উপর থেকে দেখা যায় ল্যান্সডাউন শহর আর দূরে পাহাড়ের পর পাহাড়ের স্তর পেরিয়ে বরফে ঢাকা নন্দাদেবীশৃঙ্গ

উত্তরাখণ্ডের পৌড়ি গাড়োয়ালের ছোট্ট শহর ল্যান্সডাউন। যারা নির্জনতা পছন্দ করেন, নিরিবিলিতে হিমালয়কে উপভোগ করতে চান, তাদের পক্ষে আদর্শ এই জায়গা। দিল্লি থেকে ল্যান্সডাউন আসা একেবারেই দুরূহ নয়। রাতের ট্রেনে চেপে কোটদ্বার, সেখান থেকে মাত্র ৪১ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ৫৬০০ ফুট উচ্চতার ল্যান্সডাউন। গাড়িতেও সরাসরি আসা যায় দিল্লি থেকে – রাস্তা খুবই ভালো।
যাতায়াত এত সুগম হওয়া সত্ত্বেও পর্যটকের ঢল নামে না এখানে – এর একটা বড় কারণ এটা মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চল। যত্রতত্র হোটেল গজিয়ে উঠতে পারেনি। আছে কেবল গাড়ওয়াল মন্ডল বিকাশ নিগমের দুটি পর্যটন নিবাস। শহরের বাইরে অবশ্য আছে কয়েকটি রিসর্ট, তবে তা সংখ্যায় নগণ্য।

কী ভাবে যাবেন
দিল্লি থেকে কোটদ্বার যাওয়ার ট্রেন মুসৌরি এক্সপ্রেস আর গাড়োয়াল এক্সপ্রেস। মুসৌরি এক্সপ্রেসে সময় লাগে কম, সময়টা সুবিধেজনকও বটে। রাত সাড়ে এগারোটায় ওল্ড দিল্লি স্টেশন ছেড়ে কোটদ্বার পৌঁছায় ভোর ছটায়। কোটদ্বার থেকে অজস্র গাড়ি যাচ্ছে ল্যান্সডাউন। দিল্লি থেকে সরাসরি গাড়িতেও আসা যায়, দূরত্ব ২৪০ কিলোমিটার, রাস্তা ভালো। তবে যানজটে পড়তে পারেন। সময় লাগে ৭ ঘন্টা বা কিছু বেশি। ল্যান্সডাউন বাজার থেকেই গাড়ি পেয়ে যাবেন পৌরি ও খিরসুর। খিরসুর দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। খিরসু থেকে রুদ্রপ্রয়াগ বা দেবপ্রয়াগ দেখে হরিদ্বার চলে যাওয়া যায়। খিরসু থেকে রুদ্রপ্রয়াগের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার, দেবপ্রয়াগের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। আবার সরাসরি ১৩৩ কিলোমিটার দূরে ঋষিকেশও চলে যাওয়া যায়।

অতীতে এ জায়গার নাম ছিল কালুডাণ্ডা – গাড়োয়ালি ভাষায় কালো পাহাড়। ১৮৮৭ সালে লর্ড ল্যান্সডাউন, ভারতবর্ষের তদানীন্তন ভাইসরয় এই শহর প্রতিষ্ঠা করেন, তাঁর নামেই শহরের নাম হয় ল্যান্সডাউন। সেনাবাহিনীর ‘গাড়োয়ালি রাইফেলস’ রেজিমেন্টের শিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হয় এখানে। স্বাধীনতার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়োয়াল রেজিমেন্টের কেন্দ্র হয় এই শহর। পুরো শহরেই ছড়িয়ে আছে ব্রিটিশ স্থাপত্যের নানা নিদর্শন। পুরনো স্থাপত্যের কোনওটিই নষ্ট করা হয়নি। ঘন ওক আর পাইন বনের মাঝে দূরে দূরে রয়েছে পুরোন ব্রিটিশ বাংলো, কোনও কোনওটির ব্রিটিশ  মালিকের নামও পরিবর্তন করা হয়নি। এগুলি এখন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্তাদের আবাসস্থল, প্রত্যেকটিই আলাদা করে নজর কাড়ে।

ব্রিটিশদের তৈরি দুটি গির্জা  আছে শহরে। সেন্ট মেরীর গির্জা তৈরি হয় ১৮৯৫ সালে। এখন এটি কার্যকরী নয়, স্বাধীনতার পরে এখানে তৈরি হয়েছে প্রাচীন ল্যান্সডাউন সংক্রান্ত ছোট্ট এক মিউজিয়াম। সেন্ট জন গির্জা এখানকার একমাত্র চালু গির্জা। এটি তৈরি হয়েছে ১৯৩৬ সালে। দুটি গির্জারই স্থাপত্যশিল্প অপূর্ব, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ সৌন্দর্য যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আর আছে দারোয়ান সিং যুদ্ধ-স্মারক মিউজিয়াম – গাড়োয়াল রেজিমেন্টের প্রথম ভিক্টোরিয়া ক্রসপ্রাপক দারোয়ান সিং নেগির নামে তৈরি। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে গাড়োয়াল রেজিমেন্টের নানা স্মারক দ্রব্য আছে এখানে।

শহরের মধ্যে আছে ছোট এক লেক – ভুল্লা তাল, পরিপাটি করে সাজানো, তাল-এ নৌকা করে ঘোরাও যায়।

কিন্তু ল্যান্সডাউনের আসল স্বাদ পেতে হলে থাকতে হবে Tip-In-Top-এ গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের পর্যটন নিবাসে। ওক, পাইনে ছাওয়া রাস্তা দিয়ে উঠতে হবে ল্যান্সডাউন বাজার থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার। উপর থেকে দেখা যায় ল্যান্সডাউন শহর আর দূরে পাহাড়ের পর পাহাড়ের স্তর পেরিয়ে বরফে ঢাকা নন্দাদেবীশৃঙ্গ। ভোরবেলা ঘরের দরজা খুলে শ্বেতশুভ্র পাহাড়ে সূর্যের প্রথম আলোর খেলা – এ এক অপার্থিব দৃশ্য। আর কত যে পাখি আসে এখানে। যে পথেই হাঁটা যাক না কেন, চোখে পড়বে নানা চেনা-অচেনা পাখি পক্ষীবিদদের স্বর্গরাজ্য।

শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে আছে তারকেশ্বর মহাদেব মন্দির, ভক্ত হন বা না হন, নৈসর্গিক দৃশ্যের জন্যই যেতে হবে আপনাকে। পাইন আর রডোড্রেনডনের বনের মধ্য দিয়ে পথ গিয়েছে দেবদারু গাছে ঘেরা মন্দিরে। মে মাসের শুরুতেও কোনও কোনও গাছে রয়ে গেছে রডোডেনড্রন, না জানি এপ্রিলে কী রূপ ছিল এ-পথের!  মন্দিরের বাইরে আছে কুণ্ড, স্নান করে পুণ্যার্থীরা মন্দিরে ঢোকেন পুজো দিতে। পাশে ভক্তদের জন্য অতিথি নিবাসও আছে।

ল্যান্সডাউন শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে পাউরি গাড়োয়ালের সদর শহর পাউরি। হাতে সময় থাকলে পাউরি ছাড়িয়ে আরও ১৯ কিলোমিটার গিয়ে চলে যাওয়া যায় খিরসু। খিরসুর গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের পর্যটন আবাস থেকে দেখা যায় দিগন্ত বিস্তৃত হিমালয়ের নানা শৃঙ্গ।

এখনও দেখা হয়নি রডোড্রেনডনে ভরা ল্যান্সডাউন, দেখা হয়নি বরফে ঢাকা পাইন আর ওক, হাঁটা হয়নি শহরের আরও কত পথে, চেনা হয়নি কত পাখি – যেতে হবে আবার বসন্তে, শীতে, হেমন্তে…

Developed by DXDasia