তাই এই অনাবিল সুন্দরকে মনে মেখে ফেলাই বোধ হয় বুদ্ধিমানের কাজ

ইতালির পশ্চিমদিকে ভূমধ্যসাগরের প্রায় কোল ঘেঁষে পাহাড়ে ঘেরা তাসকানি উপত্যাকার অন্তর্গত একটি ঐতিহ্যবাহী শহর পিসা। আমরা পিসা গিয়েছিলাম ডিসেম্বর মাসের কোনও এক সকালে। রেলপথে তাসকানি উপত্যাকারই অন্য আরেকটি শহর ফ্লোরেন্স থেকে মোটামুটি ঘন্টাখানেকের মধ্যে পিসা পৌঁছনো যায়। ঘন্টাখানেকের এই যাত্রাপথে চোখে পড়ল পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে সাজানো সুন্দর বাগানঘেরা ছোট ছোট বাড়ি আর প্রত্যেকটি বাগান থেকে উপচে পড়া কমলালেবুর ঢল।

কী করে যাবেন
ইতালির যে কোনও বড় শহর থেকে রেলে পিসা সেন্ট্রাল স্টেশনে পৌঁছনো যায়। এ ছাড়া পিসার গ্যালিলিও গ্যালিলি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে বাসে করে পিসা শহরে পৌঁছতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
থাকার জন্য পিসার মিনারের কাছাকাছি অনেক হোটেল পাওয়া যায়। www.booking.com ওয়েবসাইট থেকে অনলাইন বুকিং করতে পারেন।

স্টেশন থেকে বেরোতেই দেখলাম রাস্তার ধারে সারিসারি বাড়ি আর প্রচুর কমলা লেবুর গাছ। স্টেশনের সামনের রাস্তাটি দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে কয়েকটি বাঁক নেওয়ার পর প্রথম দর্শন মিলল পিসার বহু চর্চিত হেলানো মিনারটির। ছোটবেলায় পড়েছিলাম এই মিনারটির উপর থেকেই নাকি গ্যালিলিও পৃথিবীর অভিকর্ষ বল সংক্রান্ত তাঁর বিখ্যাত পরীক্ষাটি করেছিলেন। যদিও পরে বুঝেছিলাম ওটা নিছকই একটা গল্প। যাই হোক রাস্তা পার করে মিনারের কাছে গিয়ে দেখলাম থিকথিকে ভিড়। সবাই ব্যস্ত বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে। মিনারের সংলগ্ন ক্যাথিড্রাল এবং মিউজিয়াম। তাই ওই তিনটি জায়গার টিকিট একসাথে কেটে নির্ধারিত সময়ে প্রবেশ করলাম মিনারের ভিতর। মিনারের ভিতরটা বেশ অন্ধকার। যদিও দেওয়ালের জানলাগুলো থেকে আলো এসে তা অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা। পাথরের তৈরি বিশালাকার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে যত উপরে উঠতে লাগলাম, সিঁড়ির বেধ তত সংকীর্ণ হতে লাগল। আর একেবারে উপরের স্তরে সিঁড়িগুলি এতটাই সংকীর্ণ যে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায় না। এমনকি একটি সিঁড়িতে পা রেখে তার পরবর্তী সিঁড়িতে পা রাখার জন্য শরীরকে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় থাকে না। সর্বোপরি মিনারটি একদিকে হেলে থাকার জন্য ওই সর্পিলাকার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রচণ্ড রকম মাথা ঘুরতে থাকে। প্রথমে যে শক্তি ও উদ্দীপনা নিয়ে সিঁড়িগুলি দিয়ে উঠতে শুরু করেছিলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই তাতে ভাঁটা পড়ল। তখন একটাই রাস্তা। দেওয়ালের গায়ের জানলার পাশে একটু জিরিয়ে নেওয়া আর সিদ্ধান্ত নেওয়া যে এবার ওপরে না উঠে নিচেই নেমে যাবো। স্বামীর দিকে চেয়ে দেখলাম তাঁর উদ্দীপনা বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি। তাঁকে দেখেই অনেক কষ্টে জেদের বশে পৌঁছলাম মিনারের মাথায়। ভাগ্যিস উঠলাম। নইলে মিনারের মাথা থেকে পাহাড় ঘেরা পিসা শহরকে দেখে মুগ্ধ হওয়াটা এ জীবনে আর হয়ে উঠত না।

এরপর মিনার সংলগ্ন মিউজিয়াম ও ক্যাথিড্রাল ভ্রমণের পালা। দেওয়ালের নানান ধরণের তৈলচিত্র সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। এসবের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল প্রাচীনকালে পিসার নাবিকদের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির সাক্ষ্যবাহী চিত্রগুলি। নানা ধরণের প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহ ছিল সেগুলোয়। লোমগার্ড, এমিলিয়ান, বাইজানটাইন এবং ইসলামিক শিল্পসামগ্রীগুলি আলাদাভাবে নজর কাড়ে। চারদিক ঘেরা অট্টালিকার মধ্যে এক টুকরো বাগানে টের পাওয়া যায় যত্নের ছোঁয়া।

মিউজিয়াম আর চার্চ ঘুরে এবার ফেরার পালা। এবার রেলপথটা শুধু পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নয়। একদিকে বিশালাকার পাহাড় আর অন্যদিকে দিগন্তবিস্তৃত ভূমধ্যসাগর। এই রেলপথের বেশ খানিকটা গিয়েছে পাহাড়ের সুড়ঙ্গ দিয়ে। এখানে সমুদ্র আর পাহাড় মিলে মিশে একাকার। মনে হচ্ছিল ট্রেনটা একটু বেশিক্ষণ কোথাও দাঁড়ালে ভালো করে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ভোগ করতাম। ট্রেনের গতির তালে তাল মিলিয়ে এই সৌন্দর্যকে লেন্স বন্দি করার চেষ্টা বৃথা। তাই এই অনাবিল সুন্দরকে মনে মেখে ফেলাই বোধ হয় বুদ্ধিমানের কাজ। নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম ঐ পাহাড় আর বিপুল জলরাশির দিকে। একের পর এক সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে ট্রেন এগিয়ে চলল আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে।

Developed by DXDasia