বাঙালির হেঁশেলে স্বর্গীয় স্বাদ-সুগন্ধের বিচারে এখনও সে-ই ‘রাজা’
কিচ্ছুটি লাগবে না। বাঙালির হেঁশেলে এখনও সে-ই ‘রাজা’। উৎসব-অনুষ্ঠানে পরমান্ন, পোলাও কিংবা ভাত, বাঙালির রান্নাঘরে ‘গোবিন্দভোগ’ বা ‘গোবিন্দ জিউ’-এর মাহাত্ম্য আজও একইরকম। খাঁটি ঘি না জুটলেও সামান্য নুন-লঙ্কা সহযোগে এক থালা গোবিন্দভোগ চোখের পলকে সাবাড় করে দিতে পারে বাঙালি জাতি। খাদ্যরসিকদের মতে সুগন্ধ ও স্বাদে গোবিন্দভোগের কোনও বিকল্প নেই। বাসমতী, কালোজিরা, বাদশাভোগের মতো সুগন্ধি চালকে ছাড়িয়ে যায় গোবিন্দভোগ।
দীর্ঘদিন ধরেই গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য, প্রাচীন এই আতপ চালের চাষ এখন হচ্ছে বর্ধমান, হুগলি, বাঁকুড়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলার কয়েকটি ব্লকে। বিশেষত বর্ধমান জেলায় প্রায় ৩০০ বছর ধরে এই স্বর্গীয় সুগন্ধি চালের চাষ অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় মানুষের মুখের ভাষায় এই চালেরই আরেক নাম ‘খাস ধান’। মজার কথা হল ধানের জন্মস্থানেই রয়েছে তার সুগন্ধের আসল রহস্য। গাঙ্গেয় সমভূমি এলাকায় চাষ করা হলে চালের সুরভী হয় বেশি। অন্যান্য এলাকার ধান হলে সে গন্ধের তীব্রতা কিছুটা কম থাকে।
নামেই মেলে এর পরিচয়। দিব্যি বোঝা যায় এই আতপচাল দেবতার ভোগের জন্য। আসলে এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলকাতার এক ইতিহাসের প্রসঙ্গ। কথিত আছে, কলকাতার শেঠেদের হাতেই প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় গোবিন্দ জিউর মন্দির। আর সেই মন্দিরেই নাম পাল্টে যায় খাস ধানের চালের। কারণ, এই ধানের চাল নিবেদন করা হত গোবিন্দ জিউর পুজোয়। কেউ কেউ বলে সাদা, সুগন্ধি এই চালের পদ তৈরি করা দেওয়া রেওয়াজ ছিল গোবিন্দ জিউ-র মন্দিরে। সেই থেকেই খাস ধানের চালের নাম পাল্টে হল গোবিন্দভোগ। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন পুজো পার্বনে গোবিন্দভোগ চাল ব্যবহার করা হয়।
চাহিদার তুলনায় যদিও এর উত্পাদন কম। অর্থনীতির নিয়ম মেনে তাই বরাবরই গোবিন্দভোগ চালের দামটা একটু বেশিই। পুজো-পাব্বনে ভোগ ও নৈবেদ্যর জন্য সর্বত্র গোবিন্দভোগের চাহিদা উর্ধ্বমুখী হয়। ফলে, দামের তুলনামূলক বেশি। ব্যবসায়ীদের কথায়, চালের দানা ও গুণমান অনুসারে দামে হেরফের হয়।
(রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া গোবিন্দভোগ কিনতে চাইলে ক্লিক করুন)
চিরাচরিত আমন ধানের পাশপাশি সুগন্ধি ধানচাষে চাষিদের উৎসাহ জোগাচ্ছে রাজ্যের কৃষি দফতর। চাষিদের পছন্দের চাষের পাশপাশি গোবিন্দভোগ ধানের চাষে আগ্রহ বাড়ানোর কথা চাষিদের বলছেন কৃষি আধিকারিকরা। শুধু শুকনো উৎসাহ নয়, চাষের জন্য বীজও দিচ্ছে কৃষিদফতর। পূর্ব বর্ধমানের এক কৃষকের মতে, বেশ কয়েক বছর হল তাঁরা আমনের সঙ্গে গোবিন্দভোগের চাষ করছেন। এতে আমনের থেকে লাভ বেশি পাচ্ছেন বেশি। গোবিন্দভোগের ফলনও হয় ভালো। রোগ, পোকার আক্রমণও কম। সহজপাচ্যও।
অনলাইন বিপণি ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এর অরিজিৎ সেন বলছিলেন, “এখন আমন ধানের পাশাপাশি গোবিন্দভোগ চাষে উৎসাহ দেখাচ্ছেন কৃষকরা। আমাদের স্টোরে সারা বছরই এই চাল পাওয়া যায়, চাহিদাও রয়েছে যথেষ্ট। সম্পূর্ণভাবে কীটনাশক বিহীন গোবিন্দভোগ চাল সরাসরি বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের কৃষকদের থেকে আমরা সংগ্রহ করি, গুণমান যাচাই করে গ্রাহকরাও চোখ বন্ধ করে ভরসা করেন আমাদের। এখন তুলাইপাঞ্জি, রাধাতিলক -এগুলোর মতো সুগন্ধি চালের চাষ হচ্ছে বাংলায়, আমাদের সংগ্রহেও রয়েছে এগুলো তবুও গোবিন্দভোগের চাহিদাকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।”
(রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া গোবিন্দভোগ সরাসরি বাংলার কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এ। সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন- https://www.thebengalstore.com)