‘সোনার কেল্লা’-য় অভিনয় করার পর ‘জটায়ু’ হিসেবেই বাঙালি দর্শকের মনে জায়গা করে নেন তিনি
পেশায় দোর্দণ্ডপ্রতাপ আইনজীবী, তারই মধ্যে অভিনয়ের প্রতি অমোঘ প্রেম। ফেলুদার ছায়াসঙ্গী জটায়ুর কথা বললে তাঁর মুখই ভেসে আসে বাঙালির মনে। অথচ ফেলুদার ছবি তো তিনি করেছিলেন মাত্র দু’টো। সন্তোষ দত্তের শিল্পীসত্তা ছিল বহুমুখী, বৈচিত্র্যময়। আজ তাঁর জন্মদিন।
সন্তোষ দত্তের জন্ম হয়েছিল ঢাকায়। কলকাতায় এসে যখন ওকালতি শুরু করেন, তখনও দেশভাগ হয়নি। ছোটোবেলা থেকেই ছিলেন ফুটবল আর নাটকের ভক্ত। থিয়েটারে যোগ দিয়েছিলেন তরুণ বয়সেই। সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশ পাথর’-এর মাধ্যমে রুপোলি পর্দায় আসা। তারপর ‘হেড মাস্টার’, ‘তিন কন্যা’, ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ – একের পর এক ছবিতে তাঁর দুর্দান্ত উপস্থিতি।
১৯৭৪ সালে ফেলুদাকে নিয়ে প্রথম সিনেমা ‘সোনার কেল্লা’-য় অভিনয় করার পর ‘জটায়ু’ হিসেবেই বাঙালি দর্শকের মনে জায়গা করে নিলেন তিনি। সত্যজিৎ রায় ফেলুদা সিরিজের বইগুলোতে জটায়ুর ছবিও পাল্টে ফেলেছিলেন তাঁর জন্য। সন্তোষ দত্ত মারা গেলে, সত্যজিৎ ঠিক করেছিলেন, ফেলুদাকে নিয়ে আর সিনেমা বানাবেন না। আর কোনো অভিনেতাকেই জটায়ুর চরিত্রে তাঁর মনে ধরেনি।
ওকালতির চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যেই অভিনয়ের সময় বের করে নিতেন সন্তোষ দত্ত। অনেক সময়েই মামলার দিনে শুটিং পড়ত। তখন বিপক্ষের উকিলের সঙ্গে কথা বলে সব দিক সামলে নিতেন। অন্যান্য উকিলরাও সাহায্য করতেন তাঁকে। ‘সোনার কেল্লা’-র শুটিং-এ তাঁকে এক মাসের জন্য রাজস্থানে যেতে হবে, অথচ, এক খুনের মামলার শুনানির তারিখ পড়ল রওনা হওয়ার দিনই। সন্তোষ দত্ত তখন মামলা মুলতুবির অনুরোধে নিয়ে ফোন করলেন বিপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটরকে। সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করে মানিয়ে নিলেন পাবলিক প্রসিকিউটিরও। দু’পক্ষের উকিল অনুরোধে করায় সেই মামলার বিচারকও মামলার তারিখ পিছিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সন্তোষ দত্ত ঠিক সময়েই অভিনয় করতে গেলেন। আমরাও উপহার পেলাম আমাদের প্রিয় জটায়ুকে।
অবশ্য, জটায়ু ছাড়াও এমন অনেক চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন, যেগুলোর জন্য তিনি অমর হয়ে থাকবেন। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-র অবলাকান্ত, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর দুই রাজাকে আমরা কি ভুলতে পারব কখনও? এছাড়া, ‘মহাপুরুষ’, ‘চারমূর্তি’, ‘মর্জিনা আবদুল্লা’, ‘জনঅরণ্য’ – একের পর এক ছবিতে তাঁর অভিনয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন সিনেপ্রেমীরা।
তথ্যসূত্র –
১. ‘কোনও প্রশ্ন নয়’ দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের নেওয়া অশোক বক্সীর সাক্ষাৎকার, আনন্দবাজার পত্রিকা
২. ‘নিঃস্বার্থ ভাবে যারা বিলিয়ে গিয়েছেন হাসি আর হাসি’, স্পোর্টস এন স্ক্রিন।
