বাংলার ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ গনগনি

এই গনগনির মাঠেই চুয়াড়-লায়েক বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক অচল সিংহ ও তাঁর সঙ্গীদের ফাঁসি দেয় ইংরেজ

পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা টাউন আর তার কাছেই গনগনি। চারদিকে লাল, গেরুয়া মাটির পাহাড়ে ভাস্কর্য। কলকাতা থেকে দূরত্ব ১৭৮ কিলোমিটার। গাড়িতে ঘণ্টা দুয়েক। আমেরিকার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মিনিয়েচার ভার্সন। অ্যারিজোনার জায়গায় গনগনি। আর কলোরাডোর জায়গায় শিলাই নদী। মেদিনীপুরের গড়বেতার কাছে গনগনিতে নদীপাড় ক্ষয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে বিস্তৃত র্যারভাইন। ছোটখাটো ক্যানিয়ন বললেও ভুল হবে না। আগুন রাঙা লাল রূপসী বাংলা। পাথুরে পথ পেরিয়ে নেমে আসা যায় নদীর পাড়ে। নদীর নাম শিলাবতী। স্থানীয় নাম শিলাই। বাঁধনহারা বেণীর মত এঁকে বেঁকে চলেছে। কোথাও হাঁটু জল, কোথাও আবার কোমর পর্যন্ত। আদতে নদী শান্ত। পুরুলিয়ার মানভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে রাঢ় অঞ্চলের উপর দিয়ে এঁকেবেঁকে দ্বারকেশ্বর নদের সাথে মিশে রূপনারায়ণ নাম নিয়ে সাগরে পড়েছে। বাঁকুড়ার ইন্দপুর থেকে মানবাজার রোডের ঠিক মাঝে কদম দেউলি বাঁধ। এটিই শীলাবতী নদীর উপর একমাত্র ড্যাম। শীতের সকালে নদী ও ক্যানিয়নের এক অপূর্ব রূপ দেখা যায়। অনেক পাখিদেখা যায় এই সময়। নদীর বুকে জেগে উঠেছে চড়া। ওই চড়াতেই স্থানীয় মানুষ চাষবাস করে। তবে বর্ষার সময় এর রূপ ভয়ঙ্কর। গরমকালে নদীটি হেঁটে পার হয়ে ওপারে যাওয়া যায় সহজেই। নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে গনগনির ‘দ্য গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন অব বেঙ্গল’ কথাটি বেশ অনুভব করা যায়। নদীর ওপারের গ্রামের নাম ভিখনগর। কথিত আছে পাণ্ডবরা তাদের অজ্ঞাতবাসের সময় এখানে এসেছিলেন। লোককথা, একদিন যুধিষ্ঠির নদীর পাড়ে এক ব্রাহ্মণকে বসে কাঁদতে দেখেন। যুষ্ঠির তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, নদীর ওই পাড়ে এক রাক্ষস আছে, নাম বক। সে প্রতিদিন একজন করে গ্রামের মানুষকে আহার হিসাবে গ্রহণ করে। আজ তাঁর পালা। যুধিষ্ঠির এই কথা শুনে রেগে যান এবং রাক্ষসকে বধ করার জন্য ভীমকে পাঠান। প্রবল যুদ্ধ হয় বকরাক্ষস ও ভীমের মধ্যে। এই যুদ্ধের ফলেই এই গনগনির ক্যানিয়নের সৃষ্টি হয়। শুধু লোককথাই নয়, ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয় এই জায়গার। চুয়াড়-লায়েক বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক অচল সিংহ তাঁর দলবল নিয়ে আস্তানা গেড়েছিলেন গনগনির গভীর শালবনে। রপ্ত করেছিলেন গেরিলা যুদ্ধকৌশল। ইংরেজদের ব্যাতিব্যস্ত করে তুলেছিলেন। ইংরেজ বাহিনী কামান দেগে জ্বালিয়ে দিয়েছিল গোটা শালবন। তবু দমানো যায়নি অচলকে। চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে যান তিনি। অবশ্য শেষরক্ষা করতে পারেননি। বগড়ির শেষ রাজা ছত্র সিংহ ধরিয়ে দেন অচলদের। এই গনগনির মাঠেই নাকি অচল ও তাঁর সঙ্গীদের ফাঁসি দিয়েছিল ইংরেজ।

কীভাবে যাবেন
হাওড়া থেকে অল্প সময়ের ট্রেন পথ। লোকাল ট্রেনে তিনঘণ্টা। এক্সপ্রেস ট্রেনে তার চেয়ে কিছু সময় কম। হাওড়া/শালিমার থেকে ট্রেনে ঘণ্টা আড়াইয়ের পথ। যে সব ট্রেন খড়গপুর হয়ে বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার দিকে যায় সেই পথে গড়বেতা। হাওড়া স্টেশন ও ধর্মতলা এবং মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়মিত বাস চলে। হাওড়া থেকে জাতীয় সড়ক ৬ ধরে পাঁশকুড়া, তার পর ঘাটাল, চন্দ্রকোনা ও রোড চন্দ্রকোনা হয়ে গড়বেতা।
কোথায় থাকবেন
গড়বেতায় থাকার জন্য ছোট-বড় অনেক হোটেল আছে। একটা ধর্মশালাও আছে। তা ছাড়া চন্দ্রকোনা, বিষ্ণুপুর বা মেদিনীপুরে থেকেও ঘুরে নিতে পারেন গনগনি।

নদীর ক্ষয়ের ফলে ল্যাটেরাইটে তৈরি হওয়া অদ্ভুত সুন্দর প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসে গনগনিতে। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় গনগনির রূপ সবচেয়ে সুন্দর। ফটোগ্রাফির আদর্শ পরিবেশ। আকাশ রয়্যাল ব্লু, গিরিখাতে হরেক শেডের লাল, তার ওপর সবুজ ঘাসের জাজিম, শিলাবতীর গেরুয়া জল আর হলুদ বালুতট – দু’পারে সবুজের ঘেরাটোপ। রং-এর অদ্ভুত বাহার এখানে। পশ্চিম মেদিনীপুরের গোপগড় একসময় ছিল গোপ রাজাদের রাজধানী৷ এখন ইকো পার্ক হয়েছে৷ খুব কাছেই কংসাবতী নদী৷ আর আছে আরাবাড়ি জঙ্গল৷ যেখানে হাতিদের বাস, পাওয়া যায় বিভিন্ন পাখি এবং অন্য জীবজন্তুদের দেখা৷ উপরি পাওনা খুব কাছেই গড়বেতা লাগোয়া গনগনির মিনি গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন৷ দুর্দান্ত সৌন্দর্য নিয়ে গনগনি যেন বলছে—কল্পলোকের নয় আমি মর্ত্যের সুন্দরী৷

লাল মাটির ঢেউ খেলানো প্রান্তর, কাজুবাদাম গাছের সারি৷ মাঝে মধ্যে শাল পিয়ালের জটলা। উঁচু টিলা থেকে নদীতে নামার জন্য সিঁড়ি রয়েছে। পর্যটকদের জিরোনোর জন্য রয়েছে গোটাকয়েক ছাউনির ব্যবস্থাও। গনগনি থেকে ঘুরে আসতে পারেন আশপাশের কয়েকটা বিখ্যাত মন্দিরে। যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সর্বমঙ্গলা কালী মন্দির। ওড়িশা স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়া যায় এই মন্দিরে। ষোড়শ শতকে বাগদি রাজা নৃপতি সিংহের তৈরি এই মন্দির। রাধানাথ সিংহ স্মৃতি মন্দির, মল্ল রাজা দুর্জন সিংহের তৈরি রাধাবল্লভ মন্দিরও বহু পুরনো স্থাপত্যের চিহ্ন বহন করে চলেছে।

Developed by DXDasia