কুলিক নদীর ধারে পাখিদের মুক্তাঞ্চল, প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য

রায়গঞ্জের কুলিক পাখিরালয়

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে জায়গাটি নতুন রূপে গড়ে উঠতে থাকে, নৌকাবিহারের ব্যবস্থাও আছে

যাঁরা পাখি ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য উত্তর দিনাজপুর জেলার সদর শহর রায়গঞ্জের কাছেই এক মনোরম ডেস্টিনেশন রয়েছে। রায়গঞ্জ বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য (Raiganj Wildlife Sanctuary), যা সাধারণভাবে পরিচিত কুলিক পাখিরালয় (Kulik Bird Sanctuary) নামে। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কুলিক নদী, তার জন্যই এমন নাম। ১৬০টিরও বেশি প্রজাতির পাখির আশ্রয়স্থল এই জায়গা। প্রত্যেক বছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার পরিযায়ী পাখি এখানে আসে।

রায়গঞ্জ বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য প্রবেশদ্বার

রায়গঞ্জ স্টেশন থেকে NH 34 ধরে কুলিক পাখিরালয় প্রায় ৩ কিমি। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশেই অবস্থিত। আয়তন মোটামুটি ৩৫ একর, তবে আশেপাশের জায়গায় নিয়ে প্রায় ২৮৬ একর অঞ্চলে পাখিরালয়ের বিস্তার। অনেকে মনে করেন, এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পক্ষীনিবাস এটি, রাজস্থানের কেওলাদেও জাতীয় উদ্যানের ঠিক পরেই।

অনেকে মনে করেন, এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পক্ষীনিবাস এটি, রাজস্থানের কেওলাদেও জাতীয় উদ্যানের ঠিক পরেই।

দেশ-বিদেশের বিচিত্র পাখির দেখা মিলবে

১৯৮৫ সালে এটিকে সরকারিভাবে চিহ্নিত করা হয় ‘রায়গঞ্জ বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য’ নামে। ১৯৭০ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে জায়গাটি নতুন রূপে গড়ে উঠতে থাকে। কদম, জরুল, শিশু, ইউক্যালিপটাস প্রভৃতি গাছ লাগানো হয়। এশীয় শামুকখোল (Asian Open Bill Stork)-এর মতো পরিযায়ী পাখিরা আনাগোনা শুরু করে। শীতকাল ছাড়া সহজে এদের দেখা মেলে না। লম্বা ঠোঁট বিশিষ্ট এই পাখিটির পালকের রং বর্ষায় ধবধবে সাদা থাকলেও, প্রজননের সময় সাদা রং কিছুটা ধূসর হয়ে সাদা আর কালোর অদ্ভুত সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে চারপাশে সবুজ বনানীর দিকে তাকালেই মনে হবে, প্রতিটি গাছের মাথা যেন সাদা-কালো-ধূসর রঙা চাদরে মোড়া। প্রতিটি গাছের মাথা আসলে শামুকখোল পাখিদের একান্নবর্তী পরিবার। এ যেন তাদের অরণ্যের অধিকার।

দুই রূপে এশীয় শামুকখোল পাখি 

কুলিক পাখিরালয়ের আকৃতি খানিকটা ইংরেজি ‘U’ বর্ণের মতো। কুলিক নদী আর বেশ কিছু কৃত্রিম নালা যুক্ত রয়েছে তার সঙ্গে। মাছরাঙা, কাঠঠোকরা, ফিঙে, বাজ, চিল, পেঁচার মতো দেশীয় পাখিরা যেমন রয়েছে, তেমনি ফ্লাইক্যাচার, ড্রংগো, এগ্রেট, স্টর্ক, হেরনের মতো পরিযায়ী পাখিদেরও আনাগোনা হয়। মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির উপকূল থেকেই আসে এরা। তাছাড়া শিয়াল, খেঁকশিয়াল, খরগোশ, বনবিড়াল ইত্যাদি প্রাণীর বাস অভয়ারণ্যে। আর পাওয়া যায় বিভিন্ন রকমের মাছ ও কাঁকড়া। 

সাধারণত মে মাসের শেষ এবং জুন মাসের শুরুতে পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কিংবা জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত তারা এখানেই থাকে। জুলাই-আগস্ট নাগাদ বাসা তৈরি করে। আগস্ট-সেপ্টেম্বর হল প্রজননের সময়। অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ পাখিরা সন্তানদের উড়তে শেখায়। তখনই পাখি দেখার আদর্শ সময়। ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির নেশা যাঁদের রয়েছে, এই জায়গা তাঁদের কাছে স্বর্গরাজ্য। 

মে মাসের শেষ এবং জুন মাসের শুরুতে পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়

কোথায় কোথায় যাবেন
কুলিক পাখিরালয়ে সময় কাটানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ সীমান্তে বিন্দোল গ্রামের ভৈরবী মন্দির, কর্ণজোড়ার সংগ্রহশালা, উদ্যান, মালদার গৌড়, পাণ্ডুয়া ইত্যাদিও ঘুরে আসতে পারেন।কীভাবে যাবেন
রেলপথে যেতে চাইলে হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেন ধরে রায়গঞ্জ স্টেশনে নামবেন। সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে চলে যাবেন কুলিক পাখিরালয়। আকাশপথে গেলে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামতে হবে। তারপর গাড়ি করে পাখিরালয় পৌঁছতে ৩-৪ ঘণ্টা লাগবে। এছাড়া সড়কপথেও যাওয়া যায়। কলকাতা থেকে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরতে হবে। সময় লাগবে ৫-৬ ঘণ্টা। কলকাতা (৪২৫ কিলোমিটার), মালদা (৭৬ কিলোমিটার), শিলিগুড়ি (১৮১ কিলোমিটার), বালুরঘাট (১১১ কিলোমিটার), দার্জিলিং (২৩৬ কিলোমিটার), দুর্গাপুর (৩১৪ কিলোমিটার), আসানসোল (৩২৭ কিলোমিটার) প্রভৃতি জায়গা থেকে বাসে করেও রায়গঞ্জ যেতে পারেন।কোথায় থাকবেন
রায়গঞ্জে আছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ট্যুরিজম প্রপার্টি। পাখিরালয়ের উল্টোদিকেই WBTDCL-এর লজ। সেখানে কয়েকদিন থেকে পরিবার-বন্ধুবান্ধব নিয়ে কুলিক পাখিরালয় এবং আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে দেখতে পারেন। 

ছবি- uttardinajpur.gov.in and Google 

Developed by DXDasia