নারীশিক্ষায় এখনও পিছিয়ে এই দেশ

আজ জাতীয় শিক্ষা দিবস

নারীশিক্ষার (women’s education) গুরুত্ব, তার সেকাল ও একাল; সেকাল কী, একাল কী – এমন সব তর্কের মীমাংসা হওয়া শক্ত। তারপরও থাকে ভৌগোলিক সীমার প্রশ্ন, থাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক জিজ্ঞাসা। সব সরিয়ে আমরা এদেশের নারী শিক্ষার হালচাল নিয়ে কথা বলি, তেমন কথায় একাল থেকে সেকাল অবধি যাতায়াতও করা যায়।

একটি আফ্রিকান প্রবাদ অনুযায়ী, যদি কোনও পুরুষকে শিক্ষিত করা হয় তাহলে শিক্ষিত হয় এক ব্যক্তি, আর যদি কোনও মহিলাকে শিক্ষিত করা হয় তাহলে শিক্ষিত হয় এক জাতি। একই সঙ্গে স্মরণ করছি নেহরুজির কথা। তিনি বলেছিলেন, কোনও দেশের স্ট্যাটাস বোঝা যায় সে দেশের মহিলাদের শিক্ষার হাল দেখে।

এটাই নারীশিক্ষার প্রধান গুরুত্ব।

বৈদিক যুগের গোড়ায় নারীশিক্ষায় সমাজের সানন্দ সম্মতি ছিল মেনেও বলা যায় যে ঐ যুগের মধ্য বা শেষ পর্বে দ্রুত তা হারাতে থাকে। মৌর্য বা গুপ্ত যুগেও পরিস্থিতি ছিল একই রকম। মহামতি চাণক্যও নারীশিক্ষার পক্ষে ছিলেন না। সম্রাট অশোক তাঁর মেয়ে সংঘমিত্রাকে পাঠিয়েছিলেন সিংহলে (শ্রীলঙ্কা) কিন্তু তা সংঘমিত্রার শিক্ষার মান বিবেচনা করে নাকি কূটনৈতিক কারণে তা স্পষ্ট নয়। মুঘল যুগেও নারীশিক্ষার আয়োজন তেমন ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্রও তাঁর লেখায় মুঘলযুগের সাহসী নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন কিন্তু তাঁরা কেউ শিক্ষায় উজ্জ্বল ছিলেন এমন কথা বলেননি।

মনুবাদীরা বিশ্বাস করেছেন যে, মেয়েরা শৈশবে থাকবে পিতার অধীন, বিবাহিত মেয়েরা থাকবে স্বামীর অধীন আর তারা বার্ধক্যে থাকবে পুত্রের অধীন। এই বিশ্বাস যুগে যুগে সামাজিক মান্যতা পেয়েছে। শিক্ষা তথা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকায় ভারতীয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এভাবেই নির্ধারিত হয়েছে মেয়েদের স্ট্যাটাস।

ব্রিটিশরা বলতেন, ভারতীয়রা ইতিহাস-বিস্মৃত জাতি। সে যুগেও কী নারীশিক্ষা গুরুত্ব পেয়েছে?

প্রথম বাংলা উপন্যাস রচনা করেন এক মহিলা (যদিও জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন এক বিদেশিনী)। তখন তরু দত্ত ইংরেজিতে কবিতা লিখেছেন, কাদম্বিনী গাঙ্গুলি ডাক্তার হয়েছেন (যদিও অবলা বসুকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ ভর্তি নিতে অস্বীকার করে) তবু, মানতেই হবে যে সে আমলেও নারীশিক্ষায় দেশ (women s Education in India) তেমন এগোয়নি। ১৯৫১ সালের জনগণনার হিসেবে মেয়েদের সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৯%।

মেয়েদের নিজেদের চেষ্টারও ঘাটতি ছিল। ‘লজ্জাই নারীর ভূষণ’ জাতীয় গপ্পে তাঁরাও (অন্তত গরিষ্ঠ অংশ) ভুলে থাকতেন। পুরুষশাসিত সমাজ প্রচার করত স্ত্রী-সঙ্গ তৈলাক্ত মাছ-মাংসের মতো পরিত্যজ্য। সে সমাজ কুমারীপুজোয় গুরুত্ব দিত কিন্তু বাল্যবিবাহ, বিধবাবিবাহ বা পণপ্রথায় আপত্তি তোলেনি এবং সমাজ অনায়াসে সমর্থন জুটিয়েছে তার অন্তঃপুরবাসিনীদের কাছ থেকে।

জ্যোতির্ময়ী দেবী লিখেছেন, ‘বিদ্যার সঙ্গে মেলামেশা নাহলে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না… বিদগ্ধতার বহুমুখী বিশেষত্বগুলি অর্জিত হয় না… পরাজিত নারী নামের মানুষটা যায় কোথায়? সেইটেই হল সমাজের নিষ্ঠুর অনুশাসনে মানুষের জীবনের অপচয়ের দিক।

এই অপচয়ের জগতই হল নারীজগত। (জ্যোতির্ময়ী দেবী রচনা সংকলন, ৪; পৃ ১২৭-৯)।

এই অপচয় রুখতে চাই আন্দোলন। সমাজের নিষ্ঠুর অনুশাসনে পরাজিত নারীর জীবনের অপচয় আটকাতে চাই ভালোমানের কার্যকর শিক্ষা। অন্যরা কেউ অপচয়রোধের এই কাজটা করে দেবে তা হয় না, মেয়েদেরই করতে হবে। করছেও। তবে তা বুঝি যথেষ্ট নয়। ২০১১ সালের জনগণনা তথ্য অনুযায়ীও সাক্ষরতায় (সাক্ষরতা নিশ্চয় সুশিক্ষার সূচক নয়, কিন্তু সে একটা মাইলস্টোন তো বটে) মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে বেশ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। সেকালের নিষ্ঠুর অনুশাসনের সাথে যুক্ত হয়েছে একালের নানা সমস্যা। ‘মহানগর’-এর কাল গিয়েছে বটে, কিন্তু এখনও তো ‘চারুলতা’-দের পাচ্ছি না।

নারী আন্দোলনের লক্ষ্য যদি হয় নারী হয়ে ওঠা তবে আর আন্দোলন কেন, কিছু সংস্কারই যথেষ্ট; আর যদি লক্ষ্য হয় পুরুষ হয়ে ওঠা তাহলে সে এক অশুভ সংকল্প যা আগুন জ্বালাতে পারলেও বনসৃজনে সক্ষম হবে না।

নারীশক্তির অপচয় রুখতে আন্দোলন হোক, আন্দোলন হোক মানুষ হয়ে ওঠার।

 

Developed by DXDasia