নৈসর্গ লাচেন ও গুরুডোংমার

দূর-দূর পাহাড়ের ঠাণ্ডা হাওয়া, সরু সর্পিল রাস্তা পাহাড়ের গা ঘেঁষে যত উপরে উঠছি প্রকৃতি তত জড়িয়ে ধরছে নিবিড় ভাবে

উত্তর সিকিমের পাহাড়ি গ্রাম লাচেন। সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক থেকে ১২৯ কিমি দূরে- সমুদ্রতল থেকে ১৩০০০ ফিট উপরে অবস্থিত এই গ্রামটির নামের মানে ‘বড় গিরিখাত।’ লাচেন থেকে তিব্বত যাওয়া যায় খুব সহজে। এই গ্রামটির নিজস্ব প্রশাসন ব্যবস্থা রয়েছে। তাকে বলে ‘যুমসা।’ এর পরিচালককে বলে ‘পিপন।’

কিভাবে যাবেন
নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন বা বাগডোগড়া বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে লাচেন যাওয়া যায়। তবে স্টেশন বা বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে গ্যাংটকে এসে এক রাত কাটিয়ে পর দিন লাচেন যাওয়াই ভালো। গ্যাংটক থেকে বাস ও ট্যাক্সি পাওয়া যায় সব সময়। গুরুডোংমার যাওয়ার আয়োজন হোটেল থেকে করা যায়। আগে থেকে হোটেল বুক করে যাওয়া ভালো। ঠাণ্ডা জামা কাপড়ের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখতে হবে।

গ্যাংটক থেকে লাচেন যেতে সময় লাগে ৬ ঘণ্টা। জনবহুল গ্যাংটক শহর পেরিয়েই লাচেন যাওয়ান জন্য গাড়ি উঠতে থাকে পাহাড়ি পথের পাকদণ্ডী বেয়ে। কখনও চড়াই– কখনও উতরাই আর দূর-দূর পাহাড়। প্রকৃতি তত জড়িয়ে ধরছে নিবিড় ভাবে। এপ্রিল মাসেও সোয়েটার-জ্যাকেট-মোজা সব পরেও ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে লাগে চাবুকের মত।

এই পথে মানুষের আনাগোনা কম। পথের সঙ্গী দু-পাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ কর্ণিফার ও লাল-গোলাপি-বেগুনী রঙিন রডোডেনড্রন। পথ প্রদর্শক সম্মুখের তুষাররাজ। সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে একবার বরফ ঢাকা পাহাড়ের মাথার উপর আরেকবার ছড়িয়ে পড়ছে ফুলগুলোর উপর– উজ্জ্বল হাসির মত। দূর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে সরু ঝর্ণা। মিলিয়ে যাচ্ছে ঘন কর্ণিফারের সবুজ জঙ্গলে। এই ভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ হারিয়ে গেল সবুজ। এখন দু’পাশে শুধু সাদা পাথর। এখানে রাস্তা একেবারে নেই। এবড়ো-খেবড়ো পাথর ভেঙে গাড়ী এগিয়ে চলেছে আস্তে-আস্তে – দুলতে-দুলতে। রাস্তার ডানপাশে গভীর খাদ। আর বাঁ-পাশে আকাশ-ছোয়া পাহাড়। চারিদিকটা যেন একটা ধূ-ধূ প্রান্তরের মত।

দূর থেকে যখন লাচেন দেখতে পেলাম; তখন ঘড়িতে দুপুর তিনটে। কিন্তু চারিদিক দেখে মনে হচ্ছে এখনই সন্ধ্যে নামবে। দু-পাশে ঘন কুয়াশার চাদর। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। সমস্ত আকাশের মুখভার। ঘন কালো মেঘ ঢেকে দিয়েছে সূর্যের আলো। সামনের পাথুরে রাস্তাটা উঠে গেছে উপরে পাহাড়ের দিকে। আমরা কিছুক্ষণ হাঁটলাম রাস্তাটা ধরে। এরপর হঠাৎ বৃষ্টি এল ঝমঝমিয়ে। সাথে ঝোড়ো হাওয়া। সামনের পাহাড়টা তখন সম্পূর্ণ সাদা বরফ আর বৃষ্টিতে ঢাকা। আমরা ঘরে ঢুকে এলাম। আমাদের হোটেলটা এখনও তৈরি হয়নি সম্পূর্ণ ভাবে। হোটেলের কর্মচারীরা বাঙালী– কোচবিহারের লোক। গরম ধোঁওয়া ওঠা ভাত – মুসুরির ডাল আর কড় কড়ে আলুভাজা দিয়ে নৈশ আহার সারলাম। সমস্ত রাত ঘুমোইনি আমরা কেউ। শুধু শুনেছি চালের উপর বৃষ্টির শব্দ।

রাত তিনটেই বেরোলাম আমরা গুরুডোংমার হ্রদের উদ্দেশ্যে। ১৭৮০০ ফিটউ পরে। বৌদ্ধ গুরু পদ্মাসম্ভাব এই হ্রদটি কে আবিষ্কার করেন অষ্টম শতাব্দীতে। পরে গুরুনানকও এখানে আসেন। তাই এই হ্রদটি কে বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মের লোকেরা একটি পবিত্র কুণ্ড বলে মনে করে। এত গভীর রাতে পাহাড় যে এত অপূর্ব হতে পারে কল্পনাও করিনি কোনও দিন। এক অদ্ভুত মায়াবী চাঁদের নীলচে আলো ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত চরাচরে। নীচে পাথুরে নদী সাদা হয়ে আছে জ্যোৎস্নার আলোয়। আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটলো পুবে। ঘড়িতে তখন ভোর ৪.৩০। পাহাড়ের চূড়োগুলোতে কিন্তু তখনো কালো অন্ধকার। শুধু দেখলাম আকাশ রঙ বদলাচ্ছে। কালো থেকে নীল-কমলা-লাল। কর্ণিফারের পাতায়– রডোডেনড্রনের পাঁপড়িতে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র শিশির বিন্দু। দেখে মনে হচ্ছে সদ্য স্নান করে আসা অপ্সরী।

এই রকম সবুজ কর্ণিফারের পথ পেরিয়ে– রঙিন রডোডেনড্রনের ভূমি পেরিয়ে হ্রদের ধারে যখন পৌছুঁলাম তখন ঘড়িতে সকাল ৭.০০টা। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম হ্রদের ধারে। এখানের তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেণ্টিগ্রেড। ৫ কিমি বিস্তৃত এই হ্রদটির এলাকা ১১৮ হেক্টার। হ্রদটির তিন ধারে হিমবাহ ঢাকা পাহাড়। ওই হিমবাহ থেকেই এই হ্রদটির উৎস। আর এই হ্রদটি গিয়ে মিশেছে ছোলা মুনদী হয়ে তিস্তা নদীতে। পাহাড়ের ওপাশেই তিব্বত। যদিও শীতকালে এই হ্রদটি সম্পূর্ণ ভাবে জমে যায়; কিন্তু এখন জলটি স্বচ্ছ সবুজ। ঠিক যেন এক স্থির ধ্যান মগ্ন সন্ন্যাসীর মত। এতটুকু ঢেউ নেই সেখানে। যেন সমস্ত কিছুর উপরে সে বিরাজমান। কোনও কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। আর তাই বুঝি তাকে ছুঁয়ে পবিত্র হই আমরা। তীর ধরে হাঁটলাম কিছুক্ষণ। তীর ধরে শুধু রাশি রাশি সাদা পাথর। এত জোরালো ঠাণ্ডা হাওয়া যে চোখ পর্যন্ত খুলে রাখা যাচ্ছে না। মাথার উপর পরিষ্কার নীল আকাশ। সূর্য উঠলেও তার আলো এত জোরালো নয় এখানে। চারিদিক নিঃশব্দ। শুধু কানের পাশে একটানা শোঁ-শোঁ হাওয়ার শব্দ।

আমরা প্রায় দেড় ঘণ্টা ছিলাম হ্রদের ধারে। এবার ফেরার পালা। পথে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখলাম চোপ্তা উপত্যকা। সবুজ উপত্যকায় চরে বেড়াচ্ছে চমরী গাই আর নীল ভেড়া। পিছে পিছে সরে যাচ্ছে পাহাড় পাহাড়ি রাস্তা সবুজ কর্ণিফারের জঙ্গল রডোডেনড্রনের ঝাড়। আর আমরা এগিয়ে চলেছি শহরের দিকে। নৈঃশব্দ ছেড়ে শব্দের কোলাহলে। নির্জনতা ছেড়ে জনমানুষের ভিড়ে।

Developed by DXDasia