জুলিয়াস, মার্শাল, সরিতাদের সরস্বতী পুজো
জুলিয়াস হাঁসদা, মার্শাল হাঁসদা, সরিতা সোরেন, সুমিত সোরেন, শ্যামল সোরেন, অলিভা টুডু, সুনীতা সোরেন, মুকেশ সোরেন, প্রীতম রাজোয়ার, অনিতা হেমব্রম – সকলে ভালোবাসে একজোট হয়ে নিজেদের ইস্কুলে করছে সরস্বতী পুজো। অলিভা ফল কাটছে, মার্শাল আলপনা দিচ্ছে, মূর্তিতে রং চাপাচ্ছে জুলিয়াস, তাকে সহযোগিতা করছে আরও অনেকে। ক্লাস সেভেন-এইটের বাচ্চা এরা। ইস্কুলের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী আদিবাসী ক্রিশ্চান। জাত-বর্ণ-লিঙ্গের ঊর্দ্ধে মানবতার জয়গান গাইছে আগামী প্রজন্ম। সমস্ত রকম ভাবে তাদের সহযোগিতা করছেন গাছের ইস্কুল-এর শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী অংশুমান ঠাকুর, বিপ্লব মণ্ডল-সহ অন্যান্যরা।

গাছের ইস্কুলে সরস্বতী পুজো
দুই বছর আগে গাছের ইস্কুলের সরস্বতী পুজো-য় পৌরহিত্য করেছিল স্কুলেরই ছাত্রী ডলি। ডলি ব্রাহ্মণ নয়, এমনকি আচার বিষয়েও পটু নয়, কিন্তু উদ্যোগী। ডলির ভয় ছিল ও পারবে কিনা। ডলি পেরেছে। এই ইস্কুলে যৌথতার আনন্দ এবং আন্তরিক ভক্তিই একমাত্র সম্বল৷
মুর্শিদাবাদ-এর ফরাক্কার অধ্যাপক অংশুমান ঠাকুরের চিন্তাভাবনায় ২০২১ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হয়েছে ‘গাছের ইস্কুল’ (Gacher School)। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা থানার অন্তর্গত বাগদাবড়া অঞ্চলের শামলাপুর গ্রাম-এ মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে চালু হয়েছিল গাছের তলায় গাছের ইস্কুল (গাছ গ্রিন হ্যান্ডস সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট-এর অন্তর্ভুক্ত)। আর্থিক সমস্যার কারণে যারা বইমুখী নয়, ইস্কুলে যাওয়া যাদের আর হয়ে ওঠে না, সেই সমস্ত আদিবাসী শিশুদের নিয়েই এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন অংশুমান। প্রকৃতির মাঝে পড়াশোনা। তাই তাদের সিলেবাসে যেমন বাংলা ছড়া আছে, নামতা আছে, তেমনই আছে গাছেদের পরিচর্যার কথাও। আছে সর্বধর্ম সমন্বয়ের পাঠ। তাই দুর্গাপুজোয় যেমন জুলিয়াস অংশগ্রহণ করে, পুষ্পাঞ্জলি দেয়, তেমন ঘটা করে বড়োদিন পালন করে জুলিয়াসের অন্য বন্ধুরা। লোক দেখানো নয়, একে অপরের উৎসবে পাশে থাকা ওদের অধিকার। সেই অধিকারে প্রকট হয়ে থাকে ভালোবাসার কথা। অংশুমান, বিপ্লব গত তিনবছর ধরে এই সৌভ্রাতৃত্ববোধের পাঠই দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

দুই বছর আগে পৌরহিত্য করেছিলেন স্কুলেরই শিক্ষিকা ডলি
সামনেই সরস্বতী পুজো। বসন্তের এই আবাহনে গাছের ইস্কুলের চারপাশ ঘিরে থাকা গাছেও কোকিলের কুহুতান। অংশুমান বলেন, “অনেকেই মনে করেন এসব আসলে লোক দেখানো। আদতে তা নয়। স্কুলে ঘটা করে সরস্বতী পুজো করতেই হবে এমন কোনো বিষয় নেই। কিন্তু আমার ছাত্ররাই উৎসাহ দিত। ওদের খুব ইচ্ছা সরস্বতী পুজো দেখবে।” ইস্কুলের অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতবছর মাটির মূর্তিতেই সরস্বতী পুজো হয়েছে। তাতে কোনো সাজ ছিল না, চোখ আঁকাও ছিল না। যেকোনো উৎসবের বহিরাঙ্গের চেয়েও অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝা খুব জরুরি, সেটাই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে গেঁথে দিতে চান অংশুমান ও তাঁর সাথীরা।

ইস্কুলের মাঠে ভোগ বিতরণ
যাদের পুজো, দেবী হবে তাদের মতোই। সব রং তাই প্রকৃতি থেকে নেওয়া৷ গাছের ইস্কুল জুড়ে এখন সাজোসাজো রব। রাত পোহালেই বাগদেবীর আরাধনা। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইস্কুলের মাঠ এখন বদলেছে। সময়ের ডালপালা মেলে গছের ইস্কুল বড়ো হয়েছে। আদিবাসী বাচ্চারা একেবারে নিজের মতো করে, স্বাধীনভাবে পড়াশোনা করছে, বড়ো হয়ে উঠছে। চাটাই বা মাটির পুতুল বানানো – স্কুলে পড়তে পড়তেই কেউ কেউ হাতের কাজ শিখছে। বাচ্চাদের অভিভাবকরাও অংশগ্রহণ করছেন তাতে।

নিজেদের হাতে সরস্বতীর সাজ, সব রং প্রকৃতি থেকে নেওয়া
দুই বছর আগে গাছের ইস্কুলের সরস্বতী পুজো-য় পৌরহিত্য করেছিলেন স্কুলেরই শিক্ষিকা ডলি। ডলি ব্রাহ্মণ নন, এমনকি আচার বিষয়েও পটু নন, কিন্তু উদ্যোগী। ডলির ভয় ছিল পারবেন কিনা। ডলি পেরেছেন। এই ইস্কুলে যৌথতার আনন্দ এবং আন্তরিক ভক্তিই একমাত্র সম্বল৷

গাছের ইস্কুলে বড়োদিন পালন