
রইল খাঁটি খেঁজুর বা নলেন গুড়-পাটালির সুলুক-সন্ধান
“চিঁড়ে মুড়কি তে তার
ভরি দেন ঝুলি,
পৌষে খাওয়ান ডেকে
মিঠে পিঠে-পুলি…”
খেজুরের গুড় বা নলেন গুড় ছাড়া শীতকাল নাহ্, ভাবাই যায় না। ‘নলেন গুড়’, এই শব্দবন্ধের মর্ম কতখানি তা একজন বাঙালির পক্ষেই বোঝা সম্ভব। শীতকালীন রসনাতৃপ্তিতে এর জুড়ি মেলা ভার। পৌষের শুরুতেই নতুন ধানে ভরে ওঠে গোলা। আর তাই দিয়ে হয় নবান্ন। এদিন থেকেই পিঠে-পুলি শুরু হয়ে যায় বাড়িতে বাড়িতে। অঘ্রাণের শেষ থেকেই নতুন গুড়ের সুঘ্রাণে ভরে ওঠে গ্রাম বাংলা। উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা সহ নদিয়া, বীরভূম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ বাংলার এই জেলাগুলিতে শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে খেজুর গুড় তৈরির ধুম পড়ে যায়। সেই ভোরবেলা খেজুরের রস আর দুপুরের পর সেই রসে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় খেজুর গুড় বা নলেন গুড়। তৈরি হয় পাটালি। আর তারপর সেই গুড়ের পিঠে, পায়েস, সন্দেশ, রসগোল্লা, মোয়া এসব তো আছেই।

সিনেমা-সাহিত্যেও বারবার এসেছে ‘নলেন গুড়’ প্রসঙ্গ। এই গুড় তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রধান বিষয়বস্তু করে ১৯৭৩ সালে পরিচালক সুধেন্দু রায় নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ছোট গল্প ‘রস’ অবলম্বনে বানিয়েছিলেন ‘সওদাগর’, যা মনে রাখার মতো একটা সিনেমা। অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন, নূতন, পদ্মা খান্নার মতো অভিনেতারা।

‘সওদাগর’ ছবির একটি দৃশ্য
নলেন গুড় কীভাবে তৈরি হয়, শুধু এটা নিয়েই একটা গোটা প্রবন্ধ লেখা যায়। সংক্ষেপে বললে- খেজুর গাছের গা চেঁচে নরুন দিয়ে ফুটো করে ফাঁকা হাঁড়িগুলো ঝুলিয়ে দিয়ে আসা হয় আর আগে থেকে রস ভরতে দেওয়া হাঁড়িগুলো নিয়ে আসা হয়। পরেরদিন ভোরে সেই রস নামিয়ে এনে বিভিন্ন হাঁড়ি থেকে ঢালা সমস্ত রস একত্র করে বড়ো পাত্রে ফোটানো হয়। ফুটিয়ে ফুটিয়ে ধীরেধীরে রস থেকে গুড় প্রস্তুত করেন তাঁরা। গুড়কে নিদিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে ঠান্ডা করে পাটালি তৈরি করা হয়, তাই নলেনগুড়ের এই দুই ধরনকে ঝোলাগুড় ও পাটালি গুড় বলেই পরিচিত। দুপুরের পর আবার ভর্তি হাঁড়িগুলো আনা হয় আর ফাঁকা হাঁড়িগুলো ঝুলিয়ে দিতে আসা হয়। তারপর একইভাবে সকালের মতো বিকালের দিকেও গুড় প্রস্তুত করা হয়। দিনে দু’বার এইভাবে প্রস্তুত হয় গুড়।

তবে, বাজার চলতি গুড়ে এখন সোডা দেওয়া ছাড়াও অনেক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়. খাঁটি গুড় বলে বিক্রি করা গুড়েও নিদেন পক্ষে সোডা দেওয়া থাকবে। এই গুড় গরম দুধে ফোটাতে গেলেই কেটে যায়। একসময় তো বসিরহাট, সন্দেশখালি, মিনাখাঁ, হাড়োয়া, হাসনাবাদ এলাকায় পুরো শীতকাল খেজুর গুড় কুটির শিল্প ছিল। সে দিন যে আর নেই, তা মাঠঘাটের চেহারাতেই বোঝা যায়। এখন খেজুর গাছের সারি আর তেমন চোখেই পড়ে না। এখন আর সেভাবে শিউলি (যারা গাছ কেটে খেজুর রস সংগ্রহ করেন) মেলে না এলাকায়। ভিন জেলা থেকে শিউলিদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় খেজুর গাছের মালিকদের। তবে গাছ কমলেও নলেন গুড়, পাটালির চাহিদা কমেনি। ফলে চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে গুড়ে ভেজাল মিশছে। সম্পূর্ণভাবে রাসায়নিক এবং সংরক্ষণাগার মুক্ত ‘নলেন গুড়’ বাংলার সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই ভেজালের যুগে ভাবতেই পারেন, ‘সে গুড়ে বালি’। তবে এখনও খুঁজলে এর সন্ধান মেলে।
(খাঁটি নলেন গুড় কিনতে চাইলে ক্লিক করুন)
এ যুগে বাংলার ‘খাঁটি’ স্বাদ যাতে হারিয়ে না যায় বেশ কিছু বছর ধরেই তা নিয়ে সচেষ্ট ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’। বাংলার বিভিন্ন জায়গার গুড়ের মান পরখ করে তবেই তা সংগ্রহ করে থাকে এই অনলাইন বিপণি। ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এর অরিজিৎ সেন বলছিলেন, “নলেন গুড় সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে একাধিকবার যাচাই করে দেখি আমরা। গ্রাহকদের থেকে গুড়ের গুণগত মান নিয়ে যাতে কোনও রকম অভিযোগ না আসে, সেটা সবসময় মাথায় রাখা হয়। আমরা গুড় সংগ্রহ করি সুন্দরবন অঞ্চলের গ্রামীণ গুড়-ব্যবসায়ীদের থেকে। এখনও পর্যন্ত গ্রাহকদের থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই পেয়েছি আমরা, এমনকী চাহিদা অনুযায়ী জোগান দিতে পারি না সবসময়।”
(খাঁটি নলেন গুড়ের পাটালি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন)
স্বাদে-গন্ধে নির্ভরযোগ্য-খাঁটি গুড়ের সন্ধান দিচ্ছে 'the bengal store'। সংগ্রহ করতে পারেন www.thebengalstore.com থেকে।
