এমন অচেনা রঙের কুমোরটুলিকে আগে কখনো দেখেনি কলকাতা
কোনো এক জাদুকাঠির ছোঁয়ায় যেন বদলে গেছে গোটা পাড়া। দেওয়ালে নতুন রং। প্রতিটা স্টুডিও সেজে উঠেছে নতুনভাবে। রঙে, আলপনায়, আলোতে চেনা গলি, সরু রাস্তাগুলোই হয়ে উঠেছে অনাবিষ্কৃত নতুন দেশ। রাস্তার দু’পাশে একের পর এক ইনস্টলেশন থেকে চোখ সরানোই যাচ্ছে না।

কোথাও প্রতিমার ছাঁচ, কোথাও দেওয়ালে মোটিফ। কলকাতার কুমোরটুলি সত্যিই যেন নতুন মলাট পেয়েছে। মাত্র দুদিনের সাজ। তবু, যেন শেষ না হওয়া গপ্প এইসব।

১৪ আর ১৫ এপ্রিল, এমনই আশ্চর্য রূপটানের সাক্ষী থাকল কুমোরটুলি। সৌজন্যে ‘এশিয়ান পেইন্টস শারদ সম্মান’ আয়োজিত একটি শিল্প কার্নিভাল। ‘রং মাটির পাঁচালী’। যেখানে গোটা কুমোরটুলিকেই বানিয়ে তোলা হয়েছিল এক আস্ত ক্যানভাস। ভোল বদলে দেওয়া হয়েছিল গোটা পল্লির। এবং এই ভোলবদল কিন্তু কুমোরটুলির ইতিহাস-ঐতিহ্য-চরিত্রকে মুছে ফেলে নয়। বরং, সেইসবকে জড়িয়েই।

কুমোরটুলির এই নতুনভাবে সেজে ওঠার আড়ালে ছিলেন পার্থ দাশগুপ্ত, সুশান্ত পাল, সুমন চৌধুরী, শমীন্দ্র মজুমদারের মতো বিখ্যাত শিল্পীরা। আর ছিলেন কুমোরটুলিরই অনেক শিল্পী। উদ্যোক্তারা সচেতনভাবেই ‘রং মাটির পাঁচালী’-কে প্রদর্শনীশালা বলেননি। বলেছেন কার্নিভাল। এই উদ্যোগের মেজাজটা ধরা সম্ভব ছিল না আর কোনো শব্দেই।

প্রবেশ ও প্রস্থানে তোরণ। রাজকীয় নয়। বাঁশের কাঠামো, রং-বেরঙের কাপড় জড়ানো। যেন একটা ছাঁদের আবহ। ঢুকতেই দু’পাশের স্টুডিওতে ছোটো-বড়ো ইনস্টলেশন। সেখানে প্রতিমার মুখ কিংবা আস্ত প্রতিমা, পটচিত্র, নানা মূর্তি। আলো এক বিশেষ চরিত্র এই কার্নিভালে।

শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত বলছিলেন, “এমনিতে কুমোরটুলির প্রত্যেকটা স্টুডিওই ইনস্টল ফিগারে আছে। আমরা একটু-আধটু আলো যোগ করেছি। একটু রাঙিয়েছি, সাজিয়েছি মাত্র। এছাড়া, কুমোরটুলির শিল্পীরাও নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন। এঁদের অনেকেই আর্ট কলেজের ছাত্র। পরম্পরাগত শিল্পচর্চা অর্থাৎ প্রতিমা তৈরির বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার একটা চাহিদাও তাঁদের মধ্যে ছিল। সেইসবও যুক্ত হয়ে পরম্পরা ও ব্যক্তিগত শিল্পসৃষ্টির একটা মেলবন্ধন তৈরি করেছে। এর গোটাটাই যেহেতু কুমোরটুলিকে ঘিরেই হয়েছে, অতএব দৃষ্টিকটুও লাগছে না। বরং, গোটা জায়গাটাই একটা ভিন্ন চরিত্র পেয়েছে।”


অন্যতম উদ্যোক্তা সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় জানালেন, কুমোরটুলিকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার ব্যাপারটা এর আগে কেউ কখনো ভাবেনি। শুনলে অবাক লাগতে পারে, এই বিশাল কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাটা মাথায় এসেছিল নাকি মাত্র সপ্তাহ তিনেক আগে। বিশ্ব শিল্পকলা দিবস এবং বাংলা নববর্ষকে উপলক্ষ করে এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করাটা তখন পাহাড়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই কাজটাই উতরে দিয়েছেন পার্থ দাশগুপ্ত, সুশান্ত পাল, সুমন চৌধুরী, শমীন্দ্র মজুমদারেরা। সঙ্গে অবশ্য জুড়েছেন কুমোরটুলির শিল্পীরাও।

মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে একসময় মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা টুকাই সাধুখাঁ, সীতা মাইতির মতো শিল্পীরাও হাত লাগিয়েছেন কুমোরটুলিকে সাজিয়ে তোলার কাজে। সে আরেক গল্প। গল্প হলেও সত্যি।

দিন-রাত এক করে কাজ চলেছে। বাড়ির দেওয়ালে নতুন রং করার ক্ষেত্রে শুরুতে অনেকে আপত্তি জানিয়েছেন। একটা-দুটো বাড়িতে নতুন রঙের পোঁচ পড়তেই অবশ্য অনুমতি মিলেছে বাকিদেরও। সেই রং করাও এলাহি ব্যাপার। অনেক বাড়িরই অবস্থা ভালো নয়। বাঁশের কাঠামো তৈরি করে রং করা কঠিন। যাহোক, কোনোমতে রং করার পর গোটা কুমোরটুলিকে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা কষা হয়েছে। ইনস্টলেশনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে কুমোরটুলিরই নিত্য-ব্যবহার্য সব জিনিস। সেখানে বিস্মিত হওয়ার হরেক উপকরণ। চায়ের দোকানে আড্ডা চলছে। আপনি গলা ভেজাতে গিয়ে লক্ষ করলেন চা-বিক্রেতা আসলে মাটির মূর্তি। এতক্ষণ বুঝতেই পারেননি!

শুধুই চায়ের দোকানি! কাগজ পড়ছেন যে ভদ্রলোক, তাকে দেখেও ঠকেছেন আপনি। কুমোরটুলিতেই জন্ম এইসব বাস্তবানুগ মডেলের। মোমের নয়, মাটির মূর্তি। মাদাম তুসোর পরিকাঠামো নেই, তবু কী নিখুঁত!

এই গোটা ক্যানভাসের চরিত্রকে সামান্য কথায় বুঝিয়ে বলা অসম্ভব। ছবিতে তার খানিক আভাস থাকল। অ্যাম্বাসাডরের গায়ে, বাড়ির দরজায়, গলির দেওয়ালে তুলিরা নানা গল্প বুনেছে। হাজারো মূর্তি, অবয়বেরা স্থান বিনিময় করে নির্মাণ করেছে আখ্যান। প্রতিটা বাড়ি, স্টুডিও, স্টুডিওর ভিতরে কর্মরত শিল্পীরা প্রত্যেকেই অংশ হয়ে উঠেছেন এই প্রদর্শনীর থুড়ি কার্নিভালের।

জীবন্ত-জড়-রং-মাটির সীমারেখা উধাও হয়ে গেছে। রাস্তায় নেমে এসেছে নৌকো, ঠেলাগাড়ি। তার ওপরে প্রতিমার খড়ের ছাঁচ। সুতোয় ঝোলানো মুখোশগুলোর ব্যাকড্রপেও প্রতিমার মুখ। মাঝে হঠাৎ বিশাল দুর্গাপট।


পার্থ দাশগুপ্ত বলছিলেন, কলকাতার উৎসবে প্রতিমা জোগান দেওয়া এই কুমোরটুলি নিজে যেন উদযাপনের বাইরে এককোণে পড়ে থাকা একটি বর্ণহীন পল্লি। এখানে ঘরে ঘরে শিল্পী। পরম্পরা-বাহিত শিল্পচর্চার মধ্যেও কোথাও যেন বিষাদের সুর খেলা করে অলিতে-গলিতে। সেই সুরটাকেই উৎসবের আবহে বদলে নেওয়ার জন্যই এই আয়োজন। এবং, একইসঙ্গে একটা নতুন ব্যাপারের জন্মও হল কলকাতায়। এমন জীবন্ত ক্যানভাসে, এমন মুক্ত জায়গায় ইনস্টলেশন আগে কখনো দেখেনি এই শহর।

উদ্যোক্তারা বলছেন এটি কুমোরটুলির নতুন মলাট। কুমোরটুলির নতুন সাজ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, মলাট শব্দটা ঠিক নয়। এ আসলে কুমোরটুলির নতুন পাঠ। মলাট উল্টোলে তবেই এর পাতাগুলি খুলে পড়া যাবে।
