‘ঈশ্বরের বাগান’-এ যখন প্রবেশাধিকার পেয়েইছি, তখন সময় নষ্ট নয়, প্রতিটি মুহূর্তে ভোগ করতে হবে এই রূপ
হর-কি-দুন গাড়োয়াল হিমালয়ের কোলে দোলনার মত ঝুলন্ত এক উপত্যকা। চারপাশে বরফে ঢাকা হিমালয়ের চূড়া, সামনেই স্বর্গারোহিনী দৃপ্তভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। একপাশে দেখা যায় বন্দরপুচ্ছ শৃঙ্গের অংশ, উঁকিঝুঁকি মারে রুইনসারা শৃঙ্গ। কথিত আছে পান্ডবেরা স্বর্গের উদ্দেশে রওনা হন এই হর-কি-দুন থেকে – স্বর্গারোহিনীর পথ বেয়ে। স্বর্গের দ্বার শুধু নয়, স্বর্গেরই এক অংশ যেন হর-কি-দুন, এজন্যই এর আরেক নাম ঈশ্বরের উপত্যকা।
দেরাদুন থেকে গাড়ি নিয়ে পুরোলা(১৪২ কিলোমিটার) বা সরাসরি সাকরি(১৯৭কিলোমিটার)।সাকরি থেকে স্থানীয় জিপে তালুকা,এই পথে জিপ ছাড়া চলে না। পোর্টার বা গাইড সাকরি বা তালুকা থেকে নেয়া যায়। ফেরার পথেও থাকতে হবে সাকরি ও ওসলাতে। গাড়োয়াল মণ্ডলের বাংলো বুকিং হয় অনলাইনে। নিজেদের তাঁবুতেও থাকা যায়। যাওয়া আসা মিলে ৫০ কিলোমিটার হাঁটা,হাঁটতে হবে মোট চারদিন।মাঝে হর-কি-দুনে দু রাত্রি কাটালে ভালো,পথের শ্রান্তি কাটে আর রয়েসয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।তবে মনে রাখতে হবে এখানে থাকার ব্যবস্থা অতি সাধারণ। লম্বা ট্রেকিং হলেও কঠিণ নয়।কিছু সাবধানতা নিতে হবে –ভালো হাঁটার জুতো, পথে প্রচুর জলপান আর কোন নেশা নৈব নৈব চ, পাহাড়ে যাবার আগে অন্তত দুমাস নিয়মিত হাঁটা – এই কটি নিয়ম মানলে আর বিশেষ কোন শারীরিক অসুবিধে না থাকলে হর-কি-দুন দিয়েই হতে পারে আপনার ট্রেকিং-এর হাতে-খড়ি।
হর-কি-দুনে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় পায়ে হাঁটা। তবে খোঁজখবর নিয়ে জানা হল- এটি সহজ ‘ট্রেকিং’ – অনেক লম্বা পথ পেরিয়ে আস্তে আস্তে উঠতে হবে বারো হাজার ফুট উচ্চতায়, এ পথে চড়াই তুলনামূলকভাবে কম। অতএব বুকে বল নিয়ে আয়োজন শুরু করলাম।
পায়ে হাঁটা শুরু হয় তালুকা থেকে। দেরাদুন থেকে সরাসরি যাওয়া যায় সাকরি, গাড়িতে সময় লাগে প্রায় ৮/৯ ঘণ্টা। সাকরি থেকে তালুকা (৬২৩২ ফুট) ১৪ কিলোমিটার পথ যাওয়া যায় গাড়িতে। তালুকা থেকে হাঁটা শুরু। আমরা অবশ্য আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ধীরে চলার পক্ষপাতী। তাই দেরাদুন থেকে গিয়ে থাকলাম পুরোলা, হর-কি-দুন যাওয়ার পথে ছোট এক গঞ্জ-শহর। সেখান থেকে পরদিন সাকরি। এই সব জায়গাতেই আছে গাড়োয়াল মন্ডলের অতিথিনিবাস, একেবারেই সাদামাটা ব্যবস্থা। সাকরি থেকে ভোরবেলা পৌঁছালাম তালুকা। তালুকা থেকে সঙ্গী হলেন দুজন গ্রামের লোক, তারা হবেন আমাদের পথপ্রদর্শক ও মালবাহক। এর পরের গন্তব্য ওসলা। পুরো পথটাই গিয়েছে গোবিন্দঘাট জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে। উইলো, পপলার, আখরোট -আরো কত যে নাম না জানা গাছ। হাঁটার শুরুতেই সঙ্গী হয়েছে রুপীন নদী, হর-কি-দুন পর্যন্ত রুপীন ও সুপীন নদী আমাদের কখনো ছেড়ে যায়নি। ঘন জঙ্গলের মধ্যে নদীর গর্জন শুনতে শুনতে পথ চলায় কোনও ক্লান্তি আসেনা।
আজ আমাদের হাঁটতে হবে ১৩ কিলোমিটার। ওসলার উচ্চতা প্রায় সাড়ে আট হাজার। এই পথে লোক চলাচল কম। মাঝেমাঝে দেখা হয় ভেড়াওয়ালাদের সাথে, ভেড়ার পাল নিয়ে চলেছে, কোথাও বা পথের পাশে আগুন জ্বালিয়ে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করছে। আমাদের সঙ্গী গাইডদের চেনাশোনা সবাই, যেখানেই দেখা হচ্ছে দুদন্ড বসে গল্প করে নিচ্ছে আর জঙ্গলে গাছ থেকে পড়া আখরোট কুড়িয়ে আমাদের খাওয়াচ্ছে। নদীর পাশ দিয়ে দিয়ে পথ পৌঁছাল গাংগর গ্রামে। সারা পথে এখানেই একটা ছোট্ট দোকান চোখে পড়ল, গরম চা খেয়ে পথ চলার নতুন শক্তি পেলাম। হর-কি-দুনের পথের এক আকর্ষণ এই গ্রামগুলো। নগর সভ্যতা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গভীর জঙ্গলের মাঝে দূরে দূরে এক-একটি গ্রাম। গ্রামের বাড়িগুলি একই ধাঁচে তৈরি। চাষ আর পশুপালন সবার জীবিকা। জঙ্গলের মাঝেমাঝে ফাঁকা জায়গায় নানা ক্ষেত, ভেড়ার লোম দিয়ে নিজেরাই তৈরি করে নেয় পশমের পোষাক। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে পথের আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে দেয় রামদানার ক্ষেত। ঘন সবুজের মধ্যে লাল রং-এর কার্পেট যেন কেউ বিছিয়ে দিয়েছে। এ যে কি অপূর্ব তা বলে বোঝান যায়না। শুনলাম এই রামদানা গুঁড়ো করে তার থেকে তৈরি হয় রুটির আটা। তাছাড়া রামদানার লাড্ডুও নাকি মুখরোচক।
ওসলা পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বিকেল। গাইড বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন, বেলা দুটোর পর নাকি আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়, হলও তাই।তবে জল-ঝড় খুব জোরে আরম্ভ হওয়ার আগেই চোখে পড়ল রুপীন নদীর সামনে এক ছবির মত বাংলো, প্রায় দৌড়ে পৌঁছালাম সেখানে। শুনলাম সেটি গাড়োয়াল মন্ডলের নয়, বনবিভাগের বাংলো। গাড়োয়াল মন্ডলের অতিথিনিবাস তার পাশে। বাংলোর চৌকিদার বোধহয় মায়াবশতই বললেন আমরা ইচ্ছে করলে থেকে যেতে পারি সেখানে। সেদিন কারুর বুকিং নেই। এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে – দীর্ঘ পথযাত্রার পর রুপীন নদীর গর্জন শুনতে শুনতে দুগ্ধফেনিল শয্যায় রাত কাটানো। বৃষ্টির মাঝে বাংলোয় জুটেছে ছোট্ট দুই ছেলেমেয়ে –ভাইবোন, কোলে ছাগলছানা। ওসলা গ্রামে বাড়ি, জানালো ছানাটি জন্মেছে একটু আগে, তারই দেখাশোনা করতে এসেছে তারা। স্কুলে যায় কিনা এ প্রশ্নের উত্তর দিলনা, কিন্তু শোনাল কটি ছাগল আছে তাদের, শীতকালে কিভাবে তাদের দেখাশোনা করতে হবে সে সব গল্প। মনে হল সত্যি কি দরকার আছে স্কুলে যাওয়ার, প্রকৃতিই তো তাদের শিক্ষক।
গল্প আছে এই অঞ্চলে নাকি ছিল কৌরবদের রাজত্ব, এখনো এই গ্রামে দুর্যোধনের পুজো হয়,নদীর ওপারে ওসলা গ্রামে দুর্যোধনের মন্দিরও আছে। যুধিষ্টির দুর্যোধন ভক্তদের রাজত্বর মধ্য দিয়েই স্বর্গ আরোহনের পথ কেন বাছলেন সে ধোঁয়াশা মনে থেকে গেল।
পরদিন ওসলা থেকে হর-কি-দুন। পথ যত উঠছে জঙ্গলের চরিত্রও পাল্টাচ্ছে – এখন চারপাশে চির ও পাইনের জংগল। ওসলার পরেই দেখা দিয়েছে স্বর্গারোহিনী। হেমন্তের ঝরাপাতায় পথ হয়েছে হলুদ, পাশে রামদানার লাল ক্ষেত, নীল আকাশের নীচে রুপীন নদীর নীলাভ সবুজ জল, দূরে তুষারাবৃত শ্বেতশুভ্র স্বর্গারোহিনী – প্রকৃতি যেন রঙের খেলায় মেতে উঠেছে। আমাদের আজকেও হাঁটতে হবে প্রায় ১২ কিলোমিটার, পথের সৌন্দর্য পথের ক্লান্তি টের পেতে দেয়না। বিকেল তিনটে নাগাদ পৌঁছে গেলাম হর-কি-দুন। অসম্ভব ক্লান্তি থাকলেও গাড়োয়াল মন্ডলের ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। সূর্যের পড়ন্ত আলোয় স্বর্গারোহিনীর রূপ – দুপা এগোলেই ঘাসে ফুটে আছে নানা রং-বেরঙ্গের ফুল, ‘ঈশ্বরের বাগান’-এ যখন প্রবেশাধিকার পেয়েইছি, তখন এক মুহূর্তও সময় নষ্ট নয়, প্রতিটি মুহূর্তে ভোগ করতে হবে এই রূপ।