উনিশ শতকের ‘বটতলা’য় লোকশিক্ষা

বটতলার লেখায় উপকৃত হতেন সাধারণ মানুষ

“মচকানিতে চুন হলুদ, পুড়লে দেবে ছাগল দুধ
কাটলে চিতের পাতা চুর, পচলে কেটে করবে দূর….”

পুস্তকের নাম ‘যোষিদ্বিজ্ঞান – নারীকুলের অবশ্যজ্ঞাতব্য বিষয়সমূহ’। লেখক- বসন্তকুমারী দাসী। ১৮৭৫ সালে বরিশালের বটতলা-জাতীয় সস্তা ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত। রোজকার জীবন সহজ করার টোটকা। ঠিক আজকাল যেমনটা মেলে। ট্রেনের কামরায় বা স্টেশনের স্টলে। সেখানে কুসংস্কার ও বিজ্ঞান বিষয়ক বই, রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপি, হেমন্ত, মান্না, আশা, লতা, সন্ধ্যার গানের বই, সহজে ইংরেজি শিখুন বা গেরস্তালির হাজার প্রয়োজনীয় টুকিটাকি,  নিজের হাত নিজে দেখুন – জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে এগুলির ভূমিকা ফেলে দেওয়ার নয়।  তবে এই চটি পুস্তিকার সূত্রপাত হিসেবে আমরা বটতলাকে আরেকবার স্মরণ করতে পারি।  নতুন সমাজব্যবস্থায় লোকশিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় তো পুরোনোর কিছুই খাটছিল না। “লোকে বলে যে ‘ঘড়িকে ঘোড়া ছুটে’। সত্য সত্যই গত অর্দ্ধ শতাব্দীর মধ্যে তাহাই বঙ্গদেশের অবস্থা হইয়া উঠিয়াছে।…”
[সেকালের দারোগা কাহিনী – গিরিশচন্দ্র বসু] 

হঠাৎ করে চারপাশটা খুব দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে, আঠেরো শতকের শেষ থেকেই। তারপর উনিশ শতক তো আর কথাই নেই। পুরোটাই এক নতুন মোড়ক। অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক –  সবক্ষেত্রেই। তাতে মানিয়ে নিতে পারাও তো চাই। তাছাড়া শহর ও গ্রামের মধ্যে গভীর এক ফারাক সেসময়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। শহুরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে মাপকাঠি ধরে সময় ও সমাজ ঘুরছে। বাঁক বদলে নতুন রূপ নিচ্ছে। সাধারণ জনতা কীভাবেই বা পারবে তাতে পা মিলিয়ে চলতে!  সামাল দিয়েছিল নাকি বটতলা।

একথা অস্বীকারের জায়গা নেই যেই, হালফিলের সামাজিক আচার-আচরণকে ব্যঙ্গ করে ঢের প্রহসন, কুৎসা, আবার যৌন-সুড়সুডি-দেওয়া বটতলায় প্রকাশিত হত। কিন্তু পাশাপাশি জনশিক্ষামূলক লেখাও বটতলা প্রকাশ করত, আর তাতে বাস্তবিকই উপকৃত হত সাধারণ মানুষ। সেসবে খনার বচন, দৈনন্দিন সাংসারিক জীবনে মেয়েদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য থাকত যেমন, তেমনি জায়গা পেয়েছিল উকিল-মোক্তার-দারোগাদের আইন বিষয়ক জ্ঞানদান।  নানান বৃত্তিতে, শিক্ষামূলক কাজে শিক্ষানবিশদের হাতেকলমে শিক্ষাদানের ওপরেও বই প্রকাশিত হত।

ছাপাখানা তৈরি হতেই বটতলা প্রকাশ করেছিল, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই। গরিব পাঠকেরা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে, গ্রামের ডাক্তাররা যাতে আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি সহজে আয়ত্ত করতে পারে, তার জন্যে এইসব বই । যেমন ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, ‘চিকিৎসার্ণব’। যার দাম ছিল দুই আনা। আর বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, যেসব চিকিৎসক রোগীদের কাছ থেকে মাত্র চার আনা পারিশ্রমিক পান, এই বই তাঁদের জন্যে। 

পাঠকদের চিকিৎসায় স্বাবলম্বী করতে ১৮৪৯ সালে প্রকাশ পায়, ‘আত্মরক্ষা’ নামের চটি বই। মূল্য ছিল আট আনা। আবার ১৮৫০ সালে প্রেমচাঁদ চৌধুরী নামের আরেকজন লেখক লেখেন, ‘জলচিকিৎসা’। পাঁচ আনা মূল্যের এই বইটির মোদ্দা প্রতিপাদ্য ছিল, নিজের রোগ নিজে সারানো। জ্বর, বাত, হাম, পেটব্যথা- ইত্যাদি জলের মাধ্যমে নিরাময়ের উপায়।  ইংরেজিতে অপটু ছাত্রদের ক্ষেত্রেও আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল বটতলা। গ্রামের পুরনো কবিরাজ, হাকিমদের মধ্যেও কিন্তু  আধুনিক এই বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছিল, বটতলা। 

পেশা বিষয়ক  বই তো  ছিলই। আজকাল যেমন টেন-ইয়ার্স বের হয়- তেমনটাই আরকি। ১৮৫৩ সালে প্রকাশ পেয়েছিল ‘মাল-সংক্রান্ত আইন’। লেখক যদুনাথ মল্লিক। বইটির বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘উকিলদের পরীক্ষাপাশের সাহায্যার্থে প্রণীত’। পুলিশ ও দারোগাগিরির পরীক্ষাপাশের জন্যও হরেক বই কম পয়সায় প্রকাশিত  হত বটতলা থেকে। 

মোদ্দা কথা হল এই যে, জীবন যখন কোনোভাবেই আর সহজ রইল না, তখন জীবনকে সহজ করার  উদ্দেশ্য নিয়ে এইসব বই।  লোকশিক্ষার চরিত্রও বদলে গেল উনিশ শতক থেকে। তাই কৃত্তিবাসী ও কাশীদাসীর বাইরে এইসব বইপত্র আবশ্যক হয়ে দাঁড়াল। শহর চেপে বসতে থাকল গ্রামের ওপরে। সেই চাপেই শহরকে আত্মস্থ করা আবশ্যক হয়ে উঠল। তখন ইংরেজি না-জানা গরিব মানুষের পাশে এভাবেই দাঁড়িয়েছিল বটতলার চটিবইগুলি। 

ঋণঃ ‘উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান’ – সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় 

Post Tags
Developed by DXDasia