গরমে মিছরির শরবৎ মানে একাটাই নাম – দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি

সর্দি-কাশি নিরাময়ে দুলালের তালমিছরির কোনোও তুলনা নেই

কাহিনিটা আজকের নয়, প্রায় এক শতাব্দী ধরে এ বাংলার শহুরে এবং গ্রামীণ জনতার পুষ্টির খোঁজ রাখছে তাঁর সামগ্রিটি। না ছিল কোনো নিয়োগ করা বিক্রয়কর্মী, না কোনো নামী লোকের বিজ্ঞাপন, তাঁর সৃষ্টিকে প্রচার করার জন্য এসব কিছুরই প্রয়োজন অনুভব করেননি তিনি। অথচ তাতে বিক্রির বাজারে জায়গা কাড়তে পারেনি কেউই। এমনকি আজকে ইন্টারনেট-এর যুগে, যখন বিশ্ব লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে চলেছে, তখনও তাঁর বাজারে চাহিদা পরেনি একটুও। এখনও রমরমিয়ে নিজের বাজারটা ঠিকই ধরে রেখেছে। কথা হচ্ছে দুলালবাবুকে নিয়ে এবং অবশ্যই তাঁর বিখ্যাত দ্রব্য ‘তালমিছরি’ (খেজুরের চিনি) নিয়েও।  ঝকঝকে মুখ, কামানো দাড়ি, মাথায় টাক এবং মুখে অমলিন হাসি, ইনিই আমাদের চির পরিচিত দুলাল চন্দ্র ভড়। তাঁর নামেই পুরানো-ধাঁচের কাচের বোতলে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ‘দুলালের তাল মিছরি’।

সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমকালীন। বাংলার ব্যাবসায় তখন লাভের মুখ দেখছেন কাপড় ব্যবসায়ীরা, উন্নতি হচ্ছে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে। হাওড়া হাটে ছিল কাপড় ব্যাবসার অনেক দোকান। দুলাল চন্দ্রেরও পারিবারিক ব্যাবসা ছিল কাপড়ের। যে সময়ের কথা হছে তখন দুলাল চন্দ্রের বয়স তখন কৈশোরের শেষের দিকে তিনি এসময়ে প্রায়ই তাঁর বাবা-কাকাদের সঙ্গে দোকানে যেতেন ভিড়ের সময়  হাতে হাতে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু কিছুতেই মন বসছিল না তার, মনের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করতে থাকে, সিদ্ধান্ত নেন নিজে কিছু করবেন। সেই সময়ে তিনি বিক্রি করতে শুরু করলেন সাদা মিছরি (চিনির স্ফটিক)। কমদিনের মধ্যেই সেকালের শহরে পণ্যটির ব্যাপক চাহিদা তৈরি করলো। এবং ক্রমেই তাঁর ব্যবসার উন্নতি ঘটতে শুরু করে। ফলে ব্যাবসায়ী মহলে তাঁর সমৃদ্ধ হতেও খুব বেশি সময় লাগলো না। তবে, দুলাল চন্দ্র মোটেই এই স্বল্প খ্যাতির ভরসাতে নিশ্চিন্তে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। খুব শীঘ্রই তিনি আবার তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলেন এবং মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো আবার নতুন কিছুতে হাত লাগানোর চেষ্টা।

ভড় পরিবার ছিলেন হুগলি জেলার রাজবলহাটের বাসিন্দা। সেখানে তাদের প্রচুর জমিজমা ছিল। চার বিঘা জমির অপর ছিল তাদের বিশাল বাসস্থান। তাঁদের বসতবাড়ির সীমানার মধ্যে অনেক তালগাছ ছিল এবং দুলাল চন্দ্র এখানেই খুঁজে পেলেন মিছরি তৈরির কাঁচামাল। খেজুর থেকে নিষ্কাশিত গুড় ছিল ‘মিছরি’ তৈরির প্রধান কাঁচামাল। খেজুরের কাত তোলা হয় চৈত্র মাস (মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে) এবং জৈষ্ঠের শেষের মধ্যে (জুন মাসের মাঝামাঝি)। এরপর তাকেই প্রক্রিয়াজাত করে মিছরি তৈরি করা হয়। ১৯৩৪ সাল। দুলাল চন্দ্র ভড় তার নতুন উদ্যোগ শুরু করলেন। বাজারে ছড়িয়ে পড়লো দুলালের তাল মিছরি। শুরু নতুন সাফল্যের পথ চলার গল্প। তারপর থেকে আজ অবধি ৮৮ বছর ধরে রমরমিয়ে বাজার ধরে রেখেছে কোম্পানিটি। বছর দশেক পর ১৯৪৪ সালে কোম্পানিটি পাকাপাকি ভাবে নথিভুক্ত হয়। কাশি এবং সর্দির মতো রোগ নিরাময়ের জন্য দুলাল চন্দ্র ভরের তাল মিছরির কার্যকারিতার কোনো তুলনাই ছিলনা গ্রাহকদের কাছে। দুলালের তাল মিছরি বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে বিহার, উড়িষ্যা, আসাম এবং গুজরাটের মতো প্রতিবেশী রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও তাল মিছরির খুব ভালো বাজার রয়েছে। ক্রেতারা অগ্রিম অর্থ দিয়েও মিছরির জন্য অর্ডার দেন এবং সময়মতো তাদের কাছে পৌঁছায় তাল মিছরি। অনেকেই মিছরির অর্ডার দেওয়ার জন্য বড়োবাজারে তাদের সিটি অফিসেও জগাজগ করেন।

দুলাল চন্দ্র ভড়

কিন্তু দুলালের ‘তালমিছরি’-র এত বেশি চাহিদার কারণ কী?

কারণটা সহজ। মিছরি তৈরির জন্য তমলুক থেকে খাঁটি খেজুরের গুড় সংগ্রহ করা হতো। বিকল্প হিসেবে কোনো সস্তা বা নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করা হতো না। তবে দুলালের তাল মিছরির মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনোভাবেই জায়গা ছাড়েননি নির্মাতারা। পালমাইরা তালগাছের দ্রবণ থেকে গুড় তৈরি করতে হয়। তারপর এটি একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় না পৌঁছানো পর্যন্ত ড্রামে সেদ্ধ করা হয়। সেদ্ধ হয়ে গেলে এটি পাত্রে ঢেলে দেওয়া হয় এবং প্রায় এক সপ্তাহ শুকানোর জন্য রেখে দেওয়া হয়। এই সাত দিনের মধ্যে, উপরের এবং নীচের স্তরগুলি শুকিয়ে গিয়ে স্ফটিক হতে শুরু করে। এবং এই শুকিয়ে যাওয়ার পর যে ক্রিস্টালাইজড আকারটি তৈরি হয়, সেটিই হল মিছরি যা তারপর কেটে প্যাকেট করে বিক্রি করা হয়।

কৈখালীতে দুলালবাবুদের কারখানায় মিছরি তৈরি হয়। দুলাল চন্দ্র যতদিন বেঁচে ছিলেন, প্রতিদিন তিন ট্রাক ভর্তি মিছরি পাঠাতে হতো ক্রেতাদের জন্য। দুলালের তালমিছরির সেই চাহিদা আজও অপরিবর্তিত রয়েছে। কিন্তু দুলাল চন্দ্রের জন্য এ উন্নতির পথ কখনোই মসৃণ যাত্রা ছিল না। তাঁর জীবদ্দশাতেই, তিনি তার ভাই সনাতনের সাথে আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। সমস্যাটি ছিল পণ্যটির ব্র্যান্ড নাম নিয়ে, যা বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। অবশেষে আদালতে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়।

দুলাল চন্দ্র ভড় প্রমাণ করেছিলেন বাঙালিদের কেবল ব্যবসায়িক দক্ষতাই নয়, অজানা অঞ্চলগুলি অন্বেষণ করার এবং তাদের অবিচ্ছিন্ন উপায়ে তাদের ছাপ রেখে যাওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে।

প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন

Developed by DXDasia