প্রকৃতির সঙ্গে জীবন ছুঁয়ে যায় নিভৃত পূর্ণিমা নাট্যগ্রামে

শুধু গ্রাম-নগর নয়, অরণ্যের গভীরেও প্রবেশ করতে চাইছে থিয়েটার

বোলপুর অথবা প্রান্তিক, যে স্টেশনেই নামবেন একটা টোটো ধরে আপনাকে পৌঁছে যেতে হবে বল্লভপুর গ্রামে। সোনাঝুরি গাছের অলৌকিক মায়া আর খোয়াইয়ের কোপাই নদীর সংলগ্ন সবুজ, চন্দ্ররসে টলমল প্রকৃতির মধ্যে গড়ে উঠেছে ‘নিভৃত পূর্ণিমা নাট্যগ্রাম’। নিসর্গের কোলে এমন প্রাকৃতিক নাট্য অঙ্গন ২০১৫ সালে গঠন করেছে ‘আমরা সবুজ’ নাট্যদল। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা পূর্ণিমা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে অকাল প্রয়াণে তাঁর স্মৃতিকে রক্ষা করার মধ্যে দিয়েই গড়ে ওঠে এই নাট্যগ্রাম। ‘নিভৃত’ আর ‘পূর্ণিমা’ যেন শুধু মানুষের আবেগ নয়, প্রকৃতির উচ্ছল অবস্থার ভাবনাও শিল্পের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। নাট্যদলের বর্তমান নির্দেশক জুলফিকার জিন্না স্বপ্ন দেখছেন থিয়েটারের মধ্যে দিয়ে প্রান্তিক ও নাগরিক সমাজ কীভাবে একবিন্দুতে এসে মিলে যেতে পারে। ভাবনার আদান প্রদান হবে, ভাষার বিনিময় হবে, মাদল আর মাউথঅর্গানের মেলবন্ধনে মুখরিত হবে মানব-প্রকৃতি।

পূর্ণিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর এই নাট্য স্পেসের শুভযাত্রা শুরু হয়। ওঁর স্মৃতিতে নিবেদিত ‘কোজাগর সম্মাননা’ স্মারক প্রদান শুরু হয় সেই বছর থেকেই। বাংলার গুরুত্বপূর্ণ নাট্যব্যক্তিত্বরা এই সম্মান পরবর্তীকালে গ্রহণ করেন। প্রবীর গুহ, ঊষা গাঙ্গুলি যাঁদের মধ্যে অন্যতম।

নিভৃত পূর্ণিমা : প্রবেশ পথ

থিয়েটারের এখন মূল লক্ষ্য কী? শুধুই কি থিয়েটারের ভাষাকে বিনোদনের বর্ণপরিচয় দিয়ে সেরে ফেলবো? তা নয় কিন্তু। থিয়েটারের ভাষা প্রসারিত হতে হবে। গ্রাম-নগর শুধু নয়, অলিগলি, নদীর পাড় কিংবা অরণ্যের মধ্যেও প্রবেশ করতে চাইছে থিয়েটার। পারছে কি? সে উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে, কিন্তু চেষ্টা করছে বলেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৬৫টি নাট্যদল এই গ্রামে অভিনয় করে গেছে। শুধু কি প্রকৃতির টানেই? নাকি এর পিছনে অন্য কারণ আছে? আছে অবশ্যই। এই থিয়েটারের স্পেস শেখায় প্রকৃতির সঙ্গে জীবনকে ছুঁয়ে দেখার ভাষাটা কত সজীব। নাট্যগ্রামে থিয়েটারের মধ্যে আরও অক্সিজেন পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। আর সেই সঙ্গে অঙ্গন থিয়েটার তৈরি করার সুযোগ। পুরো স্পেসটি বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ দুইভাবেই সেজে উঠেছে। আছে গাছকে কেন্দ্র করে মুক্তমঞ্চ। বাইরের এই মঞ্চ জুড়ে আছে বিভিন্ন গাছ, যারা এক একটি চরিত্রের ভূমিকায় যেকোনও মুহূর্তে অবতীর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে নাট্যগ্রামের পিছন দিকে গাছের সারির মধ্যে তৈরি হয়েছে ইকো-থিয়েটার কর্মশালা। চার দশক ধরে নাট্যচর্চার মধ্যে থেকে জুলফিকার জিন্না তাঁর নিজস্ব নাট্যচিন্তাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য গ্রামটিকে পূর্ণ ব্যবহার করার প্রয়াস রেখেছেন। অভিনয়-স্পেসের বহুমাত্রিক ব্যবহারের উপযোগী পরিকাঠামোর সম্প্রসারণই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

বল্লভপুর সাঁওতাল পল্লির ভিতরে এই নাট্যক্ষেত্র। নাট্যগ্রামের মাঝখানে এক বট আর তালগাছ একে অন্যকে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর তারই তলদেশ বাঁধিয়ে তৈরি হয়েছে মঞ্চ। একটু দূরে আরেক গোল আটচালা ঘিরেও মানুষজন বসার জায়গা। রয়েছে ছোট্ট একটা পুকুর, যার পাড় জুড়ে আপন মনে ফুটে আছে লাল কমলা হলুদ কলাবতী ফুলের দল। ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা খেজুর, তাল, বটগাছের তলদেশও অতি যত্নে গোবর নিকানো মাটির বেদী। সমস্ত চত্বরটা গোবর দিয়ে পরিপাটি করে নিকানো।

মূল মঞ্চ

‘নিভৃত পূর্ণিমা নাট্যগ্রাম’ যেহেতু কবিগুরুর স্বপ্নের পল্লি ও শিক্ষা প্রকল্পের অঞ্চলে তৈরি, তাই রবীন্দ্রনাথের থিয়েটার ভাবনা সঞ্জাত নাট্যচিন্তাকে আরও প্রসারিত করার চেষ্টা থেকেও এই নাট্যক্ষেত্রটির জন্ম।  ১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতনে ‘শারদোৎসব’ নাটকের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে রবি ঠাকুর যে মুক্তাঙ্গনের নাট্যভাবনার সূচনা করেছিলেন, তাকেই আরও বেশি করে মানুষের সঙ্গে সংলাপ ও ভাব তৈরি করার জন্য নাট্যগ্রামের সূচনা। বিশ্বভারতীর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রাক্তন আশ্রমিকদের সঙ্গে রয়েছে নাট্যগ্রামের নিবিড় যোগাযোগ। নাট্যগ্রামের গা-ছুঁয়ে বয়ে চলেছে কোপাই নদী। ‘কোপাই’ একটি অনার্য শব্দ। অজয়ের ছোট্ট উপনদীটি বিনুরিয়া থেকে বক্রেশ্বর নদীর প্রান্ত ছোঁয়ার আগে কোপাই নামে পরিচিত হয়েছে। কবিগুরু লিখেছেন,

“এখানে আমার প্রতিবেশিনী কোপাই-নদী
প্রাচীন গোত্রের গরিমা নেই তার।
অনার্য তার নামখানি
কত কালের সাঁওতাল নারীর হাস্যমুখর
কলভাষার সঙ্গে জড়িত।
গ্রামের সঙ্গে তার গলাগলি,
স্থলের সঙ্গে জলের নেই বিরোধ।
তার এ পারের সঙ্গে ও পারের কথা চলে সহজে।”

আমাদের নাট্যগ্রামটি এই কোপাইয়ের তীরে অবস্থিত। নাট্যগ্রামের পাশেই ঐতিহ্যবাহী ‘আমার কুটির। রবি ঠাকুরের সমবায়চেতনায় লালিত এই কুটির হস্তশিল্পের একটি প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান। নাট্যগ্রাম থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে রয়েছে সুরুল জমিদারবাড়ি, আর রয়েছে রায়পুরের রাজবাড়ি। নাট্যগ্রামকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক ভূগোল গড়ে তুলতে এই সমস্ত ঐতিহ্যপূর্ণ প্রাসাদগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে এবং অবশ্যই তা নাট্যশিল্পে প্রভাব বিস্তার করে।

নিভৃত পূর্ণিমা নাট্যগ্রাম

জুলফিকার জিন্না বলছেন, “বহিরঙ্গন নাট্যচর্চার বিকল্প পরিকাঠামো হিসেবে এই নাট্যগ্রামে রয়েছে একটি গোলবাড়ি- ‘আনন্দ আখড়া’। এছাড়া রয়েছে বট-তালের যুগল জীবন্ত স্থাপত্যের নিচে মাটির বেদি ‘নাট্যমণ্ডপ’। ‘ধরিত্রী’ নামের একটি অ্যম্ফিথিয়েটার স্পেস নির্মীয়মাণ অবস্থায় রয়েছে।”

এছাড়াও এখানে রয়েছে ‘মায়াজোনাকি’। গ্রামবাংলার ঘরোয়া খাবারের ক্যাফেটেরিয়া। নাট্যগ্রামে রাত্রিযাপনের সুব্যবস্থাও আছে। ‘চিলেকোঠা’ নামে সুন্দর মাটির বাড়ির কাঠের বারান্দায় নাট্যকর্মীদের আড্ডায় সর্বদাই জমজমাট এই প্রাঙ্গণ। রাত্রিযাপনের জন্য প্রতিটি ঘরে ৪ থেকে ৫ জন থাকার বন্দোবস্ত। সর্বমোট ২০ জন থাকা যায়। নাট্যদলগুলির পছন্দের উপর খাবারের খরচ নির্ভর করে। ইন্টিমেট বা স্পেস থিয়েটারের জন্য মাইক ব্যবহার হয় না। সেমিনারের জন্য মাইক্রোফোন ও স্পিকারের ব্যবস্থা আছে। থিয়েটার ছাড়াও ফটোগ্রাফি ও চিত্রশিল্পের প্রদর্শনী, বই প্রকাশ অনুষ্ঠান, সেমিনার, চলচ্চিত্রের শুটিং, সাহিত্যসভা ও যে কোনো কর্মশালার জন্যও এই স্পেস ব্যবহার করা হয়।

বিশ্বভারতীর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রাক্তন আশ্রমিকদের সঙ্গে রয়েছে নাট্যগ্রামের নিবিড় যোগাযোগ। নাট্যগ্রামের গা-ছুঁয়ে বয়ে চলেছে কোপাই নদী।

‘নিভৃত পূর্ণিমা নাট্যগ্রাম’-এ দর্শকের বড়ো অংশ আসেন বল্লভপুরডাঙা আদিবাসী গ্রাম থেকে। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের জন্য এতে শিক্ষার প্রসারের পথ খুলে যায়। এই নাট্যগ্রামের উল্টো দিকেই রয়েছে সিনিয়ার সিটিজেন্স রেসিডেন্সি ‘ভালোবাসা’। ভালোবাসার আশ্রমের আবাসিকরাও নাট্যগ্রামের নিয়মিত দর্শক। বিশ্বভারতীর সংগীতভবন ও নাট্যকলাবিভাগের শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন নাটক দেখার জন্য। এছাড়াও শান্তিনিকেতনের সাতটি নাট্যদল ও বোলপুরের আটটি নাট্যদলের প্রতিনিধিরা দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকেন। মোট দেড়শো জন দর্শক অনায়াসে নাটক দেখতে পারে। দর্শকদের কোনো প্রবেশমূল্য রাখেনি নাট্যগ্রাম। দর্শক-আসনের প্রচলিত ধারণাকে এখানে লালন করা হয় না। কখনও দর্শকেরা গাছতলার বেদিমূলে বসেন, কখনও বা আনন্দ আখড়ার পার্শ্বপ্রাচীরে বসেন, কখনও দর্শকেরা থাকেন ভ্রাম্যমাণ, অর্থাৎ ঘুরে ফিরে নাটক দেখেন। থিয়েটারচর্চার বহুমাত্রিক পরীক্ষার উপর দর্শক-অ্যারেঞ্জমেন্ট ও অপটিক্যাল ডাইমেনশন বিভিন্নভাবে থিয়েটারের মাত্রা তৈরি করতে করতে এগিয়ে চলে।

নাট্যকর্মীরা গ্রাম ঘুরে দেখছেন

মতাদর্শগত ভাবে ‘আমরা সবুজ’ নাট্যদল কোনো রাষ্ট্রীয় আর্থিক আনুকূল্য গ্রহণ করে না। তাই যে সমস্ত নাট্যকর্মী নাট্যদলের সর্বসময়ের কর্মী এবং নাট্যগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোত যুক্ত, তারা জীবিকার প্রশ্নে কঠিনতম জীবনসংগ্রামে লড়াই করছে। জুলফিকারবাবু বলছেন, “এই নাট্যগ্রামের আবাস ও ক্যান্টিন থেকে অর্জিত অর্থ, সবজি ও নার্সারি থেকে অর্জিত আয়, শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে রবীন্দ্রস্পর্শধন্য ভবনগুলিকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক পর্যটনের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করলে কিছুটা আর্থিক সুরাহা হবে। ইতিমধ্যেই তার আভাস মিলেছে।”

সারা বিশ্বের নাট্যচর্চার বহুবিধ ধারা নিয়ে চর্চা করার স্কুল, তার সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহ এবং যথাযথ একটি আর্কাইভ গড়ে তোলার কাজ চলছে। নাট্যচেতনার তাত্ত্বিক ও ভাষিক সমৃদ্ধির জন্য একটি গ্রন্থাগার গঠনের কাজ চলছে। থিয়েটার গবেষকদের জন্য এই নাট্যগ্রামকে আরও নানামাত্রায় অপরিহার্য করার জন্য ‘আমরা সবুজ’ দলের কর্মীরা নিরন্তর চেষ্টা করে চলেছেন। ‘নিভৃত পূর্ণিমা নাট্যগ্রাম’ দেশজ সংস্কৃতির যে রূপ নির্মাণ করার চেষ্টা করছে, সেই প্রচেষ্টা একদিন বিশ্বের কাছে ‘নতুন’ বঙ্গ থিয়েটারকে নিয়ে যাবে।

Developed by DXDasia