বাঁ দিক দিয়ে বয়ে আসা রঙ্গিতের চেয়ে নজর কেড়ে নেয় সোজা সামনের দিকে বহমান সবুজ রঙা তিস্তা
সকাল ন’টা নাগাদ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে আমাদের ড্রাইভার-কে ফোন করতেই দেখি সে আমাদের আগে এসেই স্টেশনের পার্কিং-এ অপেক্ষা করছে। দুইজন প্রাণীর জন্য একটা ঝাঁ-চকচকে টয়োটা! গান শুনতে শুনতে ক্রমে ওপরে উঠতে লাগল আমাদের গাড়ি, প্রথম গন্তব্য লামাহাট্টা।
আমাদের পৌঁছাতে মোটামুটি তিন ঘণ্টা লাগার কথা। পথেই একটা ভালো চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম। চা পর্বে বেশি সময় নষ্ট করা যাবে না। সমতলের অনেকটা ওপরে এসে দারুণ লাগছিল। গরমও অনেকটা কম। চা শেষ করেই পুনরায় রওনা দিলাম। পথের সৌন্দর্য লেখায় ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
• খাওয়া দাওয়া মাথা পিছু 600/- পার ডে পার হেড (ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, স্ন্যাকস, ডিনার, চা)
• লামাহাট্টা পার্কে যত তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় তত ভাল, সন্ধ্যের আগেই নিচে নেমে আসা উচিত।
• গ্রুপে গেলে বনফায়ার-এর আনন্দ নেওয়া যেতে পারে, সমস্ত ব্যবস্থা লজ থেকেই করে দেওয়া হয়। 1000 টাকা চার্জ। • লজে গিজার এবং পাওয়ার ব্যাকআপের মত সমস্ত সুব্যবস্থা আছে।
• গাড়ি ভাড়া – আমরা লামাহাট্টা লজ থেকে প্রি-বুকড কার নিয়েছিলাম। 2700/- টয়োটা। এনজেপি থেকেও আপনারা গাড়ি বুক করতে পারেন। 2500/- (বড় গাড়ি) or 1800/- (ছোট গাড়ি) অথবা এনজেপি থেকে শাটল গাড়ি শেয়ার করেও যেতে পারেন। পার হেড 250-300/- তিস্তা বাজার অবধি। ওখান থেকে শেয়ারড জিপ (টাইমিং আর সিট পাবেন কিনা এর ঠিক নেই যদিও) পাবেন লামাহাট্টা যাওয়ার জন্য। তবে ফ্যামিলি নিয়ে গেলে এই রুটটি ভরসাযোগ্য নয়।
ঘণ্টা দুই লাগল আমাদের তিস্তাবাজার পর্যন্ত আসতে। জায়গাটি সুন্দর এবং জমজমাট। কিছু দোকানপাটের সুবিধা স্থানীয়দের জন্য এখানেই বরাদ্দ। তিস্তা বাজারের অনতিদূরেই লাভারস ভিউ মিট পয়েন্ট। পেশক রোড-এর ওপর চমৎকার একটি জায়গা। গাছ গাছালি ঘেরা রাস্তার সামনেই একধাপের সিঁড়ি, পাশেই দু-একটা দোকানপাট। একে পাহাড়ি রাস্তা তার ওপর টানা অনেকক্ষণ গাড়িতে বসে থাকার পর হাত-পা গুলো একটু মুক্তি পেল। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই সামনে অবাক করা দৃশ্য। উচ্চতাটা আঁচ করা যায় এখানেই, সামনের গভীর খাদ, দূরে তিন চার টুকরো পাহাড় আর ঘোরাফেরা করছে মেঘেরা। এক্কেবারে নীচে বয়ে যাচ্ছে দুটি নদী। তিস্তা আর রঙ্গিত। বাঁ দিক দিয়ে বয়ে আসা রঙ্গিতের চেয়ে নজর কেড়ে নেয় সোজা সামনের দিকে বহমান সবুজ রঙা তিস্তা। এদের মিলনস্থলে জন্মেছে পুঁচকে একটা দ্বীপের মত বালিময় ডাঙা। গাছ গাছালি আর ছায়ার ঘোমটা টানা জায়গাটিতে সময় কেটে যায় চোখের নিমেষে। সবাই সেখানে ছবি তুলতে ব্যস্ত।
জায়গাটা ছেড়ে মন যেতে না চাইলেও আমাদের এগোতে হল। ওখান থেকে মিনিট চল্লিশের মধ্যে পৌঁছে গেলাম লামাহাট্টা। সাজানো রাস্তার দুপাশে ফুলের গাছগুলো সূর্যের আলোয় যেন ঝলমল করছে। বাঁদিকে অবস্থিত এই জায়গার মূল আকর্ষণ একটা বিশাল পার্ক। ডানদিকে ছোট ছোট দোকান, হোমস্টে আর গভীর খাদ। পাইন এবং আরো সুন্দর সুন্দর গাছে সাজানো গোছানো লামাহাট্টা পার্কটি দেখেই মনটা ছুটতে চলে যেতে চাইল। কিন্তু চেক ইন করে, খাওয়া দাওয়া সেরেই পার্কে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হল। পার্কের একদম পাশেই গাড়ি থেকে নেমে লামাহাট্টা লজের মুখে অনুভব করলাম তাপমাত্রা বেশ কম। গরম জামা এতক্ষণ না লাগলেও বিকালেই বের করতে হবে। ফর্মালিটি শেষ করে ঘরে ঢোকার আগেই বারান্দায় থমকে যেতে হয়। সামনেই দিগন্তে মেলা পাহাড়। ফ্রেশ হওয়া ভুলে কিছুক্ষণ সেখানে মনোনিবেশ করাই যুক্তিসঙ্গত ধরে নিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা এসে গেল। বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে গরম চায়ের সঙ্গে টুকরো টুকরো পাহাড় আস্বাদন করতে বেশ লাগছিল।
সময় নষ্ট না করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম লামহাট্টা ইকো পার্ক(মমতা পার্ক) এর উদ্দেশ্যে। প্রবেশ মূল্য মাথা পিছু দশ টাকা। সুন্দর সাজানো গোছানো। পাইন এর মত বড় গাছের সাথে ফুল এবং অর্কিডের বাগান আর রং বেরঙের পতাকা দিয়ে যেন সাজানো আর একটা পাহাড়। সবুজ প্রাকৃতিক রঙের সাথে নীল, সাদা, লাল, হলুদ পতাকা আর এক মায়াবী নিস্তব্ধতা রোমাঞ্চিত করে। লোকজন বিশেষ নেই যারা আছে সবাই সামনেই ছবি তুলতে ব্যস্ত। আমরা আগেই জেনেছিলাম আসল জায়গাটিতে যেতে গেলে বেশ কিছুটা ওপরে উঠতে হবে। ওপরে আছে দুটি লেক। ওই দুটিই হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমরা তাই নিচে না দাঁড়িয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলাম সারা রাতের জার্নি ভুলে। ওপরের দিকে লোকজন বিশেষ নেই। পাহাড়ি রাস্তা কেটে পথ করা হয়েছে। তা বেশ খানিকটা উঁচু। খুব সাবধানে পা ফেলে উঠতে হবে। মাঝে মাঝে বসার জন্য বেঞ্চ আছে সেখানেও সময় কাটানো যায়। দু একটা ছবি তুলতে তুলতে আমরা এগিয়ে গেলাম। পাহাড়ি জায়গায় ঝুপ করে সন্ধে নেমে আসে তাই যতটা পারা যায় পা চালিয়ে এগোতে লাগলাম। আরো কিছুটা যাওয়ার পর দুজনকে দেখতে পেয়ে আর কতটা জিজ্ঞাসা করতেই তারা বলল এখনো কুড়ি মিনিট লাগবে। অনেকটা চড়াই বলেই এত সময়সাপেক্ষ।
কৃত্রিম ভাবে তৈরি রাস্তার পাশাপাশি পথচলতি মানুষ আরেকটা শর্টকাট বানিয়ে নিয়েছেন নিজেদের সুবিধার্থে তবে সেটার ঝুঁকি একটু বেশি। ওপরে এসে মনে হল এ এক অন্য জগৎ! থমথমে রহস্যে ঘেরা অরণ্যের মাঝে একটুকরো ফাঁকা জায়গা। সামনের বনানীর বিস্তার কতদূর তা জানতে ইচ্ছে হলেও রহস্যভেদের উপায় নেই। ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘ পেঁচার মত একটা ডাক, আর নির্জনতা যেমন গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে তেমনই অজানার আকর্ষণ হাতছানি দিচ্ছে। একটা বড় পাথর ফটোগ্রাফির জন্য দারুণ একটা ফ্রেম তৈরি করেছে। আমার বর মহাশয় নীচে ফিরে যাওয়ার এবার জন্য তাড়া দিতে লাগলেন। এত ওপরে জনমানবহীন জায়গা সত্যিই ভয় ধরায়। কিছুক্ষণ বাদে একজন লোক আর একটি বাচ্চাকে দেখে আমরা একটু সাহস পেলাম। তাদের অনুরোধ করে কয়েকটা ছবি তুলে এগিয়ে গেলাম লেকের দিকে। পাহাড়ের ওপর লেকটির নিশ্চুপ অবস্থান অবাক করে দেয়। লেকের চারপাশ ঘেরা সংস্কারের ছাপ স্পষ্ট। রংবেরঙের পতাকা দিয়ে সাজানো। এখানে আমরা একটি পরিবারের দেখা পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম আরো কিছুক্ষণ কাটানো যাবে এটা ভেবে। লেকের স্বর্গীয় পরিবেশ ছেড়ে আরো মিনিট কুড়ি পর আমরা নেমে আসলাম। সূর্য তখন যায় যায় করছে। ওঠা নামার পথে বসার কিছু জায়গা করা হয়েছে, ফটো তোলার জন্য আদর্শ জায়গাগুলি। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় মাখা বৃক্ষরাজির রহস্য ভেদ করে নিচে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম। আগেই আমাদের হাউস কিপিং-এর ছেলেটির থেকে জেনেছিলাম লামাহাট্টা লজ এর কর্তা তিমজং লামা মহাশয়ের কথা। একসময়কার মিলিটারি ম্যান এবং এই অঞ্চলের আদি এবং অত্যন্ত গণ্যমান্য ব্যক্তির কথা। কাজের অবসরে এই প্ৰাচীন মানুষটি পর্যটকদের অনুরোধে নিজের পূর্ব জীবনের কথা শুনিয়ে থাকেন। বারান্দায় বসে চা পাকোড়া খেতে খেতে মনটা উদাস হয়ে গেল। কালই রওনা দিতে হবে তিনচুলের উদ্দেশ্যে।
সন্ধেবেলা আমরা ঠিক করলাম যদি তিমযং লামা মহাশয়ের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। আমাদের ডাইনিং রুম এর পাশেই ওনার পরিবার নিয়ে বসবাস। সত্তরোর্ধ তরুণ মানুষটি সর্বদাই ব্যস্ত। আমাদের অনুরোধে এককথায় রাজি হয়ে গেলেন গল্প শোনাতে তবে এবার মিলিটারি জীবনের কথা নয় শুনতে বসলাম লামাহাট্টার ইতিহাস। অত্যন্ত প্রাণবন্ত তাঁর সঙ্গ, কখন যে রাত হয়ে এল বুঝতেই পারলাম না! যেন আমাদেরই সমবয়সী। লামাহাট্টা ঘোরা যেন সম্পূর্ন হল। আমরা যতটুকু জানলাম তা হল পাহাড়ের ওপরের যমজ দুটি লেক (একটি বোজানো লতা পাতা দিয়ে)। স্থানীয় মানুষের মধ্যে লেকদুটি সম্পর্কে নানান সংস্কার, লেকের তলায় মানুষের কঙ্কালও মিলতে পারে। লেকদুটি বা লামাহাট্টাকে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবদান যথেষ্ট। আরো জানলাম সন্ধ্যের পর ওপরে লেকের ধারটি মোটেও নিরাপদ নয় কারণ আচমকাই সাক্ষাৎ হয়ে যেতে পারে কোনো ভাল্লুক বা চিতার সাথে। উনি বললেন স্থানীয় মানুষদের লামা বলে মনে করলেও আসলে তারা ডুক্পা গোষ্ঠীর, ব্রিটিশরাই লামাদের সাথে পোশাকের মিল দেখে তাদের লামা বলে ভুল করে আর সেই পরিচিতই এখনও তারা বহন করে চলেছে। অনেক তথ্য হাসি আনন্দে আমাদের মন ভরে গেল। রাতের মেনু ডাল, ভাত, আলুভাজা, সব্জি, চিকেন পরিবেশন করছে হাসিমুখে মিষ্টি চেহারার একটি মেয়ে, লীলা। সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম, তবুও তার ব্যবহার এবং হাসি মুখে অতিথিদের দেখভাল করা সত্যি মনে দাগ কেটে যায়।
তিমজং লামা যে কতখানি বড় মনের মানুষ তার পরিচয় আমরা পেয়েছিলাম পরদিন, চেক আউটের সময়। বিল মেটাতে গিয়ে দেখি আমাদের খাওয়া খরচ বাবদ বেশ কিছু টাকা তিনি কম নিয়েছেন, কারণ আমরা নাকি পরিমান মত খাইনি। এমনটি আর কোথাও পাব কিনা সত্যি জানি না! এমন মানুষ যে আজও আছেন ভাবতেও ভালোলাগে।
রাতে প্রথমদিনেরই হাজারো স্মৃতি নিয়ে শুতে গেলাম। পরদিন রওনা দেব তিনচুলে-র দিকে।