
সাধারণ মানুষের শরণাপন্ন হয়েছেন আয়োজক
বছর ঘুরতে চলল। ৩৭৭ ধারা বাতিল গণ্য হওয়ার মাধ্যমে সমকামিতা বৈধ হয়েছে। যদিও গলার কাঁটার মতো এখনও আটকে রয়েছে ট্রান্সজেন্ডার বিল। কিন্তু এইসব আইনি কচকচানির অনেক ঊর্ধ্বে যেকোনোরকম সামাজিক স্বীকৃতি। অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই, আমাদের এই চূড়ান্ত মধ্যবিত্ত সমাজ আজও মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করার মতো সামাজিকভাবে শিক্ষিত হওয়ার পর্যায়ে আসেনি। আজও মানুষের পরিচয় তার শিক্ষা যোগ্যতার বিচারে নয়, তার যৌনতার বিচারে হয়। জন্মের পর থেকে একটি শিশুকে শেখানো হয় সে ছেলে না মেয়ে, তার নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীর মধ্যে দিয়ে তাকে আলাদা করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এই অবস্থায় সমাজে একজন ‘প্রান্তিক’ যৌনতার মানুষের যে কী হয় তা খুব সহজেই বোঝা যায়। পরিবার কোনো অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয়। তাই সমাজ কী বলবে- এই চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত হতে থাকা সেই পরিবারের চাপ একজন সমকামী বা রূপান্তরকামী মানুষের উপর কী বিষম যন্ত্রণাদায়ক তার নমুনা অগুণতি।
আরও পড়ুন
বঙ্গদর্শন পুজোসংখ্যা, ১৪২৬
আইন পাশ হওয়ার পরেও সমাজের চারিদিকে এই মানুষগুলোর ওপর লাগাতার অত্যাচার থামার কোনো নাম নেই। এই রাজ্যেই শুধুমাত্র রূপান্তরকামী হওয়ার জন্য মব লিঞ্চিং- এ একজনের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। ভাববার বিষয় যারা পাথর ছুঁড়েছে, তাদের মধ্যে বারো বছরের একটি শিশুর নাম পাওয়া গেছে। যে বয়সে খেলার বল হাতে থাকার কথা, সেখানে একজন পাথর তুলে নিচ্ছে খুন করার জন্য। খুব বেশি দিনের ঘটনা না, কলকাতা থেকে অনতিদূরে জগদ্দলে একজন ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্ট গৌতমকে তার পরিবার অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে শুধুমাত্র একটাই কারণে, সে মেয়ে হয়ে জন্মানোর পরেও পুরুষের মতো পোশাক পরে কেন! এই অত্যাচারের ঘটনা কোনো নতুন বিষয় না। দিনের পর দিন ঘটে চলেছে এমন ঘটনা। এর একমাত্র কারণ কুশিক্ষা, যার থেকে জন্ম নেয় এই ট্রান্সজেন্ডারফোবিয়া বা হোমোফোবিয়া।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রকৃত যৌন শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে উদাসীন। আজও আমরা লিঙ্গকে পুরুষ ও নারীতে বিভক্ত করি। সমাজের একটা বড়ো অংশ এখনও জানেনই না ‘হিজড়ে’ কী? কাকে বলে হিজড়ে? তাই প্রতি মুহূর্তে একজন সমকামী বা রূপান্তরকামীকে ‘হিজড়া’ বা ‘ছক্কা’ বলে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন
“আমার লড়াইটা কিছু কমেনি, বরং আরও বেড়েছে”
শুভজিৎ নস্কর, পেশায় একজন আলোকচিত্রী। আলোকচিত্রী হিসেবে তিনি যখন কুয়্যার সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন উপলব্ধি করেন বিষয়টিকে শুধুমাত্র আলোকচিত্র বা ভিস্যুয়াল আর্টের গণ্ডিতে আটকে রাখার মতো বিষয় না। ছবির পাশাপাশি পাবলিক পারফর্মিং আর্টের খুব প্রয়োজন। অন্তত মানুষের মনের অন্ধকার অজ্ঞানতা কনফিউশন দূর করতে। আর তা শুরু করতে হবে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে। সেই লক্ষ্য নিয়েই গবেষণামূলকভাবে শুভজিৎ গতবছর থেকে শুরু করেন একটি উদ্যোগ।

শুভজিৎ আমাদের জানান, “কাজের সূত্রে খেয়াল করেছি নাচ-গান-অভিনয় এইসব ক্ষেত্রে কুয়্যার কমিউনিটির মানুষজনের বহু গুণ থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্তভাবে উপেক্ষিত হয়। এই সবকিছু মাথায় রেখে গত বছর চাম্পাহাটি বইমেলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বইমেলাতেই একদিন এক ঘণ্টার স্লট পাই। যেখানে শুধুমাত্র এলজিবিটিকিউ মানুষজন নিজেদের শিল্পের প্রদর্শন করে মঞ্চে। বহু লড়াইয়ের পর তা সফল হয়। গ্রামের বহু বহু মানুষ দল বেঁধে আসেন, অনুষ্ঠান দেখেন, শেষে রূপান্তরকামীদের সম্পর্কে প্রশ্ন করেন, বহু মানুষজন আগ্রহ দেখান বিভিন্ন বিষয়ে জানার জন্য। আমরা এটাকেও একটা লড়াই হিসাবেই দেখছি।”

চাম্পাহাটি বইমেলায় এই অনুষ্ঠানের সাফল্য আসার পর সামগ্রিক বিষয়টা নিয়ে পুরোদমে ভাবতে শুরু করেন শুভজিৎ। ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রামে এই ধরনের সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান মানুষের মনের অন্ধকার একটু হলেও দূর করতে পারবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এই বছর ডিসেম্বরে চাম্পাহাটি বইমেলার তরফ থেকে আবার ডাক পেয়েছেন তাঁরা। এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায় সংক্রান্ত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ মঞ্চস্থ করতে চলেছেন তাঁরা। এই নৃত্যনাট্যে অংশগ্রহণ করবেন শুধুমাত্র কুয়্যায় সমাজের লোকজন। শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বিভিন্ন গ্রাম ও মফস্সলে যৌনতা সংক্রান্ত কর্মশালা আয়োজন করারও চিন্তাভাবনা করছেন তাঁরা। শুভজিৎ বলেন, “সমস্যা হল এই অনুষ্ঠানের জন্য স্বল্প হলেও খানিক অর্থ সাহায্যের প্রয়োজন। এই মুহুর্তে আমার হাতে কোনো কর্পোরেট ফান্ডের ব্যবস্থা নেই। আগামী দিনেও পাবো তার আশা রাখি না। তাই সহৃদয় মানুষজন যদি এগিয়ে এসে ক্রাউড ফান্ডিং হিসেবে সাহায্য করেন খুব উপকৃত হব। যেহেতু অনুষ্ঠানগুলি হচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রামে, তাই আয়োজকদের পক্ষেও প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।” আগামী মাসে বইমেলাতে যে নৃত্যনাট্য আয়োজন করতে চলেছেন, তাতেও শিল্পীদের প্রয়োজনীয় যা খরচ তা আয়োজকেরা দিতে পারবেন না, তাঁরা তাঁদের সাধ্যমতো কিছু টাকা দেবেন। বাকি ঘাটতি পূরণের জন্য শুভজিৎ মানুষের শরণাপন্ন হয়েছেন। শুভজিৎ নস্করের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর- ৯৮০৪৭ ৫৯০৪৮।
