি বেশ সমাদৃত একটি খাবার। ডাল, ছাতু, হিং ইত্যাদির পুর সমেত কচুরি খেয়েই আমরা অভ্যস্ত। তাতে বাঙালির প্রিয় মাছের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে বাগবাজার। এখন মাছের কচুরি বললেই বাগবাজারের কথা মনে পড়ে। প্রকৃত অর্থেই এটি ফিউশন ফুড। উদ্ভাবনী শক্তি, খাদ্যপ্রীতির মিশেলে এটির জন্ম, আর নতুনত্ব পদ হওয়ায়, রসনাতৃপ্তি ও ব্যবসায়িক লাভ দুই'ই হচ্ছে। বাঙালির খাবার প্রেম অক্ষত থাক। নিত্যনতুন পদ বানিয়ে লক্ষ্মীলাভ হোক। 

_______________________________
তথ্যসূত্র:
ক্ষেত্র সমীক্ষা

Developed by DXDasia