ফেলে দেওয়া পাট থেকে তৈরি পুতুল মাতাচ্ছে সারা বাংলাকে

পাটের অন্য সব জিনিসের থেকে পুতুলের চাহিদা অনেক বেশি

মুর্শিদাবাদ নামটা শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে নবাবি যুগের স্মৃতি। বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ, আলিবর্দি খাঁর সঙ্গে বর্গিদের টক্কর, সিরাজউদদৌলার বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র, হাজারদুয়ারি প্রাসাদ – আরও কত কিছু। কিন্তু এতো গেল মুর্শিদাবাদ শহরের কথা। শহরের বাইরেও তো মুর্শিদাবাদ রয়েছে। মুর্শিদাবাদ জেলা। তারও ঐশ্বর্য কোনো অংশেই কম নয়। সে ঐশ্বর্যের খোঁজ পেতে গেলে ঢুঁ মারতে হবে মুর্শিদাবাদ জেলার গ্রামেগঞ্জে, তার লোকসংস্কৃতিতে। যেমন গ্রামীন মুর্শিদাবাদের পাটের পুতুল, যার খ্যাতি এখন সারা বাংলায়। খেদি নাকি, বুঁচি নাকি, চেপটি নাকি – এরকম সব নামে পরিচিত মিষ্টি দেখতে পুতুলগুলো এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, বাজারে পাটের তৈরি অন্যান্য সব জিনিসের থেকে এই পুতুলের বিক্রি অনেক বেশি।

এমনিতেই সারা বাংলা জুড়ে মুর্শিদাবাদের পাটশিল্প খুব জনপ্রিয়। পাট দিয়ে বানানো টুপি, ব্যাগ, ম্যাট, ওয়ালম্যাটের চাহিদা যথেষ্ট বেশি। তবে পাটের পুতুল যে হারে বিক্রি হচ্ছে, তা ছাপিয়ে গেছে অন্যান্য যে কোনো পাটের জিনিসকে। মজার ব্যাপার এটাই যে, পাটের অন্যান্য জিনিস বানানোর পর যেটুকু পাট অবশিষ্ট থাকে, সেটা দিয়েই তৈরি হয়ে পাটের পুতুল, যেটার কদর পাটের অন্য যে কোনো জিনিসের থেকে বেশি। প্রথম দিকে সাবেকি পাট দিয়ে পুতুল বানানো হত, তারপর পাটকে লাল, নীল, সাদা, হলুদ – নানা রঙে রাঙিয়ে দুই রঙের পুতুল তৈরি করা হয়। কালো সুতো দিয়ে আঁকা হয় পুতুলের চোখ মুখ। রঙিন পুতুল বাজারে ছাড়ার পর পাটের পুতুলের চাহিদা আরও বেড়ে যায়।

পাট দিয়ে পুতুল বানানোর সময়ে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পাটকে ব্লিচ করা হয় অথবা হয় না। ব্লিচ করা পাট দিয়ে তৈরি পুতুলের দাম বেশি। কারণ, ব্লিচ করা পাট দিয়ে বানানো পুতুল বেশি উজ্জ্বল আর চকচকে হয়। পুরুষ পুতুলের মাথায় পাগড়ি থাকে, মেয়ে পুতুলের মাথায় থাকে ঘোমটা। দু’তিন ফুট উচ্চতার পুতুল মোটামুটি ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। তার থেকে ছোটো আকারের পুতুল, যেগুলো চাবির রিং-এর জন্য মানুষ সংগ্রহ করে, তাদের দাম ৪০ থেকে ৬০ টাকা। এখন রাজ্যের সব হস্তশিল্প মেলাতে তো বটেই, কলকাতা, শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর, বোলপুর – নানা জায়গা থেকেই পুতুলের চাহিদা থাকে সারা বছর। কিছু কিছু ক্রেতা অর্ডার দিয়ে পুতুল বানিয়ে নেন। এই পাটের পুতুল মুর্শিদাবাদ জেলার মুকুটে আরেকটা পালক যোগ করেছে, সারা দেশে মুর্শিদাবাদের গৌরবকে নিয়ে গেছে অন্য মাত্রায়।

তথ্যসূত্র – মুর্শিদাবাদের পাটের পুতুল, সুশান্ত বিশ্বাস, লোকবার্তা, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
 

Developed by DXDasia