
ইন্দ্রাশিসের ছবি বাঙালির ছবি, বাঙালি কেন্দ্রিক ছবি
ইন্দ্রাশিস আচার্যের ‘ফিল্মমেকার’ পরিচয় একটা দ্বান্দ্বিকতার অভিজ্ঞান। ওঁর ছবি কি খুব একটা চোখে পড়ে? ব্যস্ত রাজপথের ট্র্যাফিক সিগন্যালে চোখ আটকে যাওয়া বিলবোর্ডে সচরাচর দেখা যায় কি সোচ্চার বিজ্ঞাপন? অথবা, খুব একটা আলোচনার কেন্দ্রে থাকা কোনো চলতি ফিল্ম কার্নিভালে, উৎসুক দর্শক আর স্বপ্রভ অভিনেতা বা পরিচালকদের গণতান্ত্রিক নক্ষত্রমালার মধ্যে থেকে কেউ কি ওঁকে খুঁজে নিয়েছেন কখনও? মনে হয় না। মাসান্তে কখনও কোনো সাময়িকপত্রের পৃষ্ঠায় ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দু-একটা সাক্ষাৎকার, আসলে ওই এক ধরনের দ্বান্দ্বিকতাকে ধরতে চাওয়া। আদতে ওঁর জীবনীর টুকরোটাকরা আলোচনার মধ্যে দু-একটা ছবির রেফারেন্স। কেন ছবি বানাতে এলেন, চাকরি এখনও করেন কিনা, চলচ্চিত্র জগতের ভিতরের রাজনীতি, পছন্দের প্রেক্ষাগৃহ না পাওয়ার মসলাদার কিসসা, ছবির ব্যবসা প্রসঙ্গে বিবিধ চর্চার যতিচিহ্ন হিসেবে আসে ছবির আলোচনা। ছবি গৌণ, পেজ থ্রি-র রগরগে কনটেন্ট মুখ্য।
ইন্দ্রাশিস আচার্যের সিনেমা নিশ্চিতভাবেই বাঙালির ছবি। বাঙালি কেন্দ্রিক ছবি। শহরের মননের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকা ছবি। বাঙালির প্রতিদিনের বিবিধ টানাপোড়েনকে ইন্টেলেকচুয়ালাইজ করা ছবি।
অথচ, সকলের অগোচরেই হয়তো একটা অন্যরকম সিনেমার ভাষা তৈরি করতে পেরেছেন ইন্দ্রাশিস। সকলের মধ্যে দর্শক, সমালোচক, ওঁর সতীর্থ আরও অখ্যাত অথবা বিখ্যাত পরিচালক সকলকেই ধরে ফেললাম। বাঙালি আধুনিকতার যে চলতি বয়ান, তাকে বিশ্বের বয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পেরেছেন ইন্দ্রাশিস। আগে চলতি বয়ানের প্রসঙ্গে বলি, তারপর বিশ্বের বয়ানের প্রশ্নে বিস্তারে আসব। চলতি আধুনিকতার বয়ানে ধরা পড়ে আমরা কীরকম ভাবে বেঁচে আছি সেই গল্প। বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে একবিংশের পঁচিশ বছর কেটে গিয়েছে। এই ‘সময়’-এর ন্যারেটিভে প্রযুক্তির প্রসঙ্গ নিয়ে আসছি না আপাতত। সে আলোচনায় আমার অধিকার নেই। শুধু বলছি গল্প চয়নের কথা। গত কয়েক দশকে আমাদের জীবনের ধাঁচাগুলো বদলে গিয়েছে বিলকুল। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙেচুরে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে বাধ্যত আলাদা অথবা স্বভাবত স্বাধীনচেতা মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়ির ছেলেমেয়েরা। প্রজন্মের উপলব্ধিগত পার্থক্য বাড়তে বাড়তে একসময় যোগাযোগ অসম্ভব হয়ে পড়েছে প্রায়। পাড়া থেকে শোওয়ার ঘর, চাকরি থেকে খাদ্যাভ্যাস, আত্মীয়তা অথবা সম্পর্কের বিন্যাস সবকিছুই আমূল বদলে গিয়েছে। আজকের ‘সিরিয়াস’ বাংলা ছবিতে এইসব ধরা পড়ে স্বভাবতই। আর এই শহরের ছবি, শহর নিয়ে ছবি, শহরের দর্শকের জন্য ছবি, মাল্টিপ্লেক্স-মুখী ছবি–এরাই নব্য বাঙালি আধুনিকতার একটা বয়ান আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন সাম্প্রতিক শহুরে বাংলা ছবিতে।

ইন্দ্রাশিস আচার্যের সিনেমা নিশ্চিতভাবেই বাঙালির ছবি। বাঙালি কেন্দ্রিক ছবি। শহরের মননের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকা ছবি। বাঙালির প্রতিদিনের বিবিধ টানাপোড়েনকে ইন্টেলেকচুয়ালাইজ করা ছবি। যে সব অনুষঙ্গ ইন্দ্রাশিস নিয়ে আসেন ওঁর ছবিতে তার সঙ্গে দিব্যি পরিচিত আজকের শহরে ফিল্ম সোসাইটি করা মানুষেরা। তবু, ইন্দ্রাশিসের ছবিকে আলাদা করে দেখতে চাইছি কেন? দেখতে চাইছি আসলে ওই বিশ্বের আধুনিকতার প্রেক্ষিতে। এখানে একটা তাত্ত্বিক নিরিখের অবতারণা প্রয়োজন। আধুনিকতা কী আর তার বিস্তার কেমন এই বিষয়ে জটিল আলোচনা রয়েছে। সেই প্রসঙ্গ এখানে আলোচনা করতে হলে পরিসর কম পড়বে। শুধু একটা কথা বলি, আধুনিকতার ধারণার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী লেপটে রয়েছে এক ধরনের নিশ্চয়তা বা সার্টেইন্টি-র ধারণা। অর্থাৎ, আধুনিকতা আদতেই একটা কাঠামো যার ভিত্তিতে রয়েছে যুক্তি, বিজ্ঞান, আর আইনের নিষ্ঠ বাঁধুনি। আধুনিকতার চর্চা মাত্রই এই কাঠামোর প্রজ্ঞায় নিজের লব্ধজ্ঞানকে যাচাই করে নেওয়া, অথবা মিলিয়ে নেওয়া। আধুনিকতা একটা সহজ ফর্মুলা দিয়েছে, সেই সূত্র মাফিক চিন্তা করলে একটা নিশ্চিত পরিণতিতে পৌঁছনো সম্ভব। এই আখ্যানের শেষে ক্রেডিটস হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সত্য অথবা ট্রুথ। আর সেই গন্তব্যে পৌঁছনোর পথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে ওই কাঠামো। অর্থাৎ, জীবন যেমন সমস্যাই আমার সামনে এনে দাঁড় করাক, আমি আমি জানি জানি চোরাবালি কতখানি। আমার এই জানাটাই আদতে আধুনিকতার বৈশ্বিক বয়ানের প্রতি আমার আস্থার সূচক।
‘নীহারিকা’ ছবিটা মনে করুন। অথবা, ‘পিউপা’। দর্শককে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে দিতে চাইছেন না পরিচালক। তাকে ধরে রেখেছেন একটা প্রায় অচল ফ্রেমের মধ্যে অনেকক্ষণ। চিন্তা করতে বাধ্য করছেন, বাধ্য করছেন নিজের চিন্তাকে ফিরে পড়তে।

ঠিক এইখানেই ইন্দ্রাশিসের ছবির ভাবনার তফাৎ বাকি আর পাঁচজন বাঙালি ফিল্মমেকার-এর থেকে। বেঁচে থাকার সমস্যার আধুনিক সমাধানের বা নিশ্চিত পরিণতির প্রতি আস্থা রাখতে পারেননি ইন্দ্রাশিস। প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সুতোগুলো একসাথে জড়ো করে কোন বার্তা ইন্দ্রাশিসের ছবি আমাদের দিয়ে উঠতে পারে না কিছুতেই। ‘পার্সেল’ হোক অথবা ‘নীহারিকা’, ইন্দ্রাশিসের ছবি আমাদের একটা নিশ্চিন্ত সমাপ্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে না, একটা বিনবিনে অস্বস্তির কাঁটা বিঁধে থাকে চিন্তায়। আর এই পরিণতির অনুপস্থিতির ভিতরে দিয়ে উত্তর-আধুনিক কোনো জটিল প্রস্থানের দিকে দর্শককে চালিত করতে চান না ইন্দ্রাশিস। বিশ্বের আধুনিকতার কথা বলেছি খানিক আগে। সে কোনো একরকমের সূত্র নয় অবশ্য। আধুনিকতার বয়ানকেই বারবার বিবিধভাবে ভেঙে নিয়েছেন কখনও পোল্যান্ড, অথবা স্পেন, কখনও তুর্কি, কখনও জাপান অথবা হংকঙের চলচ্চিত্র পরিচালকেরা। একটা নির্দিষ্ট পরিণতির বা ফর্মুলার প্রতি আস্থা না রেখে এঁরা বরং আস্থা রেখেছিলেন একক মানুষের অন্তর্নিহিত অসঙ্গতি বা কন্ট্রাডিশনের উপর।
আরও পড়ুন: পৃথক বৃত্তের চলনে নীহারিকার ইতিবৃত্ত

পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য
দোলাচল অথবা অপরিণতি আধুনিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত, আবার তাকে প্রতিহত করে বারবার। মানুষের ‘হিউম্যান এলিমেন্ট’-কে খুঁচিয়ে দিয়ে একটা বা একাধিক ট্রোপ ব্যবহার করে কাহিনির বিন্যাস ঘটান। ইন্দ্রাশিস এই ঘরানার চলচ্চিত্রকার। অতলান্ত বিষাদের ট্রোপ ব্যবহার করে তিনি একটা নিজস্ব ছবির ভাষা তৈরি করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। পরিণতির প্রতি খুব মন নেই পরিচালকের, বরং আজন্ম লালিত কিছু বিশ্বাস বা ধারণা অথবা অভ্যাসকে এই বিষাদের নলের ভিতর দিয়ে ক্রমাগত দর্শকের মস্তিষ্কে সিগন্যালের মতো পাঠাতে থাকেন ইন্দ্রাশিস। বিষাদ ওঁর উদ্দেশ্য নয়, বিষাদ যে ক্ষরণের জন্ম দেয় তার দিকে নির্দেশ করাই ওঁর অভিপ্রায়। ছবি ক্রমাগত জটিল হয়, অথচ নিশ্চিত ফর্মুলায় ধরা দেয় না, ক্যাথারসিসের প্রশ্রয় পাওয়া হয়ে ওঠে না, গল্পের চেনা ছকের ভিতরে থেকেও কিছুতে মনকে আশ্বাস দেয় না, এই বুঝি ইন্দ্রাশিসের দর্শকের একটা নালিশ থেকে যাবে অনিবার্যভাবে। ‘নীহারিকা’ ছবিটা মনে করুন। অথবা, ‘পিউপা’। দর্শককে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে দিতে চাইছেন না পরিচালক। তাকে ধরে রেখেছেন একটা প্রায় অচল ফ্রেমের মধ্যে অনেকক্ষণ। চিন্তা করতে বাধ্য করছেন, বাধ্য করছেন নিজের চিন্তাকে ফিরে পড়তে। অস্বস্তির স্বেদ জমে দর্শকের কপালে। অথচ, বিষাদের অতলে তলিয়ে যাওয়ার লার্স ভন ট্রিয়ার মার্কা উদ্দেশ্য বিন্দুমাত্র নেই পরিচালকের। উত্তর কলকাতার শীতকালের হালকা চাদরে মোড়া সন্ধ্যার বিষণ্ণতা শুধুমাত্র বিলুর উদ্দেশ্যে ফ্রেমবন্দি করছেন না পরিচালক। করছেন দর্শকের জন্যও। হালকা শহুরে কুয়াশার দোলাচল একাধারে তাকে লুকোনোর স্পেস দেয়, আর অপরদিকে তার স্বস্তির বোধকে বিরক্ত করে চলে।
ইন্দ্রাশিস পরিচালক হিসেবে জটিল। আধুনিক নিশ্চিত, তবে আধুনিকতাকে সূত্র নির্দেশের জামার মতো গায়ে চড়িয়ে রাখেন না তিনি। না নিজের গায়ে, না দর্শকের গায়ে। বাংলা ছবির দর্শকের প্রতি ওঁর এই শ্রদ্ধার বোধ দর্শক ওঁকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন আশা রাখি।

