চোখ-জুড়োনো সবুজ উপত্যকা, তিব্বতি গ্রাম আর কাঞ্চনজঙ্ঘা
বাংলার ভিতরেই একটুকরো তিব্বত! সেখানে এখনো গুম্ফায় ভিড় জমায় ছোটো লামাদের দল। পাঁচ-ছয় বছরের ‘তপস্যা’-য় সূর্যের আলো দেখাও বারণ তাদের। উপত্যকা ভাসিয়ে রোজ গুম্ফা থেকে ভেসে আসে মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি। সবুজ চাদরে মোড়া ঢেউ-খেলানো মাঠে দাঁড়িয়ে আটটি বৌদ্ধস্তূপ। সেখানে রোদ এসে পড়ে, দাগ রেখে যায় বৃষ্টির জল। আর, নীল সোয়েটার পরা আকাশের এককোণে রোজ সকালে ঘুম ভাঙে কাঞ্চনজঙ্ঘার।

শুনে মনে হচ্ছে গল্প? অথচ, সত্যিই তিব্বত বাসা বেঁধে আছে ভারত আর নেপাল সীমান্তের এই গ্রামে। গ্রাম মানে হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি। সামান্য কিছুটা গেলেই অন্য দেশ। তবে, এই ছবির মতো সুন্দর গ্রামটা কিন্তু ভারতেই। এমনকি, আমাদেরই রাজ্যে। নামেও যেন ছবির রেশ—চিত্রে।
মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু যাওয়ার বহুল পরিচিত পথের প্রথম গ্রাম চিত্রে। উচ্চতা ৮,৩৪০ ফুট। চড়াই ভেঙে উঠতে হবে ৩ কিমি। পায়ে হেঁটে খুব বেশি হলে ঘণ্টা দেড়েকের পথ। ট্রেকাররা এখানে আসেন, দু’দণ্ড জিড়োন, তারপর ফের হাঁটা লাগান টংলু কিংবা টামলিং-এর দিকে। চিত্রে এই ক্ষণিকের পরিযায়ীদের সঙ্গই পায় আজীবন। খুব বেশি মানুষ রাত্রিযাপন করেন না এই গাঁয়ে। করলে বুঝতেন, এ এক আশ্চর্য জায়গা। একবার এখানে থাকলে তার নেশা কাটানো মুশকিল।

কী আছে এই ছোট্ট গ্রামটিতে যে এখানেই নতুন বসত গড়েছিলেন তিব্বত থেকে উজিয়ে আসা কয়েকটি পরিবার? সেই কথা জিজ্ঞেস করলে উপত্যকা উজাড় করে হাসে ফিনজো, জিগমে, ডোমারা। প্রত্যেকেরই শিকড় তিব্বতে। ১৯৬০ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার দিনগুলোয় ছিন্নমূল হয়েছিলেন তাঁদের পূর্বপুরুষরা। তাঁদেরই অন্যতম ছিলেন ফিনজোর বাবা নামগিয়াল ভুটিয়া। তিনিই প্রথম তাঁর পরিবার নিয়ে এসে বাসা বাঁধেন এইখানে। তারপর, একে একে আরো চারটি পরিবার। গড়ে ওঠে ছোট্ট এক তিব্বতি মহল্লা। সেই সংস্কৃতি, স্থাপত্য। ধীরে ধীরে এখানেই তৈরি হয় বিখ্যাত তিব্বতি গুম্ফা এবং স্কুল।

চিত্রে যেন শিকড় হারানোর ক্ষত ভুলিয়ে দিয়েছিল সেই মানুষগুলোকে। প্রকৃতি বড়ো আদরে এঁকেছে এই উপত্যকা। দু’পাশে পাহাড়ের ঢেউ, গুরাস, রানি চাঁপের বন। দূরে বরফের চুড়ো। এখানেও সেই জুড়িয়ে দেওয়া ঠাণ্ডা হাওয়া ভেসে আসে গভীর শীতের দেশ থেকে। এই হাওয়া কি তিব্বতের সেই ফেলে আসা গ্রামের খবর জানে? আপার ও লোয়ার চিত্রে ভ্যালিতে তখন নিজেদের নতুন শিকড় গাঁথার ইতিহাস লিখছিলেন নামগিয়ালরা। কিন্তু, ছিন্নমূল মানুষদের ইতিহাস তো এত সহজ হয় না। দেশ কী, শিকড় কোথায়—এই প্রশ্ন বারবার হানা দেয় স্বপ্নে। নামগিয়ালদের নাগরিকত্ব বদলায়। নতুন দেশ একভাবে আপনও করে নেয় তাঁদের। কিন্তু, সংস্কৃতির অভ্যেসটা মুছে ফেলা যায় না। ও যেন জন্মদাগের মতো।

এরই মধ্যে একদিন সান্দাকফু পর্যটন মানচিত্রে জায়গা পেল। ঠিক হল ওখানে তৈরি হবে ট্রেকার্স হাট। সেই ট্রেকার্স হাট গড়ার জন্য ইট, বালি, সিমেন্ট সরবরাহের বরাত পেলেন নামগিয়াল। চিত্রে থেকে সান্দাকফু চড়াই ভেঙে ২৯ কিমি। খচ্চরের পিঠে মাল চাপিয়ে রোজ ভোর ৪টের সময় বেরিয়ে পড়তেন তিনি। সেইসব জিনিসপত্তর সান্দাকফুতে পৌঁছে দিয়ে ঘরে ফিরতেন যখন, সূর্য ততক্ষণে ডুবে গেছে হিমালয়ের পশ্চিম পাটে। এই হাড়ভাঙা খাটনিতেও আপত্তি ছিল না নামগিয়ালের। পাহাড়ি মানুষদের জীবন পাহাড়ের মতোই পাথুরে কঠিন, আবার পাহাড়ের মতো রৌদ্রকরোজ্জ্বলও। নামগিয়াল জানতেন। জানতেন, নতুন পাথুরে মাটিতে নতুন শিকড় গাঁথা সহজ নয়।

সান্দাকফুর ট্রেকার্স হাট তৈরি হল। পর্যটকের ঢল পেল এই পাহাড়ের বাঁক-পথ, এমনকি চিত্রেও। ইতিমধ্যে, তৈরি হয়েছে চিত্রের গুম্ফা। দার্জিলিং, কালিম্পঙের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এখানে পড়তে আসে বৌদ্ধ পরিবারের সন্তানরা। সেই পাঠ কঠিন সংযমের। তপস্যার। সূর্যের আলো দেখাও বারণ। কিছুক্ষণের জন্য চিত্রেয় কাটালে বোঝাই যাবে না, এই গুম্ফাতেই পাঠ নিচ্ছে তিনশো জন কিশোর। যাদের অনেকেই এরপর বিভিন্ন গুম্ফায় লামা হিসেবে নিযুক্ত হবে। কেউ কেউ অবশ্য উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেবে বাইরে, এমনকি বিদেশেও। তাদের নিরুচ্চার সাধনা চিত্রের নৈঃশব্দকে আরো ঘন করে তোলে। এই গ্রামে যদি রাত কাটানো যায়, একমাত্র তাহলেই দেখা মিলবে এদের। দেখে অবাক লাগবে শহুরে মানুষের। একই সময়ের অভিবাসীদের মধ্যেও কত পাহাড়ের দূরত্ব। বিশ্বাসই হবে না।

চিত্রেয় এখন সাকুল্যে পাঁচটি পরিবারের বাস। তাদের মধ্যে চারটিই তিব্বত থেকে আসা। সান্দাকফুর দিকে আরো খানিক এগোলে মেঘমা। সেখানেও দুটি তিব্বতি পরিবারের বাসা। চিত্রেতে একটা গোটা দিন কাটালেই তিব্বতের বাতাস এসে লাগবে গায়ে। সেই বাতাস পৌঁছে দেবে ফিনজো, জিগমে, ডোমারা। ফিনজো তো পর্যটক মহলে বেশ পরিচিত। হোম-স্টে আছে তাঁর। ফিনজোর বাবার নাম তো আগেই বলেছি। তিনি চিত্রের সবচাইতে বিখ্যাত মানুষ। জিগমে পেশাগতভাবে সান্দাকফু-ফালুট-চিন্তাফু রুটের লোকাল গাইড। এহো বাহ্য, আসলে রেড পান্ডা খুঁজে বের করতে তাঁর জুড়ি নেই। আপনি দু-তিনটে দিন ঘুরুন ওঁর সঙ্গে, আপনাকে রেড পান্ডার সঙ্গে দেখা করাবেই জিগমে। প্রকৃতিগতভাবে পাহাড়ি ঝরনার মতো একটা পাগলামোর বীজ বোনা আছে জিগমের জিনে।
আরো পড়ুন
উত্তরবঙ্গের নতুন স্বর্গ— দারা গাঁও
আর আছে, সক্কলের প্রিয় ‘বহিনু’ ডোমা। এই উপত্যকায় একে-একাই একটি চায়ের দোকান তথা ছোট্ট রেস্টুরেন্ট চালায় সে। পরিবারের অন্যরা থাকে স্লোভাকিয়ায়। ঘরের দেওয়ালে পরিবারের ছবি টাঙানো। সকালের প্রাতঃরাশ, চা, ডিম-টোস্ট, নুডলস, মোমো এমনকি চাইনিজ খাবারও চাইলেই বানিয়ে দেবে ডোমা। পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করলে গল্প জুড়বে আপনার সঙ্গে। মনখারাপ করে না? পাহাড়ে তো মেঘ আসে, তারপর রোদ। ঝলমল করে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ডোমার উচ্ছল হাসি চারিয়ে যাবে আপনার ভিতরেও।

এই সমস্ত গল্পই ঘিরবে আপনাকে। জানতে পারবেন, এখানে পরিবারের ছোটো ছেলেটির নাম হয় বাইচুং। উপত্যকায় পাথরের গায়ে রং-বাহারি বৌদ্ধ মন্ত্র, হাওয়ায় নিশান উড়ছে। সেই শীতের হাওয়া। আপার চিত্রে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রাজকীয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। রাতে আলো পাঠাচ্ছে ঘুম, দার্জিলিং, মিরিক এবং সীমানা। সবুজ প্রান্তরে রয়েছে ক্যাম্প-যাপনের সুযোগও। দু’দিনের শিকড়। নরম আলস্যের মতো রোদ এসে বিছিয়ে থাকে সকালে। গুম্ফা থেকে ভেসে আসে সমবেত মন্ত্রোচ্চারণ।

সারাদিনে ইতিউতি পর্যটকদের দেখা মিলবে। সবাই চলেছে সান্দাকফু। দেখা মিলবে বুড়ো ল্যান্ড রোভারেরও। ব্রিটিশরা দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় এই হেরিটেজ গাড়ি সঁপে গেছিল রাজা মানসিং-এর জিম্মায়। সেই গাড়ি আজো চলছে সসম্মানে। এখান থেকে ৭ কিমি দূরেই সিংগালিলা ন্যাশনাল পার্কের গেট। আর চিত্রের দু’পাশে ছড়ানো গুরাস (রডোডেনড্রন) আর রানি চাঁপ (ম্যাগনোলিয়া) গাছ। বসন্তে যখন ফুল আসে এইসব গাছে, চিত্রে তখন পরির দেশ।
চেনা পথের মাঝেই লুকিয়ে থাকে এমন অচেনা স্বর্গেরা। খুঁজে নিতে হয়।
কীভাবে যাবেন?
ট্রেনে এনজেপি স্টেশন। সেখান থেকে গাড়িতে মানেভঞ্জন ৮৪ কিমি। মানেভঞ্জন থেকে চিত্রে ৩ কিমি। হেঁটে ওঠাই ভালো। তবে, গাড়িও মিলবে।
কোথায় থাকবেন?
হোম-স্টে রয়েছে। ক্যাম্পে তাঁবুতে থাকার অভিজ্ঞতা অবশ্য আরো লোভনীয়। যোগাযোগ- ৬২৮৯৩৮২২৭৭, ৯২৩১৫৮১১৭৭।
কোথায় ঘুরবেন?
আশপাশকেই আবিষ্কার করুন। চাইলে চলে যান সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক। গাড়ি করে বা পায়ে হেঁটে চলে যেতে পারেন টংলু, টামলিং, সান্দাকফু। ফালুটও ট্রেক করতে পারেন চাইলে।
কখন যাবেন?
বর্ষা বাদে যে কোনো সময়। শীতে বরফ মিলতে পারে উপত্যকায়। বসন্তে রডোডেনড্রন।
ছবি: বরুণ ভট্টাচার্য