অভিনয় করে উপার্জিত অর্থ গান্ধীজির হাতে তুলে দিয়েছিলেন ‘পথের পাঁচালী’র ‘হরিহর’

উত্তমকুমার, সাবিত্রী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়-শিক্ষক ছিলেন কানু বন্দ্যোপাধ্যায়

‘পথের পাঁচালী’-র শ্যুটিং শুরু হবে। অপুর বাবার ভূমিকায় কানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেবেন বলে মনস্থির করেছেন সত্যজিৎ রায়। পেশাদার অভিনেতা, অসংখ্য নাটক ছাড়াও একশোর বেশি ছবিতেও ততদিনে অভিনয় করা হয়ে গেছে ‘কানুবাবু’-র। অনেকদিন ধরেই হরিহর চরিত্রে মানানসই অভিনেতা খুঁজছিলেন সত্যজিৎ রায়। শেষে কানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে পছন্দ হল। হরিহরের চরিত্রে চমৎকার মানাবে তাঁকে। সব শুনে কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ও রাজি। কিন্তু শ্যুটিং শুরুর দিনই বিপত্তি। 

নতুন ছবির শ্যুটিং-এর জন্য বেশ পরিপাটি করে চুল কেটে এসেছিলেন কানু বন্দ্যোপাধ্যায়। দেখেই বিরক্ত হলেন সত্যজিৎ। এ কী, এমন করে চুল ছাঁটা কেন? নির্দেশ এল, যতদিন না হরিহরের মানানসই চুল গজাবে ততদিন শ্যুটিং বন্ধ। এতে আর্থিক ক্ষতি কম নয়। তবু, প্রথম সিনেমা করতে আসা পরিচালকের নির্দেশ মানতেই হল কানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আর এতে বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হওয়া দূরে থাক, সত্যজিতের প্রতি মুগ্ধতা ঘন হল তাঁর। বোড়াল থেকে কলকাতায় ফিরে জনে-জনে নাকি বলে বেড়াতেন, এতদিনে এক জাত পরিচালকের সন্ধান পেয়েছেন। ‘পথের পাঁচালী’-র পরে ‘অপরাজিত’ সিনেমাতেও হরিহরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন কানু বন্দ্যোপাধ্যায়। বাকিটা ইতিহাস।

১৯৫৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’। সেই একই বছরে মুক্তি পেয়েছিল কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরো ৬টি ছবি। তার মধ্যে, তপন সিংহ পরিচালিত ‘উপহার’ সুপারহিট। একই বছরে বাংলার দুই বিখ্যাত পরিচালকের সঙ্গে ছবির মুক্তি। কানু ওরফে কানাইলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়-ক্ষমতা সম্পর্কে আঁচ পাওয়া যায় এর থেকেই।

জন্ম রাজস্থানে। তারপর শৈশবেই চলে আসা কলকাতায়। কয়েকবার বাসা বদলের পর ১৬/২ বনমালী চ্যাটার্জি লেনের বাড়িই হল চিরস্থায়ী ঠিকানা। অভিনয়ে হাতেখড়ি এক অদ্ভুত সংযোগের মধ্যে দিয়ে। নন্দলাল বসুর বাড়িতে একটি অনুষ্ঠানে একটা সংস্কৃত শ্লোক ও কবিতা পাঠ করেছিলেন কানাইলাল। তাঁর বয়স তখন দশ-বারোর বেশি হবে না। দর্শকাসনে ছিলেন অমৃতলাল বসু। কানাইলালের পাঠ তাঁর ভারি ভালো লেগে যায়। তিনিই কানাইলালকে নিয়ে আসেন নাটকে। একটি সংস্কৃত নাটকে ব্রাহ্মণের স্ত্রীর চরিত্রে প্রথম অভিনয়। এরপরেও একাধিক নাটকে নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন কানাইলাল। পাশাপাশি পুরুষ চরিত্রেও অভিনয় করেছেন চুটিয়ে। ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৮ অবধি ছিলেন শিশির কুমার ভাদুড়ির পেশাদারি থিয়েটারের দলে।

নাটকে অভিনয়ের সূত্র ধরেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ১৯৩৬ সালের ২৪ জুন ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের নাট্যরূপ দেখতে এসেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ‘নবীনকৃষ্ণ’-র ভূমিকায় কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন তিনি। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতেই জোড়াসাঁকোর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন কানুবাবু। তাঁকে আশীর্বাদ করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আমি যে চরিত্র মনে করে লিখেছি, এ যেন তাই।’ 

সারা জীবনে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন কানু বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্দেশনাও দিয়েছেন সলিল সেনের লেখা ‘নতুন ইহুদী’-র মতো একাধিক নাটকে। করেছেন যাত্রাপালা, বেতার নাটকও। অভিনয়কে জাপ্টেই তাঁর বাঁচা। ১৬/২ বনমালী চ্যাটার্জি লেনের বাড়িটাতেও তাই ভিড় লেগে থাকত বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের। ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ি সান্যাল, উত্তমকুমার, তুলসী চক্রবর্তী, বিকাশ রায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, সরযূবালা, মলিনা দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, গীতা দে—কে আসেননি এই বাড়িতে? আড্ডা, গান-গল্পের পাশাপাশি চলত অভিনয়ের পাঠও। অভিনয়ের দক্ষ শিক্ষক ছিলেন কানু বন্দ্যোপাধ্যায়। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, গীতা দে তাঁর কাছে অভিনয় শিখেছেন। উত্তমকুমারও নানা সময়ে এসে তালিম নিয়েছেন তাঁর কাছে। অভিনয়-শিক্ষক হিসেবে এতটাই খ্যাতি ছিল তাঁর।  

এহেন মানুষটাই বড়ো সাদামাটা জীবন কাটিয়েছেন আজীবন। অভিনয়কে গ্রহণ করেছেন সাধকের মতো। ১৯২৭ সালে প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত নির্বাক ছবি ‘দুর্গেশনন্দিনী’-তে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে চলচ্চিত্র দুনিয়ায় প্রথম পা রাখা। চারপাশ জুড়ে তখন স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউ। কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ও জড়িয়ে পড়লেন সেই স্রোতে। তিনি এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে অভিনয় থেকে উপার্জন করা অর্থ তুলে দিয়েছিলেন গান্ধীজির হাতে।  

বাংলা রঙ্গমঞ্চ ও চলচ্চিত্রের দুর্ভাগ্য, আমাদের স্মৃতিতে এহেন মানুষটার একমাত্র পরিচিতিই হয়ে গেল ‘পথের পাঁচালী’ আর ‘অপরাজিত’-তে হরিহরের ভূমিকায় অভিনয়। সন্দেহ নেই, এই দুটি চলচ্চিত্রের সূত্র ধরেই বিশ্ববন্দিত হয়েছিল তাঁর অভিনয়, পরিচিতি বেড়েছিল। সন্দীপ রায় বলেছেন, বুদ্ধদেব বসুর ‘একটি জীবন’ নিয়ে চিত্রনাট্য লেখার সময় একটি চরিত্রে কানুবাবুকেই ভেবেছিলেন সত্যজিৎ রায়। মেকআপ-এর জন্যে স্কেচও করে ফেলেছিলেন। যদিও সেই ছবিটি আর হয়নি। হলে হয়তো আরো একটা চিরস্থায়ী চরিত্র উপহার পেতাম আমরা। কিন্তু, এর বাইরেও তাঁর যে বিপুল বিস্তৃত অভিনয়-জীবন, নির্দেশনা, অভিনয়ের শিক্ষাদান— সে’সব আমরা মনে রাখলাম কই! রুগ্ন টালা ব্রিজের একপাশে তাঁর আবক্ষ মূর্তি অবশ্য বসেছে ২০১২ সালে। আমাদের স্মৃতির রুগ্নতা তাতে ঘোচেনি।

Developed by DXDasia