খোদ কলকাতাতেই একসময় দেবী সরস্বতীর পুজো হতো শুধুমাত্র কামকলায় সিদ্ধিলাভ করার মানসে
সরস্বতী পুজো এলেই সক্কাল সক্কাল উঠে স্নান সেরে অঞ্জলি দেওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। যে বাড়িতে পড়াশোনার চল আছে, ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যায়, সে বাড়িতে সরস্বতী পুজো মানে এলাহি ব্যাপার। ষোড়শোপচারে পুজোয় বসেন পুরুত ঠাকুর, অঞ্জলির সময় সেই চেনা প্রণাম মন্ত্র সুর করে উদাত্ত কণ্ঠে বলে চলেন – ‘জয় জয় দেবী চরাচরসারে, কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে…’। আমরা অনেকেই সুবোধ বালকটির মতো হাতে বেলপাতা নিয়ে সেই মন্ত্র আউড়েই বড়ো হয়েছি। বহুদিন পর্যন্ত এই ‘কুচযুগ’-এর মানে ঠিক কী তা ঠাহর করা দুঃসাধ্য ছিল। আদিযুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ জেনেছি, কিন্তু কুচযুগ কী বস্তু তা অনেক পরে অভিধান ঘেঁটে বোঝা গেছে।
বিদ্যার দেবী বলে যে একটা গুরুগম্ভীর আবহ তৈরি করা হয় সরস্বতীকে নিয়ে, তা ঠিক কবে থেকে চেপে বসলো হিন্দু সমাজে? এদিকে বাঙালিরা সরস্বতী পুজোকে বাঙালির ভ্যালেন্টাইন বানিয়ে ছেড়েছে। সরস্বতী এখন প্রেমেরও দেবী। বিদ্যা-শিক্ষার বাতাবরণের পাশে কেমন একটা ‘কাম’ গন্ধ যেন সরস্বতীকে ঘিরে। এখনই একে ‘ট্যাবু’ করে সরিয়ে রাখলে মুশকিল আছে। কারণ খোদ কলকাতাতেই একসময় দেবী সরস্বতীর পুজো হতো শুধুমাত্র কামকলায় সিদ্ধিলাভ করার মানসে। ইতিহাস কথা বলে। সরস্বতী বিদ্যার দেবী তো বটেই, সেই বিদ্যা যে আসলে শাস্ত্রে বর্ণিত চৌষট্টি কলার সমাহার। ‘ছয়-ছ’ বিদ্যালাভের জন্য ধুমধাম করে সেকালের কলকাতার যৌনপল্লিতে পূজিতা হতেন সরস্বতী। ছলনা, ছেলেমি, ছেনালি, ছ্যাঁচড়ামি, ছাপানো, ছেমো এই ‘ছয়-ছ’ বিদ্যা শেখাতেন দেবী সরস্বতী স্বয়ং। কারণ এই বিদ্যা না শিখলে যে ‘লাইনে’ কাজ করাই যাবে না। রাঁড় ভাঁড় আর মিথ্যা কথার কলকাতায় উনিশ শতক জুড়ে সরস্বতী ছিলেন যৌনপল্লির অন্যতম আইকন, গণিকাদের আরাধ্যা। কার্তিকের পাশাপাশি তাঁরও পুজো চলতো মহাসমারোহে।
উনিশ শতক মানেই উঠে আসে কলকাতার ‘বাবু’-দের কথা। বাবু যেখানে আছে, সেখানে ‘বিবি’ তো থাকবেই। গোটা উনিশ শতকের ইতিহাসে এই বাবু আর বিবিদের লাম্পট্যের শেষ নেই। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘বাবু’ প্রবন্ধে এই বিবিদের উপগৃহিণী বলে সম্মান দিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাতে এই ‘বাবু’ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ১৮৭২ সালে, আর আমরা অবাক বিস্ময়ে পড়ি বঙ্কিম ‘বাবু’র সংজ্ঞা দিতে গিয়ে উল্লেখ করছেন উপগৃহিণীর অনুরোধে সরস্বতী পুজো করা বাবুদের আবশ্যক ধর্ম। বঙ্কিমের কিছু আগে ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘সমাজ কুচিত্র নকশা’-য় লিখছেন, “সরস্বতী পুজোর আর পাঁচদিন আছে। রাত্রি ঘোর অন্ধকার, তথাপি ইয়ার দলের শঙ্কা অথবা বিরামের নাম নাই। …সকল বেশ্যাবাড়ির দরজাতেই প্রায় জুড়ি, তেঘুড়ি, চৌঘুড়ি খাড়া রয়েচে। গৃহমধ্যে লালপানির চকচক্, চেনাচুরের ছপছপ্ ও বোতল গেলাসের ঠনঠন্ শব্দ শুনা যাচ্ছে। …সরস্বতী পুজোর খরচের কল্যাণে অনেকস্থলে গাঁটকাটা, রাহাজানি, সিঁদ, হত্যা, ডাকাতি, জুয়াচুরি ইত্যাদি ঘটনা হচ্ছে। শহর টল্টোলে।”
কলকাতার ‘বেশ্যাপল্লি’গুলিতে শুধুমাত্র এই সরস্বতী পুজোকে ঘিরে প্রচুর জাঁকজমক হত, পুজোয় পয়সা ঢালতেন রসিক বাবুরা। সরস্বতীর মূর্তির জন্য বায়না বেড়ে যেত কুমোরটলিতে। এমনকি হুতোম এই প্রবন্ধেই লিখছেন যে, কুমোরেরা সরস্বতী মূর্তির জোগান দিতে না পেরে আগে থেকে তৈরি করা জগদ্ধাত্রী মূর্তির হাতি, সিংহ ভেঙে টেঙে সাদা রং করে দিতেন। সরস্বতী পুজো উপলক্ষ্যে সোনাগাছি, হাড়কাটার বেশিরভাগ বাড়িতে নাচ-গান চলতো, থাকতো যাত্রাপালার ব্যবস্থাও। বেশ্যাপল্লির পুজো দেখতে বাবুদের পাশাপাশি তাদের বন্ধু-বান্ধব এবং সাধারণ মানুষের ভিড় তো লেগেই থাকতো। রাত বাড়লেই বাবুদের বাবুয়ানির আগুনে তেল-ঘি বেশি পড়তো। ‘সমাজ কুচিত্র দর্পণ’ পত্রিকার একটি সংখ্যায় সরস্বতী পুজো নামের একটি প্রবন্ধে দেখা যায় ঘরে কোনো কোনো বাবু মাতাল হয়ে গান জুড়েছেন, কেউ কেউ নাচতে লেগেছেন আবার পাঁচ মাতালবাবু মধ্যরাতে সরস্বতী দর্শনে কোথা থেকে একটা মেনি বেড়াল চুরি করে এনে দেবীর পায়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিচ্ছেন। এ লেখা বেরোচ্ছে ১৮৬৫-তে।
তার খানিক আগে ‘আর্য্যদর্শন’ পত্রিকায় বেশ্যাগৃহকে বাঙালির ‘মঠ’ বলা হয়েছে। এই মঠের আরাধ্যা দেবী ছিলেন সরস্বতী। পুরাণ ঘাঁটলে আমরা দেখি সরস্বতী ব্রহ্মার মুখ থেকে জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু ব্রহ্মা নিজের কন্যারই শরীরী রূপের মোহে ফাঁসলেন। নিজের কামাগ্নিকে আর সংযত করতে না পেরে সরস্বতীর পিছু ধাওয়া করে অবশেষে মিলিত হলেন। সরস্বতীর গর্ভে এল পুত্রসন্তান, তিনিই মনু। রূপের মাহাত্ম্য তাঁর এমনই যে বেদে বর্ণিত সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্রে একটা পংক্তিতে লেখা হচ্ছে – ‘কুচভরণমিতাঙ্গী সন্নিষন্না সিতাব্জে।’ এর অর্থ হল স্তনভারে নুয়ে পড়েছে দেবীর শরীর। ফলে বোঝাই যাচ্ছে প্রাচীন বৈদিক দেবী হিসেবে সরস্বতীর রূপের আবেদন সবথেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। বাৎস্যায়ন তাঁর ‘কামসূত্র’-এ ৬৪টি কলাবিদ্যার উল্লেখ করেছেন যার মধ্যে ঐ ‘ছয়-ছ’ বিদ্যাও অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া নৃত্য, গীত, বাদ্য, ছন্দোজ্ঞান, ছলাকলা, পাশাখেলা, আকর্ষণী বা সম্মোহনী কলা এসবই কিন্তু বিদ্যার মধ্যেই পড়ত, আর এই বিদ্যাগুলিতে পারদর্শিতা অর্জন করতেন গণিকারা। দেবী সরস্বতী এই কলাবিদ্যার শিক্ষা দেন, তাই কার্তিক পুজোর পাশাপাশি পুরোনো কলকাতার বেশ্যাপল্লিতে সরস্বতী পুজোর চল ছিল বহুদিন পর্যন্ত। সরস্বতীর পুজো করে তাঁর মতো নৃত্য-গীত-বাদ্যে পটিয়সী হলে কার্তিকের মতো সুদর্শনবাবু পাওয়া যাবে এমনটাই ধারণা ছিল সেকালের বারাঙ্গনা-গণিকাদের।
ওই উনিশ শতকে সমাজের মূলস্রোতে কিন্তু মেয়েদের মধ্যে সরস্বতী পূজার প্রচলন খুব একটা দেখা যেত না। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ তাঁর ‘সরস্বতী’ বইতে স্পষ্টই লিখছেন যে, সেকালে মেয়েরা পাছে লেখাপড়া শিখে ফেলে তাই তাদের সরস্বতী পুজো করতে দেওয়া হত না। এরই বিপ্রতীপে শুধুমাত্র বাবুদের মনোরঞ্জন করার জন্য নৃত্য-গীত-বাদ্য আর ছলাকলা-ছেনালিতে পটিয়সী হতে সরস্বতীকেই আরাধ্য করে তুলেছিলেন যৌনপল্লির ‘বিবি’রা। বিদ্যাশিক্ষার এই ইতিহাস আজও অবহেলিত।
তথ্যসূত্রঃ
১। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, সরস্বতী, সাহিত্যলোক।
২। ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সমাজ কুচিত্র, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস (সম্পা:), বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ।